• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় কৃষি প্রণোদনার ঋণপ্রাপ্তি নিয়ে সংশয়ে পাবনার প্রান্তিক চাষিরা

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, পাবনা

| ঢাকা , শনিবার, ২৩ মে ২০২০

পাবনার মির্জাপুর গ্রামের কৃষক আনিসুর রহমান। রমজান মাস টার্গেট করে মৌখিক চুক্তিতে দশ বিঘা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেছিলেন তরমুজ, শসা, বাঙ্গিসহ নানা ধরনের মৌসুমি ফল। ফলন ভালো হলেও, করোনাভাইরাসের লকডাউনে ঢাকা থেকে ক্রেতা না আসায় পণ্য বিক্রি না করতে পেরে পড়েছেন চরম লোকসানের মুখে। সম্প্রতি, সরকার কৃষি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলে নতুন করে আবাদের জন্য ব্যাংক ঋণের চেষ্টা করেন। তবে, বর্গাচাষি আনিসের নেই জমির দলিল, লিখিত চুক্তি করতেও রাজি নন জমির মালিক। কাগজপত্রের জটিলতা আর শর্তের বেড়াজালে ঋণ না পেয়ে আনিসের কণ্ঠে ঝড়ে পড়ে রাজ্যের হতাশা।

আনিসুর বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে এবার রমজানে আমার ফসল ঢাকায় পাঠাতে পারিনি। স্থানীয় বাজারেও ক্রেতা কম, তাই কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে । লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচই উঠবে না। করোনায় প্রণোদনার কথা শুনে কৃষি ঋণ চাইতে ব্যাংকে গিয়ে শুনি আগের মতোই জমির কাগজপত্র বন্ধক দিতে হবে। জমির মালিক কাগজ দিতে চায় না, চুক্তি করতেও অনেক খরচের ব্যাপার তাই ব্যাংক ঋণ পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছি।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক চাষিরা অধিকাংশই আনিসুরের মত বর্গাচাষি। কাগজপত্রের জটিলতা, আর সই স্বাক্ষরের ঝামেলা এড়িয়ে আবাদ শেষে ফসল ভাগাভাগির মৌখিক চুক্তিতেই সহজ সমাধান খোঁজেন তারা। কৃষি ঋণ কিংবা প্রণোদনা পেতে কোনমতে ব্যাংকের দরজায় পৌঁছলেও, জটিল শর্ত আর কাগজপত্রের হিসাব মেলাতেই হিমশিম অবস্থা হয় তাদের। নীতিমালার ফাঁকফোকড়ে প্রান্তিক চাষিদের জন্য সরকারের দেয়া সহযোগিতা ভোগ করেন সুযোগসন্ধানী জমির মালিকেরাই।

আউশ, খরিপের মতোই করোনার কৃষি প্রণোদনায় ঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও একই ধরনের, তাই সুবিধা প্রাপ্তি নিয়ে সংশয়ে প্রান্তিক চাষিরা।

কৃষি বিভাগ জানায়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগস্ত চাষিদের সহায়তা ও উৎপাদন অব্যহত রাখতে কৃষি প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে, অনিয়ম, দুর্নীতির অতীত অভিজ্ঞতা ও জটিল শর্তের কারণে এসব সহায়তা পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন ভূমিহীন প্রান্তিক চাষিরা। প্রকৃত চাষিদের কাছে প্রণোদনার সুবিধা পৌঁছাতে বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দিয়েছেন কৃষিবিদরা।

পাবনা সদর উপজেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম মুন্নু বলেন, জমির কাগজপত্র জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে প্রণোদনার কৃষি ঋণের সুবিধা প্রান্তিক চাষিদের কাছে পৌঁছে না। বড় বড় ব্যবসায়ী যারা গ্রামে জমি কিনে রেখেছেন তারা এই ঋণের সুবিধা ভোগ করেন। এক্ষেত্রে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ডাটাবেজ তৈরি করে ঋণ সুবিধা প্রদান করণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক চাষিদের কাছে এই সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব হতো।

কেবল ঋণ সহায়তাই নয়, সরকারের নিয়মিত কৃষি প্রণোদনার অংশ হিসেবে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ বিতরণ হয় ইউনিয়ন কৃষি পুনর্বাসন কমিটির মাধ্যমে। ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির কারণে সেখানেও বঞ্চিত হন প্রান্তিক চাষিরা।

পাবনা সদর উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, কৃষি পুনর্বাসন কমিটিতে আমার মতো কৃষি কর্মকর্তারা সদস্য সচিব হলেও তাদের কোন ক্ষমতাই নেই। ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বররা নিজেদের মতো করে এসব উপকরণ ভাগ বাটোয়ারা করেন। ইচ্ছা থাকলেও আমরা প্রকৃত কৃষককে এসব সুবিধা দিতে পারি না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর পাবনার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আজাহার আলী বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তারের কারণে প্রান্তিক চাষিদের কাছে প্রণোদনার সুবিধা পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া, বর্গাচাষিদের জন্য কৃষিঋণে যেসব শর্ত দেয়া হয়, তা আরও সহজ করা প্রয়োজন। আমরা এই সংকটগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি তারা দ্রুতই এ বিষয়টি বিবেচনা করবেন।’