• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

সেবা সপ্তাহের নামে রংপুর বিআরটিএ’র ঘুষ বাণিজ্য -শেষ

উপ-পরিচালকের তত্ত্বাবধানে ক্লাব কম্পিউটার নামে বিকল্প কার্যালয়

সংবাদ :
  • লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

বিভাগীয় নগরী রংপুরসহ পুরো জেলার ট্রান্সপোর্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) রংপুর কার্যালয়ে গ্রাহক সেবা সপ্তাহের নামে চলছে গ্রাহকদের হয়রানি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ফ্রিস্টাইলে ঘুষ গ্রহণ উপ-পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ক্লাবের নামে মোটরসাইকেলের লার্নার লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন করে দেয়ার নামে বিকল্প কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে চলছে রমরমা বাণিজ্য নির্দিষ্ট অংকের টাকা সরাসরি চলে যাচ্ছে কর্মকর্তাদের পকেটে। সরেজমিন ঘুরে দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ শেষ পর্ব।

বিআরটিএ রংপুর কার্যালয়ের গ্রাহক সেবা সপ্তাহের নামে চলছে তুঘলকি কারবার, তাদের দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিশাল ব্যনার টাঙিয়ে অফিসের বারান্দায় দুটো কম্পিউটার বসিয়ে গ্রাহক সেবার নামে চলছে চরম নৈরাজ্য। গ্রাহকরা ভোর বেলা থেকে সেবা নেয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পাচ্ছেন না কাক্সিক্ষত সেবা অভিযোগ গ্রাহকদের। সেবা সপ্তাহের ঘোষণা দেয়া হলেও ৫ দিন চলবে অর্থাৎ আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।

সরেজমিন বিআরটিএ কার্যালয় ঘুরে রংপুর নগরী ও জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের সেবার নমুনা। বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনেই ব্যানার টাঙানো দেখা যায়। সেখানে লেখা রয়েছে ক্লাব কম্পিউটার। রংপুর কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণী কল্যাণ সমিতির অফিসটি বিআরটিএ কার্যালয়ের ২০ গজ পেছনে। সমিতির কার্যালয়টিকে বানানো হয়েছে ক্লাব কম্পিউটার। অফিসের এক কর্মকর্তা ইশারায় বলছিলেন ক্লাবের মাধ্যমে আসেন তাড়াতাড়ি কাজ হয়ে যাবে। তার কথা শুনে দেয়ালে টানানো ক্লাব কম্পিউটারের ব্যানার দেখা গেল। সেখানে লেখা আছে ‘ব্যাংকের লম্বা লাইনের ঝামেলা এড়িয়ে আিরটিএ’র টাকা অনলাইনে জমা নেয়া হয়। এ ছাড়া গাড়ি, মোটরসাইকেল ট্যাক্স, ফিটনেস রুট পারমিট, ড্রাইভিং লাইসেন্স নতুন, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন, লার্নার ও নবায়ন ফি জমা নেয়া হয়’। ক্লাব কম্পিউটার অফিসে গিয়ে দেখা গেল একটি ফটোস্ট্যাট মেশিন, দুটি কম্পিউটারসহ অন্য সামগ্রী। সেখানে একটি সেক্রেটারিয়েট টেবিলে বসা ব্যক্তিকে নাম জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতে অস্বীকৃতি জানান। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় কার অনুমতিতে বিকল্প আিরটিএ অফিস খোলা হয়েছে, সেই ব্যক্তি বললেন, বড় স্যারসহ সব স্যার জানেন। তিনি বললেন, যে সমস্ত কাজের কথা ব্যানারে লেখা রয়েছে তার সবই এখানে করে দেয়া হয়। বিআরটিএ অফিসে কাজের চাপ বেশি তাই তারা এসব কাজ করে দেন। বিনিময়ে তারা সামান্য অর্থ নেন বলে দাবি করেন। তিনি স্বীকার করেন মোটরসাইকেলের লার্নার ফরম ৮০ টাকা, ফরম পূরণ ৬০ টাকা করে নেয়া হয়। এ ছাড়া মোটরসাইকেল, গাড়ি রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিট, লার্নার লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা রেট নির্ধারণ করে দেয়া আছে। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর নড়েচড়ে বসেন সেই চেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তি। আমতা আমতা করে কি যেন বলার চেষ্টা করেন। সেখানে কথা হলো মিঠাপুকুর থেকে আসা দু যুবক সাঈদ ও শান্ত জানালেন, তারা দুজনেই মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে এসেছেন। এর আগে তাদের মাধ্যমে লার্নার করে নিয়েছেন। বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী সাড়ে চারশ টাকা লাগার কথা থাকলেও তারা এক হাজার করে জনপ্রতি দিয়ে দু’ঘণ্টার মধ্যে তাদের লাইসেন্স পেয়ে যান। তারা জানান, বিআরটিএ অফিসে গেলে একমাসেও লার্নার লাইসেন্স পাওয়া যাবে না আর ড্রাইভিং লাইসেন্স তো অনেক দূরের কথা। আর যেহেতু অফিস থেকে ক্লাবকে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে তাই এখানে আসা বলে জানালেন তারা। এভাবেই আরও বেশ কয়েকজনকে সেখানে বিভিন্ন কাজের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

এদিকে সেবা দেয়ার নামে বড় টেবিলের পেছনে চেয়ারে বসে থাকা এক ব্যক্তি নিজেকে বিআরটিএ’র উচ্চমান সহকারী পরিচয় দিয়ে জানালেন, আমরা কাগজ ঠিক পেলে সঙ্গে সঙ্গে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন ও লার্নার লাইসেন্স প্রদান করছি। কিন্তু এক ঘণ্টা অবস্থান করেও কোন লাইসেন্স দিতে দেখা যায়নি অথচ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে শত শত মানুষ।

বিআরটিএ অফিসের অভ্যন্তরে বিশেষ করে ৮ এবং ১০ নম্বর রুমে যারা বসেন তাদের পর পর দুদিন গিয়েও চেয়ারে পাওয়া যায়নি। সেখানে অবস্থান করা এক ব্যক্তি জানালেন, এই দুই রুমে যারা বসেন তারা টাকা ছাড়া কাজ করেন না। তাদের বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ। মজার ব্যাপার অফিসে কারা কর্মকর্তা কারা কর্মচারী কারা দালাল বোঝা মুশকিল। বেশিরভাগ চেয়ারে ও টেবিলে বসে থাকেন দালালরা। তারা টাকা দিলে কাজ করেন না হলে নয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এদিকে বিভাগীয় নগরী রংপুরে এক হাজারেরও বেশি মাইক্রোবাস আছে যারা ভাড়ায় চলে, এরমধ্যে ৯০ ভাগ গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, ড্রাইভারদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। একইভাবে হাজার হাজার বাস মিনিবাস চলাচল করলেও বেশিরভাগ গাড়ির রুট পারমিট ফিটনেস নেই। বিআরটিসি গাড়ির অনেকগুলো চলাচলে অযোগ্য হলেও ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়াই চলছে গাড়িগুলো। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী ও লাশ পরিবহনের নিয়োজিত দুই শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও ২/৪টি ছাড়াও কারও ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, ট্যাক্স দেয় না। চলাচলের অযোগ্য হলেও আিরটিএকে ম্যানেজ করে চলছে সব ধরনের বাস মিনিবাস মাইক্রোসহ যানবাহন। ফলে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে সরকার বছরে কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে বিআরটিএ রংপুর অফিসের প্রধান উপ-পরিচালক ফারুখ আলমের সঙ্গে তার চেম্বারে গেলে তিনি বলেন, আমরা গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছি কাগজ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ও লার্নার লাইসেন্স দিচ্ছি। রংপুরে কতগুলো বাস-মিনিবাস বিআরটিসি বাস-মাইক্রোবাস আছে যার ফিটনেস নেই জানতে চাইলে কাগজ দেখে বলতে হবে। পুরো ফিগার মনে নেই। ইতোমধ্যে আমরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করেছি বলে জানান। এসব কথা বলে তিনি চেম্বার থেকে বেরিয়ে লাইনে দাঁড়ানো লোকদের সামাজিক দূরত্ব মানার কথা বলেন। গ্রাহকরা বলেন, কিসের সেবা সপ্তাহ সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থেকেও কাজ হচ্ছে না বলে তাকে বললেন কয়েকজন গ্রাহক। তার অফিসে কোন দুর্নীতি করার সুযোগ নেই দালাল ও ক্লাবের নামে যে বিকল্প প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যেই টাকা নিচ্ছে এ বিষয়ে তিনি বলেন এটা তার জানা নেই।