• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫, ১৩ সফর ১৪৪০

আদিবাসী বাঙালিদের নির্যাতনের প্রধান কারণ ভূমি দখল

সমস্যা সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ নেই, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয় না

সংবাদ :
  • চিত্ত ঘোষ, গোবিন্দগঞ্জ থেকে ফিরে

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন ২০১৮

উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী-বাঙালিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের পেছনে ভূমি দখলই প্রধান কারণ। এ পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে তার সবটাই ভূমিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা আদিবাসী ও প্রান্তিক বাঙালিদের ভূমি জবরদখল করেই চলেছে। সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের নিরীহ আদিবাসী-বাঙালিদের ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ঢাকায় আলোচনা করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাগদা ফার্মের সমস্যার সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা করবেন। প্রায় ৩ বছর অতিবাহিত হতে চলছে অথচ সরকারের পক্ষ হতে সমস্যা সমাধানের দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

গতকাল সকালে সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও জনসংগঠন ঐক্য পরিষদ দিনাজপুরের যৌথ উদ্যোগে এবং উন্নয়ন সংগঠন কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (সিডিএ), এএলআরডি, আরবান, কাপেং ফাউন্ডেশন, নাগরিক উদ্যোগ, প্লানেট এবং ল্যান্ড কোয়ালিশনের সহায়তায় সাত দফা দাবিতে আয়োজিত জনসমাবেশে বক্তারা এসব দাবি জানান। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই জনসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, সিডিএ’র নির্বাহী পরিচালক শাহ-ই-মবিন জিন্নাহ্ আফজাল হোসেন, খয়রাত হুসাইন, খন্দকার জিল্লুর রহমান, শহীদ শ্যামল হেমব্রমের ছেলে সাগর হেমব্রম, তাজুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা তারা, জয়নাল আবেদন মুকুল, রমজান আলী, লরেন্স বেগ, লালমোহন বর্মন, গণেশ মুর্মু, সুফল হ্রেমব্রম, থমাস হেমব্রম, জাফরুল ইসলাম, বার্নাবাস টুডু, রেজাউল করিম, স্বপন শেখ, যোসেফ হেমব্রম, লুৎফর রহমান, জোহন মুরমু প্রমুখ। জনসমাবেশের শুরুতে গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে বাগদা ফার্মে পুলিশের হামলায় গুলিতে নিহত শ্যামল-রমেশ-মঙ্গলসহ বাগদা ফার্মের ভূমি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত প্রয়াতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সিডিএ’র নির্বাহী পরিচালক শাহ-ই-মবিন জিন্নাহ্ বলেন, আজকে একটি ন্যায্য দাবিতে বাগদা ফার্মে আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলন শুধু বাগদা ফার্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটা গোটা উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী-বাঙালিদের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৭ (১) ধারাতে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ কিন্তু বাগদা ফার্মের উদাহরণ বলে এদেশের মালিকদেরকেই শোষণ করা হচ্ছে। আমি আবারও বাগদা ফার্মের আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার ফিরিয়ে দিতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই। সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম বলেন, বাগদা ফার্মে গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে স্বাধীন দেশে দিনে দুপুরে মানুষের উপর অন্যায়ভাবে হামলা করে সাঁওতালদের হত্যা, নির্যাতন, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। তা মানব সভ্যতায় ভাবা যায় না। আমরা ধারাবাহিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। অনেকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা কোন বাধা বিপত্তি মেনে নেব না। আমাদের জমিতে আমরা চাষবাস করবো, কেউ বাধা দিলে আমরা সেটি প্রতিহত করবো। শহীদ শ্যামল হেমব্রমের ছেলে সাগর হেমব্রম, আমার বাবাকে যারা হত্যা করেছে তাদের আমি বিচার চাই, আমার বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি ফেরত চাই এবং বাবার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাই। সমাবেশে অনান্য বক্তারা বলেন, উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী-বাঙালিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের পেছনে ভূমি দখলই প্রধান কারণ। কারণ এখন পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে তার সবটাই ভূমিকে কেন্দ্র করে ঘটছে। সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের আদিবাসী-বাঙালিদের ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি, বিরলের কড়াদের ৪৮ একর জমি দখলের ঘটনার মতো অসংখ্য ঘটনা বিভিন্ন জেলায় অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘটনায় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা আদিবাসী ও প্রান্তিক বাঙালিদের ভূমি জবরদখল করেই চলেছে। বক্তারা আরও বলেন, গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে বাগদা ফার্মে হামলার পরে এখনও সেখানে আদিবাসী-বাঙালিরা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। পুলিশ ও চিনিকল কর্তৃপক্ষের দায়েরকৃত মিথ্যা মামলায় এখনও ক্ষতিগ্রস্তরা আতঙ্কিত জীবনযাপন করছে। বক্তারা অবিলম্বে সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের উদ্বাস্তু মানুষদের যথাযথ পুনর্বাসনসহ তাদের বাপ-দাদার জমি ফেরতের দাবি জানান। জনসমাবেশে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, আদিবাসীরাও মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছে কিন্তু তারপরেও আজ এই স্বাধীন দেশে কেন আমাদের জমি-জলা-জঙ্গল হারাতে হচ্ছে। আমরা শুনতে পেরেছি যারা সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মে হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের নায়ক ছিল আগামী নির্বাচনে তারা নাকি আবারও নির্বাচন করতে চায়। আমি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে জানাতে চাই আপনারা যদি আবারও আবুল কালাম আজাদকে নমিনেশন দেন তাহলে বাগদা ফার্মের আদিবাসী-বাঙালিরা রাজপথ অবরোধ করবে ও তাকে ভোট দেবে না। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমাদের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনা করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাগদা ফার্মের সমস্যার সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু তার কোন সুফল আমরা পায়নি। অনতিবিলম্বে আমরা এই সমস্যার সুন্দর সমাধান এবং আদিবাসীদের ওপর হামলার ঘটনায় যারা হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ডা. ফিলিমন বাস্কে বলেন, সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আমরা গত কয়েক বছর ধরে লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছি। কিন্তু চিনিকলের নামে আমাদের সম্পত্তি এখনও অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে। চিনিকল কর্তৃপক্ষের যেখানে আখ চাষ করার কথা সেখানে ধান, বেগুন, আলু এমনকি তামাক চাষ করা হচ্ছে লিজ প্রদানের মাধ্যমে। উল্টো নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তিতে আদিবাসী-বাঙালিদের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে। অনতিবিলম্বে ৭ দফা জমি ফিরিয়ে দিয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সরকারের নিকট তিনি জোর আহ্বান জানান। সমাবেশে উত্থাপিত সাত দফা দাবিগুলো হচ্ছে- উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আদিবাসী ও ভূমিহীন দরিদ্র ক্ষমতাহীনদের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার; ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা এবং আদিবাসী-বাঙালি নারী-পুরুষের ওপর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জুলুম ও পুলিশি হয়রানি বন্ধ করা, আদিবাসীদের সম্পত্তি কোন সরকার/কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রিক্যুইজিশন (Requisition) করা এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ায় এ ধরনের আদেশ বাতিল ও সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করা, ১৯৪৮ সালের The East Bengal (Emergency) Requisition of Property Act 1948 (No. VIII of 1948) মোতাবেক যে কাজের জন্য (ইক্ষু চাষ) গ্রহণ হয় তা না করা হলে খেসারতসহ পূর্বমালিক আদিবাসীদের ফেরতের বিধান বাস্তবায়ন করা, আদিবাসী সাঁওতালদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগকারী চিহ্নিত পুলিশ কর্মকর্তাসহ জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা, ২০০৪ সালে সুগার মিল বন্ধের পর প্রভাবশালীদের মাঝে লিজের নামে যে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি হয়েছে সেই দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।