• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭, ১২ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

আজ মহানবমী

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , সোমবার, ০৭ অক্টোবর ২০১৯

‘নারী জাতির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা সমাজ ও জীবনকে মহৎ করে তোলে’- এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মহাষ্টমীতে দুর্গোতিনাশিনী দেবীর পায়ে অঞ্জলি দিয়েছেন ভক্তরা। একই সঙ্গে অশুভশক্তির নাশ করে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার আর্তিও ছিল দেবীর কাছে। দুর্গা মাতৃভাবের প্রতীক আর কুমারী নারীর প্রতীক। কুমারীর মধ্যে মাতৃভাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিবারের মতো এ বছরও দেশের সব রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমারীপূজা। গতকাল রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন পূজামণ্ডপে প্রতিবারের মতো ছিল কুমারীপূজার বর্ণাঢ্য আয়োজন।

আজ শারদীয় দুর্গোৎসবের চতুর্থ দিন মহানবমী। মহানবমী পূজা শুরু হবে সকাল সাড়ে ৬টায়। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে আরতি প্রতিযোগিতা। আজ মণ্ডপে মণ্ডপে প্রধান আকর্ষণ থাকবে আরতি প্রতিযোগিতা। রাতকে উজ্জ্বল করে ভক্তরা মেতে উঠবেন নানা ঢঙে আরতি নিবেদনে। একই সঙ্গে দিনভর চলবে চ-ীপাঠ। থাকবে ভক্তদের কীর্তনবন্দনা।

গতকাল ভোর থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জড়ো হতে থাকেন রামকৃষ্ণ মিশনসহ বিভিন্ন মণ্ডপে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। এক সময় ভিড় মঠ ও মিশনের মূল গেট পর্যন্ত চলে আসে। এ সময় মন্দিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশ ও র‌্যাব নিয়োজিত ছিল।

রামকৃষ্ণ মিশনে অষ্টমীপূজা শুরু হয় সকাল সাড়ে ৫টায়। সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী দেবীকে আসনে বসানো হয়। হাজারো ভক্ত দেবী দুর্গা ও কুমারী মাকে জয়ধ্বনি, উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে নেন। এবার কুমারী দেবীরূপে মণ্ডপে অধিষ্ঠিত হন রাজধানীর লক্ষ্মীবাজারের চাইল্ড হ্যাভেন আইডিয়াল হাই স্কুলের প্লে গ্রুপের ছাত্রী প্রশংসা প্রিয়তা বন্দ্যোপাধায়। কুমারীর শাস্ত্রীয় নাম ‘সুভগা’। প্রিয়তাকে সিংহাসনে বসানোর সময় অসংখ্য পুণ্যার্থী সমস্বরে ‘দুর্গা মায় কি জয়’, ‘কুমারী মায় কি জয়’ বলে ধ্বনি দিতে থাকেন। কুমারীপূজা সম্পন্ন হলে ভক্তরা মাকে প্রণাম করেন। কুমারীপূজা শেষে তারা দেবী দুর্গার পায়ে অঞ্জলি নিবেদন করেন। পূজা শেষে তাদের আশীর্বাদ দেন প্রিয়তা। এ সময় তার কণ্ঠে ভেসে আসে অসাম্প্রদায়িকতার সুর। প্রিয়তা বলেÑ ‘হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার মধ্যে একই রক্ত, একই প্রাণ। আসো, আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি। তোমাদের জন্য এই আমার আশীর্বাদ।’

অষ্টমীপূজা ছাড়াও রাতে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। অষ্টমীর শেষ নবমীর শুরুর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। যেসব মণ্ডপে কুমারীপূজা হয়, সেখানে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিনটি পূজা। দিনে অষ্টমী বিহিতপূজা আর কুমারীপূজার পর সন্ধিপূজা।

সনাতন শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, ১ থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত অজাতপুষ্পবালাকে কুমারী বলা হয়। বয়স অনুযায়ী তার নাম এরূপÑ এক বছর বয়সে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কালিকা, পাঁচে সুভগা, ছয়ে উমা, সাতে মালিনী, আটে কুব্জিকা, নয়ে অপরাজিতা, দশে কালসন্ধর্ভা, এগারোয় রুদ্রাণী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চৌদ্দয় পীঠনায়িকা, পনেরোয় ক্ষেত্রজ্ঞা ও ষোল বছরে অম্বিকা বলা হয়ে থাকে। কুমারীপূজা ছাড়া দুর্গাপূজায় পরিপূর্ণ ফল লাভ হয় না বলে সনাতন শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।

কেন কুমারীপূজা করা হয়, এ সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। কুমারীপূজার মাধ্যমে নারী জাতি হয়ে উঠবে পূতপবিত্র ও মাতৃভাবাপন্ন। প্রত্যেকে শ্রদ্ধাশীল হবে নারী জাতির প্রতি। ১৯০১ সালে ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম কলকাতার বেলুড় মঠে নয়জন কুমারীপূজার মাধ্যমে এর পুনঃপ্রচলন করেন। তখন থেকে প্রতি বছর দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে এ পূজা চলে আসছে।

অষ্টমীর দিনই কেন কুমারীপূজা করা হয়, এ প্রসঙ্গে স্বামী ধ্রুবেশানন্দ বলেনÑ অষ্টমীর দিনই কুমারীপূজা হতে হবে, এর কোন বাধ্য বাধকতা নেই। কোন কোন মন্দিরে দুর্গাপূজার যে কোন দিন কুমারীপূজা করা হয়। আমাদের মঠ মিশনের নিয়ম দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমীÑ এই তিন দিনের যে কোন একদিন কুমারীপূজা করা যায়। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন সাধারণত অষ্টমীর দিনই কুমারী পূজা করে থাকে। তবে যদি কোন কারণে সন্ধিপূজা দিনে হয়, তাহলে সেদিন সময়ের অভাবে কুমারীপূজা সপ্তমী বা নবমীর দিন করা হয়। এই বছর সন্ধিপূজা রাতে। তাই অষ্টমীর দিনই কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এবার সারাদেশে ৩১ হাজার ৩৯৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তা গত বছরের চেয়ে ৪৮৩টি বেশি বলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা ২৩৭টি। তা গত বছরের তুলনায় ৩টি বেশি। এ বছর ঢাকা বিভাগে ৭ হাজার ২৭১, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৪৫৬, সিলেটে ২ হাজার ৫৪৫, খুলনায় ৪ হাজার ৯৩৬, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৫১২, রংপুরে ৫ হাজার ৩০৫টি, বরিশালে ১ হাজার ৭৪১ ও ময়মনসিংহে বিভাগে ১ হাজার ৬৩২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।