• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ ১ রমজান ১৪৪২

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় দর্শনার্থী কম, বিক্রি ভালো

সংবাদ :
  • আবদুল্লাহ আল জোবায়ের

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

জাতির মেধা ও মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০। রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কারণে একদিন পরে গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় এবারের বইমেলা। দেখতে দেখতে দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে মননশীল ও সৃজনশীলতার অন্যতম বড় উৎসব এবং প্রাণের আয়োজন অমর একুশে গ্রন্থমেলার ৯ দিন পার হয়ে গেছে। মেলাকে ঘিরে বইপ্রেমীদের আশার পারদ থাকে সবকিছুর ওপরে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। প্রথম দিন থেকেই মেলায় ছুটে আসছেন দেশের নানা প্রান্তের বইপ্রেমী মানুষ। তাদের কেউ বন্ধুদের নিয়ে আবার কেউ পরিবার-পরিজনসহ মেলায় এসেছেন। দিন যতই এগিয়ে যাচ্ছে, মেলাও তত প্রাণবন্ত হচ্ছে। অতীতের রেকর্ড বলছে, এই সময়টায় মেলায় তুলনামূলক ভিড় কম হয়। গতকালও তেমনই ছিল। তবে, মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় তুলনামূলক কম হলেও বিক্রি মোটামুটি ভালো বলে জানিয়েছেন প্রকাশক ও বিক্রেতারা।

এ বিষয়ে ঐতিহ্য প্রকাশনীর প্রকাশক কাজল সংবাদকে বলেন, বইমেলায় বিক্রি আশানুরূপ না হলেও একদম খারাপ না। আমরা সব ধরনের বই প্রকাশ করে থাকি। এর মধ্যে গল্প ও উপন্যাসের বই ভালো বিক্রি হচ্ছে। সিনিয়র পাঠকরা প্রবন্ধের বই কিনছে। যারা গবেষণা করে, তারা গবেষণাধর্মী বই কিনছে। হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল, আনিসুল হকের বই ভালো বিক্রি হচ্ছে। ইন্টারনেটের যুগে পিডিএফ না পড়ে মানুষ বই কিনছে বলে জানান তিনি।

সুদূর রাজশাহী থেকে বইয়ের টানে মেলায় এসেছেন আলী ইউনুস হৃদয়। সঙ্গে ছিল তার সহপাঠী অ্যানি। দু’জন মিলে কিনেছেন ইমরান মাহফুজের কাব্যগ্রন্থ ‘কায়দা করে বেঁচে থাকো’। মেলায় আসার অনুভূতি জানতে চাইলে হৃদয় সংবাদকে বলেন, মেলায় এসে ভালো লাগছে। বিশেষ করে নতুন বইয়ের ঘ্রাণে আমি বিমোহিত। দর্শনার্থীদের আগমন মেলাকে প্রাণবন্ত করেছে। নতুন বই প্রকাশ নিয়ে তিনি বলেন, বাজারে অনেক বই আসছে। তবে, মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা কমছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নিয়ে বই প্রকাশ না করে পাঠকদের জ্ঞানের ক্ষুধা নিবারণে মানসম্মত বই প্রকাশের জন্য নবীন লেখক ও কবিদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

গ্রন্থমেলায় কর্নেল রাব্বির ‘কসমিক লাইফ’

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পাওয়া যাচ্ছে কর্নেল মো. রাব্বি আহসানের প্রথম গ্রন্থ ‘কসমিক লাইফ’। বইটি প্রকাশ করেছে আহসান পাবলিকেশন্স। মূল্য ২০৭ টাকা। বইটিতে মানবজীবনের আবশ্যিক বিষয়গুলো লেখক গভীরভাবে স্পর্শ করেছেন। তবে সার্বিক ভালোবাসার ক্ষেত্রে লেখক নিজেকে সীমিত রেখে শুধু নিজেকে ভালোবাসার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। লেখক জানান, বইটি মেলায় আসার পর ভালোই সাড়া পেয়েছেন। পাঠকের এ ভালোবাসা আমাকে আরও ভালোমানের লেখা নিয়ে আসতে অনুপ্রেরণা দেবে।

পুলিশের গাফিলতিতে মেলা প্রাঙ্গণে হকার

বইমেলা উপলক্ষে প্রতিবছর মেলা প্রাঙ্গণ এবং প্রাঙ্গণের বাইরে হকারদের প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে, গতকাল বইমেলা প্রাঙ্গণের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে গিয়ে কয়েকজন হকারের দেখা মিলেছে। তারা ফুলের বেন্ট বিক্রি করছে। এমন একজনকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানায়, তার মতো এরকম চার-পাঁচজন মেলার ভেতরের অংশে বেন্ট বিক্রি করে। পুলিশ বাধা দেয় কি না জানতে চাইলে সে বলে, পুলিশ দেখলে ধাওয়া দেয়। তখন পালিয়ে যাই। এরপর আবার এসে ফুলের বেন্ট বিক্রি করে বলে জানায় সে হকার। পাশেই দু’জন পুলিশ বসা দেখে তাদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে জানাতে বলেন। পুলিশের উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানান, ধাওয়া দিলে পালিয়ে গেলেও হকাররা আবার ফেরত আসে। তবে নিয়ম অনুযায়ী, হকাররা মেলার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না বলে স্বীকার করেছেন সেই পুলিশ কর্মকর্তা। ফুলের বেন্ট বিক্রেতা ছাড়াও আচার, চানাচুর, ফল বিক্রেতাকে মেলা প্রাঙ্গণে দেখা গেছে। এছাড়া, শিশুদের সহায়তার কথা বলে টাকা আদায় করতে দেখা গেছে মেলা প্রাঙ্গণে।

কবি বলছি :

গতকাল সন্ধ্যায় কলামিস্ট ও কবি সাকিব হাসানের সঙ্গে কথা হয় সংবাদের। এবারের বইমেলায় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সেদিন জোছনা ছিল একা’ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালে ‘এক বেহালায় কৃষ্ণচূড়া’ শীর্ষক তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি তার নতুন কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে বলেন, আমার কাব্যগ্রন্থে নতুনত্বের স্বাদ আছে। নিজস্ব রচনাশৈলীতে সহজ ভাষায় এসব কবিতা লেখা হয়েছে। এ কাব্যগ্রন্থে ১২৬টি কবিতা আছে। প্রত্যেকটি কবিতাই তার পাঠককে ভিন্ন রকমের স্বাদ দিবে। আমি মনে করি, এসব কবিতা পড়ে পাঠক ‘কবিতা পাঠের আনন্দ’ পাবে। তিনি বলেন, গীতিময়তা এবং গতিময়তা আমার কাব্যগ্রন্থের বৈশিষ্ট্য। চিত্রকল্পের মাধ্যমে আমি পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। পাঠক কবিতাবিমুখ হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে কবি সাকিব বলেন, কবিতা দুর্বোধ্য নয়, কবিতায় সহজ ভাষায় অনেক কঠিন কথা বলা যায়। কেমন সাড়া পাচ্ছেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত ১৫ ফেব্রুয়ারির পর মেলা জমে ওঠে। তবে, আজ মেলার ৯ম দিনেও আমি পাঠকদের বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার বই কিনছে।

গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চের অনুষ্ঠান :

গতকাল অমর একুশে গ্রন্থমেলার ৯ম দিনে মেলা চলে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় দিব্যদ্যুতি সরকার রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া-এর উপাচার্য রাশিদ আসকারী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অ্যাডভোকেট সাহিদা বেগম ও ড. আশফাক হোসেন। লেখকের বক্তব্য প্রদান করেন দিব্যদ্যুতি সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আবুল মোমেন।

প্রাবন্ধিক বলেন, গণমানুষের মুক্তি-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পৃথিবীতে যে ক’জন হাতে গোনা মানুষ কায়েমি শোষকদের অধীনে দীর্ঘ কারাভোগ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। পাথরের দেয়াল এবং লোহার গরাদ অতিক্রম করে তিনি একটি স্বাধীন দেশ স্থাপন করেছেন পৃথিবীর মানচিত্রে। লেখক দিব্যদ্যুতি সরকার বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাজীবনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় বঙ্গবন্ধুর নানাবিধ সত্তা, যেমন, মানুষ বঙ্গবন্ধু, রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু, লেখক বঙ্গবন্ধু ইত্যাদি বিষয় আবিষ্কারের প্রয়াস পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর বৈচিত্র্যময় কন্টকাকীর্ণ জীবনের এক দুর্যোগপূর্ণ অধ্যায় তার কারাজীবন, সমকালীন ইতিহাসের আলোয় তার বয়ান এবং অন্তর্বয়ান আলোচ্য গ্রন্থকে মুজিব জন্মশতবর্ষের এই সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিক।

আলোচকরা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময়ই কারাগারে কাটিয়েছেন। আত্মত্যাগী এই মহান নেতার আপোসহীন সংগ্রামের কারণেই বাঙালি আত্মপরিচয়ের সংকটকে কাটিয়ে বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লেখক দিব্যদ্যুতি সরকার তার রচিত বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ বৈচিত্র্যময় কারাজীবনের অভিজ্ঞতাকে উপস্থাপন করেছেন। আমাদের তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দিব্যদ্যুতি সরকার বলেন, বঙ্গবন্ধুর মতো এমন মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তকে ভালোভাবে যাচাই করে নেবার প্রয়োজন আছে। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাজীবন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও তাত্ত্বিক বিচার-বিশ্লেষণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সংলাপনির্ভর সাধারণ ভাষায় লিখিত এ গ্রন্থের উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন সম্পর্কে নতুন কোন তথ্য উপস্থাপন করা নয় বরং মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরা।

সভাপতির বক্তব্যে আবুল মোমেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করতে হলে তার জেল জীবনের প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতাও আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। বারবার কারাবরণ ও আপোসহীন সংগ্রামের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের উত্তরণ ঘটে এবং তিনি গণমানুষের আশা-ভরসার প্রতীকে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের পটভূমিতে রচিত দিব্যদ্যুতি সরকার-এর বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন গ্রন্থটিতে জাতির পিতার জীবন ও ভাবনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে যা এই মহান বাঙালির সামগ্রিক মূল্যায়নে ভূমিকা রাখবে।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি ওবায়েদ আকাশ, মতিন বৈরাগী, আলতাফ শাহ্নেওয়াজ এবং স্নিগ্ধা বাউল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মাহিদুল ইসলাম, সুপ্রভা সেবতী, জি এম মোর্শেদ। নৃত্য পরিবেশন করেন লায়লা হাসানের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘নটরাজ’-এর নৃত্যশিল্পীরা। সেলিম রেজার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সংস্কৃতি মঞ্চ’-এর পরিবেশনা। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন জয় সিংহ রায় (তবলা)।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি টোকন ঠাকুর, কবি সৈয়দ তারিক, কথাশিল্পী সাগুফতা শারমীন তানিয়া এবং কবি আখতারুজ্জামান আজাদ।

আজকের অনুষ্ঠানসূচি :

আজ অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১০ম দিনে মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে মোহাম্মদ আলী খান রচিত ‘ডাকটিকিট ও মুদ্রায়’ বঙ্গবন্ধু শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আতাউর রহমান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন শ্যামসুন্দর সিকদার ও ইকরাম আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ফজলে কবির। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।