• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫, ১৩ সফর ১৪৪০

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী স্মরণে নাগরিক শোকসভা

সত্য ও সুন্দরের প্রতীক ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

সংবাদ :
  • সাংস্কৃতিক বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , বুধবার, ১৪ মার্চ ২০১৮

image

গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান -সংবাদ

মহান মুক্তিযুুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের কন্ঠস্বর, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার অন্যতম পথিকৃৎ ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। যিনি-বর্বর পাক হানাদার বাহিনীর কাছে নির্মম নির্যাতনের নাগপাশ ছিড়ে নিজের জীবনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন অনন্য এক উচ্চতায়। পাশাপাশি বর্বর পাকিদের নির্যাতনে শিকার হওয়া অন্য বীর-মহিয়সী নারীদের সচল করতে যুগিয়েছিলেন নিরন্তর প্রেরণা। জীবনের দুর্বিষহ অতীতকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি পরিত্যক্ত-অপরিত্যক্ত কাঠ ও অন্যান্য বিষয়াদি দিয়ে শিল্পসৃষ্টির মধ্যে খুঁজে নিয়েছিলেন জীবনের নতুন অর্থ। জীবনের সেই নতুন অর্থ নশ্বর পৃথিবীর বুকে অবিনশ্বর দৃশ্যমান রেখে জীবনজয়ী এই মহীয়সী নারী বীরমাতা ‘ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী’ চিরদিনের জন্য চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিদেহী আত্মার শান্তিকামনায় গতকাল অনুষ্ঠিত হলো নাগরিক শোকসভা। গতকাল বিকেলে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী’ স্মরণের এই ‘নাগরিক শোকসভা’। এই আয়োজনে দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের কণ্ঠস্বর প্রেয়বাষিণীর কন্যা ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী বলেন, যদি পৃথিবীতে আবার আমার জন্ম হয়, শততার জন্ম হয়-তাহলে ‘ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী’র সন্তান হিসেবে জন্ম নিতে চাই।

তিনি বলেন, আমি একাত্তর দেখিনি, মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। আমি একজন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে দেখেছি। একজন শিল্পীর জীবন দেখেছি। তার চোখের দ্যুতি দেখেছি। সেই দ্যুতি আমাকে তাড়া করে, আমাকে শাসন করে। সেই দ্যুতি আমাকে তাড়া করে, আমাকে শাসন করে। আর কখনও তার সাথে দেখা হবে না; তিনি যেখানেই থাকুন-ভালো থাকুন।

বসন্তের বিকেলে শুরু হয় এই আয়োজন। শুরুতেই নেপালে ‘ইউএস বাংলা’ বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের স্মরণে একমিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর শিল্পী শারমিন সাথী ইসলাম ময়নার কণ্ঠে গীত ‘তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে/তব. পুণ্য-কিরণ দিয়ে যাক, মোর মোহ-কালিমা ঘুচায়ে’ গানের মধ্য দিয়ে শোকসভার আলোচনা শুরু হয়। যাতে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের বরণ্যে ব্যক্তিদের পাশাপাশি প্রিয়ভাষিণী’র পরিবারে বেশ কয়েকজন সদস্য।

এতে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে নিবেদিত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির, নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ, প্রিয়ভাষিণীর মেয়ে ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, প্রিয়ভাষিণীর চিকিৎসক ডা. আমজাদ হোসেন, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাকসুদ কামাল, চারুশিল্পী সংসদের সাধারণ সম্পাদক চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি প্রমুখ। প্রিয়ভাষিণীকে নিবেদিত স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত। সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।

আলোচনায় ইমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর বড় মামা আর আমি সহপাঠি ছিলাম। সে কারণে সে আমাকে মামা বলে ডাকত। প্রকৃতির মধ্যে মানুষের অবহেলার মধ্যে মানুষের সৌন্দর্য দেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং নন্দতাত্ত্বিকবোধ ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন।

প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী বলেন, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে ইলামিত্রের উত্তারাধিকার হিসেবে পাই। ঘরে-বাইরে সত্য ও সুন্দরের উপাসনাই ছিল তার আরাধ্য। তাই আমাদের মাঝে তিনি বিরাজ করবেন সত্য ও সুন্দরের প্রতীক হয়ে। সারাদেশ ঘুরে ঘুরে তিনি তরুণ প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করেছেন। সত্যকে নিঃশঙ্ক চিত্রে গ্রহণ করেছেন। একাত্তরে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা অকপটে বলেছেন। মানসিক যন্ত্রণাকে পাশ কাটিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তারপরও আমরা যদি কুসংস্কারে নিমজ্জিত থাকি তবে তার জন্য এ স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

শিল্পী হাশেম খান বলেন, বীরাঙ্গনাদের আমরা কতটুকু সম্মান দিয়েছি? অথচ তাদের বাদ দিয়ে স্বাধীনতার কথা ভাবা যায় না। প্রিয়ভাষিণীর মতো সাহসী মানুষ সেই অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। উল্টোদিকে তিনি ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী। এদেশের ভাস্কর্যশিল্পে তার অবদানটি অনন্য।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, আত্মপ্রকাশের যে সাহস দেখিয়েছিলেন তা বিরল। যারা মুক্তিযুদ্ধে বিপর্যস্ত একাত্তরের পরে শুরু তাদের নতুন যুদ্ধ। সে যুদ্ধ এখনও আছে। এক সময় সিদ্ধান্ত হল যে একাত্তরের নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিল তাদের কথা বলতে হবে। কী হয়েছিল, কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। শুরুতে পরিবারের লোকজন মানা করলেও আমরা যখন বোঝালাম এটা গর্ব। তখন তিনি কথা বলতে শুরু করলেন।

মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সুফিয়া কামাল-জাহানারা ইমামকে যেমন পেয়েছি, তেমনই পেয়েছি ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকেও। তিনি ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের অন্যতম শক্তির উৎস।

মুহাম্মদ সামাদ বলেন, যখন যেভাবে যতটা পেরেছেন মানুষের জন্য কাজ করেছেনÑএটাই ছিল প্রিয়ভাষিণীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

হাসান আরিফ বলেন, একইসঙ্গে সত্য ও সুন্দরের এক অভূতপূর্ব মিশ্রণে গঠিত মানুষ ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। প্রবল সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছেন সত্যের মুখোমুখি। তার মতো মানুষ যদি আরও বেশি জন্মাতো তাহলে এদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হতো না।

তুরিন আফরোজ বলেন, আজকের মতো অনেক অনুষ্ঠানে তাকে পাশে রেখে কথা বলেছি। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে কাজ করতে এসে তাকে যেভাবে দেখেছি এতে মনে হয়েছে আপা(ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী) একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর চিকিৎসক ড. আমজাদ বলেন, তাকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নেয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বললেন বাংলাদেশে চিকিৎসক থাকতে কেন বিদেশ যাব? দেশের প্রতি এই ছিল তার বিশ্বাস। এই মানুষটি যখন চোখের সামনে মারা গেলেন তখন কী যে খারাপ লাগছিল তা বোঝাতে পারব না।

সবশেষে সভাপতির বক্তব্যে গোলাম কুদ্দুছ বলেন, কিভুাবে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে হয়, সেটা আমাদের শিখিয়েছেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। শিখিয়েছেন বিরূপ পরিস্থিতিতে লড়াই করতে। নারীর মর্যাদা রক্ষায় কাজ করেছেন আমৃত্যু। তার সেই বিশ্বাস ও দর্শনকে ধারণ করেই নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।