• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ২১ সফর ১৪৪১

নববর্ষ ঘিরে প্রস্তুতি

বৈশাখী বাণিজ্যের আওতা বেড়েছে

সংবাদ :
  • রোকন মাহমুদ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল ২০১৯

সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের বেতনের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগ হয়েছে নববর্ষের উৎসব ভাতা। তার ওপর মিলছে তিনদিনের ছুটি। নেই নির্বাচনী কোন শঙ্কা। সবমিলে এবারের বর্ষবরণ হবে একেবারেই ভিন্নমাত্রায়। ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতিকে ঘিরেই বেড়েছে বৈশাখী বাণিজ্যের আওতা। এখন আর শুধু শাড়ি-চুড়ি আর পোশাক কেনাবেচাতে আটকে নেই বৈশাখী বাণিজ্য। আবর্তিত হচ্ছে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২টি খাতে। এর মধ্যে রয়েছে, ফুল, দাওয়াত পত্র, বেনার-ফেস্টুন, প্রসাধনী, খেলনা সামগ্রি, মাছ-মাংস, হোটেল রেস্তোরাঁ, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান, মিষ্টি, বিনোদন কেন্দ্র ও কুটির শিল্প ইত্যাদি প্রধান। এই বাণিজ্যের ঢেউ সাধারণ মানুষের গন্ডি পেরিয়ে করপোরেট প্রতিষ্ঠানেও লেগেছে।

জানা গেছে, এমনিতেই আমাদের দেশে বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে বেড়ে যায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম। তার ওপর যদি বাড়তি অর্থ পাওয়া যায় তবে উৎসবের মাত্রা ও পরিধি বেড়ে যায়। প্রাণের উৎসবের মধ্যে বাংলা বর্ষবরণ বা পহেলা বৈশাখ অন্যতম। পহেলা বৈশাখের উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখী ভাতা পাচ্ছেন গত তিন বছর ধরে। ২০ শতাংশ বৈশাখী উৎসব ভাতার পরিমাণ এবছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। গত বছর থেকে বেসরকারি ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও ভাতা দিতে শুরু করেছে। নিয়মিত আয়ের বাইরে বাড়তি অর্থ পেয়ে ইতোমধ্যে বাঙালির মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। সাধাণ মানুষের উৎসবের রসদ জোগাতে ব্যবসায়ীরাও সাজিয়ে বসেছে বাহারি পণ্যের পসরা। ব্যস্ত সময় পার করছে উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবখাতের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল, প্রেস পাড়া, কাঁচাবাজার ও ফুলের বাজারে ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে এমন চিত্রই পাওয়া যায়। এছাড়া বাড়তি চাপ সামলাতে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন হোটেল রেস্তোরাঁ, বিনোদন কেন্দ্র ও ব্যাংকগুলো। এবছর রোববার পহেলা বৈশাখ হওয়ায় সরকারি ছুটি থাকছে তিন দিন। সব মিলিয়ে বৈশাখকেন্দ্রিক ছোট অর্থনীতির আকারটি আগের তুলনায় আরও বেড়েছে।

সুনির্দিষ্ট তথ্য পরিসংখ্যান না থাকলেও দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ধারণা, পয়লা বৈশাখে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেশ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তবে টাকার অঙ্কের গন্ডির মধ্যে বৈশাখের অর্থনীতিকে আবদ্ধ করতে চান না বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, পয়লা বৈশাখ ঘিরে দেশের ঐতিহ্যবাহী বহু পণ্যের চাহিদা ও জোগান বেড়ে যায়। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প উপকৃত হয়। চাঙা ভাব আসে। অন্যদিকে ঈদের সময় ভারতীয় পোশাক দেদার বিক্রি হয়। তবে নববর্ষের সময় বিক্রি হওয়া ৯৯ শতাংশ পোশাকই দেশি। তাই শুধু টাকার অঙ্কে বৈশাখের প্রভাব বিচার করা যুক্তিসঙ্গত না।

রাজধানীতে থাকা মানুষের মধ্যে বৈশাখী পোশাক কেনার আগ্রহ বেশি থাকায় বুটিক ও ফ্যাশন হাউজগুলো তিন-চার মাস আগ থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে। মাস খানেক আগে থেকেই নিত্যনতুন নকশার পোশাক প্রদর্শন শুরু করে।

ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতি (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ)। সমিতি কয়েক বছর আগে একটি জরিপ করে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের ফ্যাশন হাউজে সারা বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। তার মধ্যে ৫০ শতাংশই হয় রোজার ঈদে। ২৫ শতাংশ হয় পয়লা বৈশাখে। বাকিটা সারা বছর। সারাদেশে পাঁচ থেকে ছয় হাজার ফ্যাশন হাউজ আছে। তার মধ্যে ঢাকাতেই ৬০ শতাংশ। ফ্যাশন হাউজগুলোতে এবার নববর্ষের বেচাকেনা ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এদিকে রাজধানীর পাশাপাশি বাইরের জেলাগুলোতে বৈশাখী পোশাকের বেচাকেনা ভালো হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা বলছেন। তারা বলেন, ঢাকার পাশাপাশি অন্য জেলা শহরের ফ্যাশন হাউজে ভালো ব্যবসা হচ্ছে খবর পাচ্ছি। গতবার কিন্তু এতটা সাড়া পাইনি আমরা। ব্যবসা এখন পর্যন্ত ভালো। এছাড়া বুকি হাউজগুলোরও এ উপলক্ষে রয়েছে বাড়তি প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে তারা পণ্যের ক্রয় আদেশ পেয়ে কাজ করছে রাত দিন।

সম্প্রতি চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ আগুনের ঘটনাও দমাতে পারেনি চকবাজারের খেলাসামগ্রি, চুড়ি-ফিতা, হালাক প্রসাধনী ও অলঙ্কার পণ্যের ব্যবসা। বৈশাখকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পাইকারি এবাজারে ভিড় করছে বৈশাখী মালামাল কিনতে।

এদিকে ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ না থাকলেও বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে গেছে পান্তা-ইলিশ। এ জন্য চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে কাঁচাবাজারে ইলিশ কেনার ধুম পড়ে যায়। অসময়ে ইলিশের চাহিদাকে পুঁজি করে দাম বাড়ান মাছ ব্যবসায়ীরা। এবছর ইলিশ ধরা বন্ধ থাকলেও বাজারে ঠিকই মিলছে। দামও দ্বিগুণ তিন গুণ বেড়েছে।

নববর্ষের দিন এই পান্তা-ইলিশের ব্যবসাও জমে ভালো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পান্তা-ইলিশের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকার রেস্তোরাঁয়। চড়া দামে পান্তা-ইলিশ খেয়ে তৃপ্ত হন অনেক নগরবাসী। এবারও এই প্রস্তুতিতে ব্যস্তা রেস্তোরাঁ মালিকরা। বিভিন্ন হারে ছাড় আর বাড়তি সুযোগও ঘোষণা করেছেন তারা।

হালখাতার চল অনেকটা ফিকে হলেও পুরান ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী নতুন খাতা খুলে বছর শুরু করেন। সেই সঙ্গে মিষ্টি নিমকি দিয়ে ক্রেতা ও বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়ন করার ঐতিহ্যটি এখনো টিকে আছে। অন্যদিকে বছরের প্রথম দিনটি ছুটি থাকলে পরদিন মিষ্টি খাওয়ার চল তৈরি হয়েছে অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানে। ফলে মিষ্টির ব্যবসা বেশ ভালোই চলে।

নতুন বছর। তাই শুভেচ্ছা জানাতে হবে। কার্ড ছাপিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর রেওয়াজটি ধরে রেখেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নেতারা। এলাকায় পোস্টার লাগিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা মানুষজনকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও বিষয়টিতে এখনো মরচে পড়েনি। এ ছাড়া নকশা করা কাগজের হাতপাখা ও রোদটুপি ছাপা হচ্ছে। তবে ক্যালেন্ডার ছাপানো কিছুটা কমেছে। সব মিলিয়ে মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর (প্রিন্টিং প্রেস) ব্যবসাও মন্দ না।

বৈশাখ উপলক্ষে এরই মধ্যে বিভিন্ন আউটলেট, ফ্যাশন হাউস ও শপিং মল বিশেষ ছাড়ের অফার দিয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক অফার ঘোষণা করেছে। এসব সেবার ঘোষণা দিয়েছে বিভিন্ন দোকানের জন্যও। বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকও তাদের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটার ওপর ১০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ও ক্যাশব্যাক অফার দিয়েছে। নামিদামি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাবারে ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফার দিয়েছে কিছু ব্যাংক।

এবার পহেলা বৈশাখ পালিত হবে রোববার। আগের দুই দিন শুক্র ও শনিবার সরকারি ছটি থাকায় মোট ছুটি তিন দিন। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও ভীড় থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই তারাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাড়তি সেই চাপ সামলাতে।

তবে রাজধানীতে মেট্রোরেলের কাজ চলতে থাকায় ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও এখন বসতে পারছেনা। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের বৈশাখী কেনা কাটায় কিছুটা ভাটা পড়েছে।