• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০, ০১ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৪ জিলকদ ১৪৪১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়

নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় গ্রাম ছাড়ল মানুষ নষ্ট হচ্ছে ধান

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

| ঢাকা , শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের থানাকান্দি গ্রাম। গ্রেফতার আতঙ্কে শত শত লোক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ কারণে বন্ধ রয়েছে ধানকাটা। পানিতে তলিয়ে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অভিযোগÑ পরাজিত আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের বাড়িঘর ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হচ্ছে সমানে। একপক্ষের মেয়েছেলেরাও গ্রাম থেকে বিতাড়িত। নির্বাচনের পরদিন থেকে শুরু হওয়া এই বিরোধ ঠেকাতেগ্রামে বসানো হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। তারপরও শান্তি ফিরেনি গ্রামটিতে।

জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ নবীনগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পরদিন স্বতন্ত্র প্রার্থী দোয়াত-কলম প্রতীকের মনিরুজ্জামানের সমর্থক কৃষ্ণনগর ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান আর নৌকার সমর্থক কাউসার মোল্লার গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় কাউসার মোল্লার সমর্থকদের ঘরবাড়ি ভাংচুর, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ করা হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় নবীনগর থানায় এসআই জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১২শ’ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলা হওয়ার পর থেকে গ্রেফতার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কাউসার মোল্লার সমর্থকরা। কাউসার মোল্লার সমর্থকদের অভিযোগ, নৌকার নির্বাচন করায় স্বতন্ত্র প্রার্থীপক্ষের জিল্লুর রহমানের লোকজন নির্বাচনের পরদিন তাদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তাদের অত্যাচারে এখন তারা গ্রামছাড়া। ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান ও তার আত্মীয়স্বজন এসব ঘটনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেই অভিযোগ করেন তারা। পুলিশও তাদের পক্ষ নিয়ে হয়রানি করছে। ওই ঘটনার পর ১৯ দিন ধরে থানাকান্দি গ্রামের শত শত লোক বাড়িছাড়া। গ্রামের নারী ও শিশুরা বাড়িতে থাকলেও সন্ধ্যার পর হামলার আতঙ্কে থাকেন তারা। কাউসার মোল্লার পক্ষের লোকজন জানান, হামলার সময় তাদের প্রায় ৫০টি ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। এ সময় কয়েকটি ঘরে আগুন দেয়া ও আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়। পার্শ্ববর্তী বড়াইল ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে পাগলা নদীর পাড়ে জমি থেকে কেটে আনা ধান প্রক্রিয়া করছিলেন গ্রামছাড়া আনোয়ারা বেগম। তিনি জানান চেয়ারম্যানের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে গিয়ে জমির ধান কাটতে হয়। ধানকাটার জন্য কানিপ্রতি ১ হাজার টাকাও দিতে হয়। গ্রামে অত্যাচারে থাকতে না পারার কথাও জানান এই নারী। গ্রামছাড়া মো. মুকসুদ মিয়া জানান, দোয়াত-কলম মার্কা পস করার পরদিন থেকে তাদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়। চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান আর তার ভাই-ভাতিজারা বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছে। তার ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে। ১৯ দিন ধরে বাড়িছাড়া তিনি। তার ঘর ছাড়াও মোস্তাকিম, হোসেন, খোকন, স্বপন ও জহির মিয়ার বাড়ি ও দোকানপাটে হামলা-ভাংচুর হয়েছে বলে জানান মুকসুদ। থানাকান্দি গ্রামে গেলে হেনা নামের আরেক নারী বলেন, রাতে বাড়িতে থাকতে পারি না। উপযুক্ত মেয়েদের বাড়ি থেকে অন্যত্র সরিয়ে রেখেছি। গ্রামের আরেক বৃদ্ধ মজলিশ বেগম জানান, চেয়ারম্যানের লোকজন আমার বাড়িতে ঢুকে আমার কোমরে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। এরপর আমার ঘরে ভাংচুর করেছে। একটা মানুষও ধান কাটতে পারছে না। বলেছে, ১ হাজার টাকা দিয়ে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর না নিলে ধান কাটতে দেবে না। আরেকজন আক্তার মিয়া বলেন, ‘সরকারি নির্বাচন (নৌকা প্রতীক) কেন করলাম, এ কারণে আমাদের বলেছেÑ তোরা দেশে থাকতে পারবি না। পুলিশও হুমকি দিতাছে ধইরা লাইবো, মাইরা লাইবো।’ হামলার সময় তার ঘরে থাকা ছেলের বিদেশে যাওয়ার টাকাও লুট করে নেয়া হয়।

আসেদ মিয়ার ৪ কানি জমির বোরো ফসল কাটা বাকি। তার ছেলেরা বাড়িছাড়া বলে ফসল কাটতে পারছেন না। গ্রামের কাউসার মোল্লার পক্ষের লোকজনেরই অভিযোগ, পুলিশ পক্ষপাতিত্ব করছে। থানাকান্দি ছাড়াও উত্তর লক্ষ্মীপুর, সাতঘরহাটি ও গৌরনগর গ্রাম অশান্ত নির্বাচনোত্তর এই বিরোধে। ১৯ দিন ধরে শত শত মানুষ বাড়িছাড়া। আর এ কারণে ফসল কাটাও বন্ধ। এ ব্যাপারে জানতে কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জিল্লুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তা রিসিভ করেননি।

নবীনগর থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) রাজু আহমেদ জানান, পুলিশ নৌকা বা দোয়াত-কলমপক্ষ বিবেচনা করে আসামি ধরছে না। যারা দাঙ্গায় লিপ্ত ছিল, তদন্ত করে তাদেরই ধরা হচ্ছে। নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না দাবি করে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত উভয়পক্ষের ৩০ জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, যারা সাধারণ মানুষ, তাদের কোনো সমস্যা নেই। তারা ধান কাটতে পারেন।