• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৯ ফল্গুন ১৪২৬, ২৭ জমাদিউল সানি ১৪৪১

রাজধানীর সুপার মার্কেটে আগুন

দোকানের মালই নয় পুড়ে ছাই হলো স্বপ্নও

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

image

মিজানুর রহমান মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ দিয়ে কর্ম জীবনের শুরু। ২০১২ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর এ কাজ করেই মাসহ এক ভাই ও এক বোনের সংসারে হাল ধরেন কুমিল্লার ছেলে মিজান। তখন থেকেই তিল-তিল করে টাকা জমানো শুরু করেন নিজে একটি দোকান করবেন বলে। এরই ধারাবাহিকতায় অনেক কষ্টের জমানো অর্থের সঙ্গে ঋণের টাকা যোগ করে মাত্র ৬ মাস আগেই স্বপ্ন পূরণের পথে চলা শুরু হয় মিজানের। তবে গত বুধবারের আগুনে রাফি টেলিকম দোকানটি পুড়ে গিয়ে এখন নিস্ব তিনি। এমনকি শেষ সম্বল দোকানে রাখা নগদ ৫০ হাজার টাকাও পুড়ে ছাই হয়েছে তার। কি হবে সামনে সেই চিন্তায় তিনি এখন পাগল প্রায়। টিকাটুলির নিউ রাজধানী মার্কেটের দ্বিতীয় তলার প্রায় সব দোকানিরই এমন অবস্থা এখন গত বুধবারের আগুনে শুধু দোকানের মালই নয় পুড়ে ছাই হয়েছে স্বপ্ন, ভবিষ্যত ও আগামীর পথ চলা। নিউ রাজধানী মার্কেটের স্বর্ণপট্টির দ্বিতীয় তলায় গতকাল সরজমিনে ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, পুরো রাজধানী মার্কেটে ১ হাজার ৭৮৮টি দোকান রয়েছে। তবে সেখানে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। গত বুধবারের অগ্নিকাণ্ডে দোতলায় থাকা ৯টি ফায়ার এক্সটিংগিউশারের একটিও কাজ করেনি। মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ইসলাম বেডিংয়ের গোডাউন শাটারের তালা লাগানোর ফাঁকা জায়গাটি ভেঙ্গে যাওয়ায় তা ঠিক করতেই গত বুধবার বিকেলে মিস্ত্রী মজনু ওয়েলডিং করতে যায়। তখনও গোডাউনটি তালা বন্ধ ছিল। এর মধ্যেই কাজ করার সময় ওয়েলডিং থেকে সৃষ্ট আগুনের ফুলকি ভেতরে চলে যায়। প্রথমে না বুঝলেও পরে ধোঁয়া বের হতে শুরু করলে তারা শাটারের অপর প্রান্তের তালা ভাংতে-ভাংতেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতেই অগ্নিকাণ্ডে সেখানে থাকা মোট ৭২টি মধ্যে অধিকাংশ দোকানই পুড়ে যায়।

বিক্রমপুর ইলেকট্রিক দোকানের মালিক আমিরুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কথা শুনে তিনি দৌড়ে আগুন নেভাতে যান। যাতে তার দোকান পর্যন্ত আগুন না আসে। কিন্তু ২য় তলায় থাকা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র একটিও কাজ করেনি। ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে তার দোকানেও। প্রায় ৩০ লাখ টাকার মালই নয় আগুনে তার বাকি দেয়া ক্রেতাদের টালি খাতাও পুড়ে যায়। তিনি জানান, বাকি টাকা যে এখন তুলবেন সেই সুযোগও শেষ। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত বলে নির্বাক হয়ে যান তিনি।

আল মাহের জুয়েলার্সের মালিক আবু তাহের বলেন, নিচতলায় তার দোকানসহ মোট ৪৩টি গয়নার দোকান আছে। আগুন লাগার পর প্রাণ হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় শাটার নামানো হলেও অনেকে তালা মারতে পারেননি। তাহেরের ধারণা মার্কেটের দোতলায় মাঝ বরাবর আগুনের সূত্রপাত হয়। সেখানে পোশাক, টেইলার্স, ফোম, কসমেটিকস, খেলনা ও খাবারের দোকান আছে। এসব দোকানের খাবার বাইরে থেকে রান্না করে আনা হয়। জানা গেছে, প্রায় সপ্তাহ খানেক আগেও ওই মার্কেটে মহড়া দিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। এর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটলো। মার্কেটটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। পানির ব্যবস্থাও ছিল না।

এদিকে রাজধানী সুপার মার্কেট আগ থেকেই অগ্নিঝুকিতে ছিল। টিনসেট এ মার্কেটে শ’ শ’ দোকান থাকলেও আগ থেকে অগ্নিনির্বাপণের কোন ব্যবস্থাপনা ছিল না। মার্কেটের ব্যবসায়ীরা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনা তৈরি করার জন্য নিয়মিত চাঁদা দিলেও সেই ব্যবস্থাপনা করেনি মার্কেট পরিচালনায় থাকা মালিক সমিতি। এর মূল কারণ ছিল মার্কেট মালিক সমিতি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুর দখলে ছিল। মূলত ওই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ করত সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া ঢাকা দক্ষিণের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু। নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে মার্কেট দখলে নিয়ে প্রত্যেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন মঞ্জু। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনা ছাড়াও মার্কেটে বৈদ্যুতিক সংযোগের টাকা নিজেই আত্মসাৎ করতেন মঞ্জু। ওই মার্কেটে বৈদ্যুতিক লাইনও ছিল অবৈধ।

ফায়ার সদর দফতরের উপপরিচালক দেবাশিষ বর্ধন জানান, আগুনের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যর একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে মার্কেটটিতে ফায়ার কমপ্লাইন্স ছিল না বললেই চলে। ছিল না হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা। যার ফলেই এত বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে। তিনি বলেন, আমরা এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই অগ্নি নিরাপত্তার বিষয়ে ব্যাপক জোর দিয়েছি। ঝূঁকিপূর্ণ স্থানে আমরা ব্যানারও লাগিয়েছি। কিন্তু এর পরেও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে হলেও সচেতন হচ্ছে না মানুষ।

নোটিশ দেয়া ছাড়া আমরা কোন ব্যবস্থা নিতে পারি না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের বিচারকি ব্যবস্থা নেই। তবে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট চেয়েছি। আশা করছি শীঘ্রই পাব। মার্কেটটির সাবেক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু নাসের সেন্টু জানান, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের আগে অঘোষিত কমিটির প্রধান কাউন্সিলর মঞ্জু মার্কেটের উন্নয়নে কোন কাজই করেননি। তবে তারা নতুন কমিটি করার কাগজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনে প্রসাশনের সঙ্গে কথা বলছেন তারা। উল্লেখ্য, টিকাটুলিতে রাজধানী সুপার মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত বুধবার সন্ধ্যা ৫টা ১১ মিনিটের দিকে মার্কেটটির দ্বিতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউটিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।