• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২৫ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

রংপুর সিটি করপোরেশন

দুর্নীতির তদন্ত নিয়ে প্রতিরোধ কমিটির প্রশ্ন

সংবাদ :
  • লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর

| ঢাকা , শনিবার, ০৬ এপ্রিল ২০১৯

রংপুর সিটি করপোরেশনের ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও দুর্নীতি দমন কমিশন তার তদন্ত না করে অধ্যস্তন কর্মকর্তাদের ৮ লাখ টাকা দুর্নীতি করার অভিযোগ তদন্ত করে মামলা দায়ের করেছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রংপুরের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নেতারা।

জানা গেছে, রংপুর সিটি করপোরেশনের অধিন চিকলী বিল উন্নয়ন ও শিশু পার্ক নির্মাণের নামে টেন্ডার আহ্বান না করেই প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা ঘটলেও সিটি করপোরেশনের দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও দুই সাবেক কাউন্সিলরসহ ৫ জনের নামে ভুয়া বিল ও ভাউচার তৈরি করে মাত্র ৮ লাখ ১৮ হাজার ১শ ৩১ টাকা আত্মসাৎ করার গল্প বানিয়ে অভিযোগ এনে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অথচ চিকলী বিল উন্নয়ন প্রকল্পের সদস্য সচিব সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আযম প্রধান সহযোগী ছিলেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন খান ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুল হাকিমের নামে কোন মামলা দায়ের করেনি দুদক। অথচ তারাই ভুয়া ভাউচারের নামে কোটি টাকা প্রদানসহ সব অপকর্মের হোতা ছিলেন। তাদের রক্ষা করতেই পুরো ঘটনাকে গোপন করে মাত্র ৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে যাদের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে তারা হলেন সিটি করপোরেশনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ, উপসহকারী প্রকৌশলী জুয়েল আহাম্মেদ, সাবেক কাউন্সিলর আকরাম হোসেন, শফিকুল হক দুলাল ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সেকেন্দার আলী। যার মামলা নম্বর ৩৬ তারিখ ১২.০৮.১৮ইং।

সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষই বলেছে যেখানে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে সেখানে পুরো ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে মাত্র ৮ লাখ টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের গল্প তৈরি করে নিম্নপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা ও ব্যক্তিকে আসামি করে দুদকের মামলা দায়ের করার ঘটনায় হতবাক হয়েছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাসহ নগরবাসী। অথচ চিকলী বিল উন্নয়ন প্রকল্পের সদস্য সচিব ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আযম, অগ্রিম টাকা দেবার ঘটনার প্রধান হোতা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন খান, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুল হাকিমকে আসামি করেনি দুদক।

জানা গেছে রংপুর সিটি করপোরেশনে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাবার পর দৈনিক সংবাদের পক্ষ থেকে তথ্য অধিকার আইনে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ তথ্য না দেয়ায় তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হয়। দীর্ঘ ৭ মাস পর তথ্য কমিশনের নির্দেশে চাহিত সব তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তারিখ থেকে পর পর চারদিন সংবাদে চার পর্বের খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন পুরো বিষয় অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্ত করার জন্য দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবদুস সোবহানকে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর ওই তদন্তকারী কর্মকর্তা সিটি করপোরেশনের চিকলী বিল আধুনিকীকরণ প্রকল্প, টেন্ডারের ফাইলসহ বিভিন্ন কাগজপত্র সিজ করে নিয়ে যান। এরপর ওই কর্মকর্তা কয়েক দফা রংপুরে এসে তদন্তের নামে পুরো বিষয়টিতে ধামাচাপা দেবার জন্য নানান কৌশল গ্রহণ করেন। অথচ ওই প্রকল্পের সদস্য সচিব ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আযম আর কোন কাগজপত্র ছাড়ায় অবৈধভাবে প্রায় কোটি টাকা আগাম প্রদান করেন প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুল হাকিম আর টেন্ডার আহবান না করে কোটি কোটি টাকার কাজ করার নামে লুটপাটের ঘটনায় প্রধান সহযোগী ছিলেন তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন খান। অথচ তাদের বাদ দিয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী আসাদসহ ৫ জনের নামে দুদক আইনে লোক দেখানো মামলা দায়ের করা হয়। যার নম্বর কোতয়ালী থানা মামলা নম্বর ৩৬ তারিখ ১২.০৮.১৮ইং।

দুদকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে তদন্তকারী দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ পরিচালক আব্দুস সোবহান অবসরে যাবার আগে দুদকের রাজশাহী বিভাগের তৎকালীন পরিচালক আব্দুল আজিজ (তিনিও অবসরে গেছেন) দুজনে মিলে অনুসন্ধানে কিছুই পাওয়া যায়নি মর্মে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে রংপুর দুদক কার্যালয়ে পাঠান ।

এরপর রংপুর সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফাইলটি রংপুর দুদকের দুজন কর্মকর্তা তদন্ত করে তারাও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি প্রতিবেদন দুদক প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুদক প্রধান কার্যালয়ের মহাপরিচালক (তদন্ত) মো. মোস্তাফিজার রহমান দুদক বিভাগীয় কার্যালয় রাজশাহী ও দুদক রংপুরের সমন্বিত জেলা কার্যালয় রংপুরের দুটি স্মারকের চিঠির উপর ভিত্তি করে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি তারিখে একটি আদেশ জারি করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয় ‘রংপুর সিটি করপোরেশনের টেন্ডার ছাড়াই শিশু পার্কের নি¤œ মানের রাইড কিনে সাত কোটি টাকার অনিয়ম, জনবল নিয়োগ, সেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যাবহার, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পদোন্নতী প্রদান করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমানিত না হওয়ায় কমিশন কর্র্তক পরিসমাপ্তির সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে।’ যার স্মারক নম্বর দুদক/দর/২৪/২০১৬/রংপুর তারিখ ২৭.০১.১৯ইং।

এ ব্যাপারে দুদক রংপুর সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান বিষয়টি আগে যারা তদন্ত করেছেন তাদের দেয়া প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে আমরাও প্রতিবেদন দিয়েছি বলে জানান। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেয়া প্রতিবেদনে হাত দেবার ক্ষমতা তাদের নেই।

এদিকে দুদকের এ ধরনের তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দায়মুক্তি দেবার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে দুদকের সহযোগী সংগঠন দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নেতৃবৃন্দ। রংপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন জানান রংপুর সিটি করপোরেশনে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই আড়াই শতাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি বাণিজ্য করার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট ছিলো। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সভা করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ঘটনা তদন্তের জন্য দুদককে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু দু’বছর পর তদন্তের পর তিন প্রধান অভিযুক্তকে বাদ দিয়ে দায়মুক্তি দেবার ঘটনায় তিনি হতবাক হয়েছেন বলে জানান। সেই সঙ্গে আবারো পুরো ঘটনা তদন্ত করার জন্য দুদক চেয়ারম্যানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অপরদিকে রংপুর নাগরিক কমিটির মহানগর আহবায়ক আনোয়ারুল হোসেন বাবলু জানান এ ঘটনার মধ্য দিয়ে দুদকের কর্মকান্ড প্রশ্নের মুখে পড়লো তিনি অবিলম্বে পুনঃতদন্ত করার দাবি জানান।