• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ ১৪৪০

সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যার ৭ বছর

গ্রেফতার হয়নি খুনি উদঘাটন হয়নি রহস্য

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকান্ডের ৭ বছর পার করে ৮ বছরে যাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনি গ্রেফতার ও রহস্য উদঘাটন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচিত ঘোষণা কবে বাস্তবায়ন হবে কেউ জানে না। আজ সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহরুন রুনিকে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের ৭ বছর পূর্তি। দীর্ঘ ৭ বছরে পুলিশের তদন্তে দেশ-বিদেশে আলোচিত এ হত্যাকান্ডের কূল কিনারা হয়নি। পুলিশের ‘গাফিলতি ও অবেহলায়’ অদৌ সাগর ও রুনির হত্যার রহস্য বের হবে কিনা তা নিয়ে রীতিমতো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও রহস্য উদঘাটন’ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্য ৭ বছরেও প্রতিফলন হয়নি। বরং নানাভাবে পুলিশ এ মামলার তদন্তে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, রহস্যজনক কারণে এ মামলার ক্লু উদঘাটনে পুলিশ অনেকটা নীরব। দীর্ঘ ৭ বছরে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে ৬ বার। প্রথমে থানা পুলিশ পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত শেষে তদন্ত দায়িত্ব দেয়া হয় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন র‌্যাবকে। আদালতে এ পর্যন্ত কয়েকবার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন দিলেও তদন্তের কূল-কিনারা করতে পারেনি বতর্মান তদন্ত সংস্থা র‌্যাবও। আর পারবে কিনা তা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।

নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ভাই নওশের রোমান সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তের অগ্রগতি কি হচ্ছে? র‌্যাব কেন কোন কথা বলছে না? তারা না পারলে ডিবির মতো তদন্ত ছেড়ে দিক। সেটাও তো করে না। বিচার না পেয়ে দিন দিন আমাদের হতাশা বাড়ছে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বজনরা জানায়, সাগর-রুনি দম্পতির একমাত্র ছেলে মাহীর সরওয়ার মেঘ রাজধানীর বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড সিক্সে পড়ছে। ছোট্ট মেঘ বড় হচ্ছে। বাবা-মায়ের হত্যাকান্ড নিয়ে কিছুটা বুঝতেও শুরু করেছে। এ নিয়ে মেঘ কথাও বলে তার মামা নওশের রোমানের সঙ্গে। ঘটনার পর থেকে মামার কাছেই থাকা মেঘ।

সাংবাদিক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ ৭ বছর পার হয়ে গেলেও সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকান্ডের কূল-কিনারা হচ্ছে না। অদৃশ্য ইশারার কারণে খুনিদের মুখোশ উন্মোচন করতে পারছে না পুলিশ। এ পর্যন্ত তদন্তের ফলাফল শূন্য। পুলিশ পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে দেশ-বিদেশে আলোচিত এ হত্যাকান্ডের ক্লু উদঘাটনে। পুলিশ শুরু থেকেই হত্যার মোটিভ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সাংবাদিক সমাজের প্রতিবাদের কারণে তা করতে পারেনি। এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে এমন কোন মহল জড়িত যা পুলিশ প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। সাংবাদিকরা এ হত্যার আলামত নষ্ট করেছে এমন মন্তব্য, গ্রিল চোরকে বাসায় উঠিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা ডাকাতি করতে গিয়ে হয়েছে এমন অনেক কারণ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে পুলিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, তদন্ত শেষে কবে নাগাদ অভিযোগপত্র দেয়া যাবে- সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্তের প্রয়োজনে র‌্যাবের মাধ্যমে যেসব পরীক্ষা নীরিক্ষা করা হয়েছে সেগুলোর রিপোর্ট পাওয়া গেছে। ওইসব রিপোর্টে কী রয়েছে তা বলা যাবে না। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় যে আটজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল, তার মধ্যে দুজন জামিনে বেরিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বাকিরা জেলে রয়েছে।

তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের এএসপি মো. শহিদার রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষাসহ তদন্তের প্রয়োজনে যে সব পরীক্ষা করা হয়েছিল, সবগুলোর ফলাফল তারা পেয়েছেন। বিদেশে করা পরীক্ষার ফলাফলও তাদের হাতে এসেছে। এসব পরীক্ষায় কী ফলাফল পাওয়া গেছে- জানতে চাইলে ‘তদন্তের স্বার্থে’ এখন কিছু বলতে রাজি হননি এই র‌্যাব কর্মকর্তা। অভিযোগপত্র কবে নাগাদ দিতে পারবেন- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। চার্জশিট দেয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ দেয়ার সুযোগ নেই। সময় হলে চার্জশিট দেয়া হবে।’

আদালতের নিয়মে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন রয়েছে। তবে এই পর্যন্ত আদালত থেকে ৬৩ বার সময় নিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। সময়ে সময়ে তারা দিয়ে যাচ্ছেন তদন্তের অগ্রগতির প্রতিবেদন। ২০১৭ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ফরেনসিক উইংয়ের সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহমেদ একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন আদালতে।

র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায় ‘গতানুগতিক তদন্তের বাইরে গিয়ে অত্যাধুনিক তদন্ত পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ প্রাপ্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি অত্যাধুনিক ল্যাবকে এ তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ল্যাব থেকে পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। বিদেশে পাঠানো আলামতের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে দেশে চালানো বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়. ঘটনার পর হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন ওই বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মাসুম মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ ও আবু সাঈদ। রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান ও বাড়ির দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল জামিনে বাইরে রয়েছেন।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। দুজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই রাতে তারা ছাড়া ঘরে ছিল তাদের একমাত্র শিশুসন্তান মেঘ। ৫ বছরের মেঘের সামনেই তার বাবা-মাকে হত্যা করে খুনীরা। হত্যাকান্ডের পরদিন ভোরে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকান্ডের পর রুনির ভাই মো. নওশের আলম রোমানের করা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই জহুরুল ইসলাম। তার কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব গিয়েছিল ডিবির পরিদর্শক রবিউল আলমের কাছে। ৬২ দিন পর ডিবি আদালতের কাছে ব্যর্থতা স্বীকার করলে ২০১২ সালের এপ্রিলে তদন্তের দায়িত্বে আসে র‌্যাব। এরপর র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার হাত ঘুরে তদন্তভার আসে এএসপি শহিদারের কাছে।

সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের দিনটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। আজও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের সমাবেশ রয়েছে।