• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ ১৪৪০

অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ কি মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য হুমকি!

সংবাদ :
  • সংবাদ ডেস্ক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৯

image

গত বৃহস্পতিবার লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করার সময়

এক দশক আগে (২০১০ সালে) যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি অতি গোপনীয় তথ্য ফাঁস করে বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগানো বিকল্প ধারার সংবাদ মাধ্যম উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গত বৃহস্পতিবার লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে গ্রেফতার করা হয়। ৭ বছর ধরে ওই দূতাবাসে অবস্থান করার পর তাকে লন্ডন পুলিশ গ্রেফতার করায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করার ঝুঁকিতে রয়েছেন তিনি। তবে জানা গেছে, আদালতে আসাঞ্জের বিরুদ্ধে হ্যাকিংয়ের অভিযোগ আনা হলেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য প্রকাশের কোন অভিযোগ করেনি মার্কিন সরকার। ধারণা করা হচ্ছে, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হানার বিষয়টি এড়াতেই এ কৌশল নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে বৃহস্পতিবার তাকে গ্রেফতারের পর যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিনিস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হয়। ২০১২ সালের জুন থেকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। গত ৪ এপ্রিল উইকিলিকসের পক্ষ থেকে দেয়া এক টুইটবার্তায় দাবি করা বলা হয়, ইকুয়েডর সরকারের উচ্চপর্যায়ের দুটি সূত্র থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে, কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে অ্যাসাঞ্জকে দূতাবাস থেকে তাড়ানো হতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাহার করে বৃহস্পতিবার তাকে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তুলে দেয় ইকুয়েডর। জামিন শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি ছিল। বৃহস্পতিবার সেই পরোয়ানা অনুযায়ীই তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর অ্যাসাঞ্জকে লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এদিন আদালত জামিনের শর্ত ভঙ্গের দায়ে আসাঞ্জকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এদিকে জানা গেছে, সরকারের গোপন তথ্য সংবলিত একটি কম্পিউটার হ্যাকের যড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য জুলিয়ান আসাঞ্জকে অভিযুক্ত করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ (ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট)। গত বছর মার্চে উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে ভার্জিনিয়া আদালতে এ অভিযোগ দায়ের করা হলেও এতদিন তা গোপন রাখা হয়। বৃহস্পতিবার অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার হওয়ার পর বুধবার এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেখানে গোপনীয় তথ্য প্রকাশের জন্য তার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। এটিকে মার্কিন সরকারের একটি কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর এ ঘটনার প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই অভিমত বিশ্লেষকদের।

নিরাপদ কৌশল : আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে শুধু হ্যাকিংয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে চতুর একটি সিদ্ধান্ত। গোপন তথ্য প্রকাশের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির অপেক্ষাকৃত বড় অভিযোগ আনার সুযোগ ছিল তাদের সামনে। কিন্তু মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংক্রান্ত ধারাটির ওপর তা সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এমন আশঙ্কায় তা সুকৌশলে এড়ানোর চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার আইনের অধ্যাপক ফ্রেডরিখ শাওয়ার বলেন, ‘অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে তথ্য প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়টি বাদ দিয়ে অবৈধভাবে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সাংবিধানিকভাবে নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, অন্য দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তথ্য প্রকাশের আইনটি পৃথক। সেখানে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা তথ্য প্রকাশ শুধু বৈধই নয়, এমনকি সাংবিধানিকভাবে তা সুরক্ষিতও। তাই অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগপত্রে মার্কিন সরকার দাবি করেছে, ‘অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্টস’ ও যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক ‘সিক্রেট ইন্টারনেট প্রটোকলের’ সঙ্গে যুক্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি কম্পিউটারের সংরক্ষিত পাসওয়ার্ড ভাঙার বিষয়ে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছিলেন’- এ অভিযোগ প্রমাণ হলে অ্যাসাঞ্জকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হতে পারে। অধ্যাপক শাওয়ার বলেন, ‘আমার মতে প্রকাশনা সংক্রান্ত কোন অভিযোগ না আনা, সরকারের দিক থেকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল।’ তবে তাতে গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কোন কিছু প্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগ থেকে ট্রাম্প প্রশাসন মুক্ত হবে না বলেও অভিমত তার। শাওয়ার বলেন, ‘তারপরও অনেক মানুষ সংবিধানের প্রথম সংশোধনী নিয়ে কথা বলবে, অনেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করবে। কিন্তু অন্তত সংবিধানের বিদ্যমান ধারা অনুযায়ী অবৈধভাবে তথ্য হাতিয়ে নেয়া আর পরে তা প্রকাশÑ এ দুটি বিষয় আলাদা, সেটি পরিষ্কার।’

সাংবাদিকতার ওপর কালিমা লেপন : অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে যারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাইট ফাস্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক জামিল জাফর। তার মতে, অভিযোগপত্রে সরকারি কম্পিউটার হ্যাকিং করাকে গোপন তথ্য প্রকাশের থেকে আলাদা করে দেখানোটা তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, এ অভিযোগপত্রে সাংবাদিকতার এমন অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যা শুধু আইনসঙ্গতই নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতারও মূল বিষয়। সাংবাদিকরা যেভাবে তাদের সোর্স (সূত্র) বজায় রাখেন এবং তাদের সঙ্গে নিরাপদে যোগযোগ করেন সে প্রক্রিয়া এর মাধ্যমে হুমকির মুখে পড়েছে বলেও মনে করেন তিনি। অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগপত্রে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও উইকিলিকসের কাছে তথ্য ফাঁসকারী চেলসিয়া ম্যানিংসহ অন্য ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ সঙ্গে অ্যাসাঞ্জ কিভাবে অনলাইন চ্যাটের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছেন এবং ‘ক্লাউড ড্রপ বক্সের’ মাধ্যমে কীভাবে তথ্য আদান-প্রদান করেছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ‘এটা পরিষ্কার যে, অভিযোগের মূল লক্ষ্য হলো সাংবাদিকতায় সম্পূর্ণ বৈধ এসব পন্থার ওপর কালিমা লেপন করা, যা বেআইনিভাবে সরকারি তথ্যভান্ডার হ্যাক করার এ অভিযোগের মধ্য দিয়ে করা হচ্ছে’ বলে জানিয়েছেন জাফর। তার মতে, ‘একদিক থেকে এটা ভালো যে, অভিযোগে সরকারি তথ্যভান্ডার হ্যাকের ওপরই জোর দেয়া হয়েছে। তবে বড় সমস্যার দিক হলো অভিযোগপত্রে সাংবাদিকতার সম্পূর্ণ বৈধ কর্মকা-গুলোকে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’

মারাত্মক প্রভাব : পরিচালক জাফরের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে পরে আরও অনেক অভিযোগ আনতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে শত্রুর দৃষ্টিতে দেখছে, বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। বিচার বিভাগ কীভাবে অ্যাসাঞ্জের মামলাটি পরিচালনা করছে তার ওপর গভীর নজর রাখা প্রয়োজন বলেও অভিমত তার। তাই তিনি বলেন, ‘সরকারের এ মামলা পরিচালনা প্রক্রিয়া সাংবাদিকতার ওপর মারাত্মক ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।’