• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মহররম ১৪৪১

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জের

হুমকির মুখে ইরান-ভারত সম্পর্ক

বিবিসির বিশেষ প্রতিবেদন

সংবাদ :
  • সংবাদ ডেস্ক

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

image

মোহাম্মদ জাবেদ জারিফ ও সুষমা স্বরাজ

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে সম্প্রতি ইরান থেকে জ্বালানি তেল কেনা বন্ধ করেছে ভারত। তবে দেশটিতে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ইরান। পর্যবেক্ষকদের অভিমত, ভারতকে রাজি করতে প্রয়োজনে চাবাহার বন্দরকে হাতিয়ার করতে পারে ইরান। তেহরানের কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভারত সফরে এসে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাবেদ জারিফ। তবে তাদের বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি । ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ভারত। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যম বিবিসির বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত বিশেষ এক প্রতিবেদনে ভারতের এ উভয় সংকটের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গত বছরের নভেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা চাপায়, তখন ভারতসহ আটটি দেশকে ইরান থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দেয়া হয়। তবে চলতি বছর মে মাসে সেই অব্যাহতির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। আর এ পরিস্থিতিতেই ভারত ও ইরান দুই দেশই সংকটে পড়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে ইরান থেকে ভারত জ্বালানি তেল কেনা বন্ধ করার মাত্র কয়েকদিনের মাথাতেই দিল্লি জরুরি সফর করেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুরে দিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করে জারিফ তেহরান ফিরে যান। তবে এ বৈঠক সম্পর্কে দেশ দুটির পক্ষ থেকে কোন বিবৃতি দেয়া হয়নি। পর্যবেক্ষকদের অভিমত, ভারত যেন ইরান থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখে সেজন্য তেহরান দিল্লিকে চাপে রাখতে চাইছে। আর এ জন্যই দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে চাবাহার বন্দরকে। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম জলসীমার খুব কাছে অবস্থিত চাবাহার বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে ভারত। বিনিময়ে মেলে চাবাহার বন্দর ব্যবহারের অধিকার। এ বন্দর থেকে ৭২ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তানে চীন গদর বন্দর নির্মাণ করছে। ফলে চাবাহার বন্দরটি ভারতের কাছে ও মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানকে বাইপাস করে এ বন্দরের সাহায্যেই ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবে ভারত। ইরান যাতে পাকিস্তান বা চীনের দিকে বেশি না ঝোঁকে, সেটাও ভারত নিশ্চিত করতে চায়। ফলে একদিকে সস্তা তেল, চাবাহার ও ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা। এ চরম উভয় সংকটের মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজতে হচ্ছে দিল্লিকে। দিল্লিতে শীর্ষস্থানীয় ইরান-বিশেষজ্ঞ কামার আগা বিবিসি বাংলাকে বলেন, বস্তুত ইরান ভীষণভাবে চায় ভারত তাদের থেকে আগের মতো তেল কেনা অব্যাহত রাখুক। তবে ভারতের সমস্যা হচ্ছে তাদের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর সাংঘাতিক চাপ।’ তিনি বলেন, নানা কারণে জাতিসংঘ, ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স ইত্যাদি ফোরামে য্ক্তুরাষ্ট্রের সমর্থন ভারতের জন্য খুব জরুরি। ভারত সবসময়ই দাবি করে থাকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণ স্বাধীন। এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমি বলব ভারতের সেই পররাষ্ট্রনীতিই এক কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে।’ এ পটভূমিতেই গত সোমবার রাতে দিল্লিতে নামেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাবেদ জারিফ। গত চার মাসের মধ্যে এটি তার দ্বিতীয় সফর। জারিফ বলেন, ‘রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে’ ভারত তাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি উঠে যাওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতেই তার দিল্লি আসা। বিবিসি জানায়, ভারতের জন্যও ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা অনেক সুবিধাজনক। কারণ তাতে পরিবহন খরচ ও দাম দুটোই কম পড়ে। ভারতের কমপক্ষে তিনটি রিফাইনারি বা তেল পরিশোধনাগারও পুরোপুরি ইরানের তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল মাত্র কিছুদিন আগে পর্যন্তও। জ্বালানি খাতের সিনিয়র সাংবাদিক জ্যোতি মুকুল বলেন, ‘গত কয়েক মাসে কিন্তু ভারত ইরানি তেলের বিকল্প কিছু কিছু ব্যবস্থাও নিতে শুরু করেছে। পাশাপাশি চীন, জাপান, ভারতের মতো বৃহৎ ক্রেতা দেশগুলো একটা কনজ্যুমার ব্লক তৈরি করে এক সুরে কথা বলারও চেষ্টা করছে, কেন এশিয়ার দেশগুলো তেলের বেশি দাম দেবে সেই প্রশ্নও তুলছে।’ ইরান সংকটে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সম্প্রতি অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু ভারতে ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের সময় দেশটির সরকার পেট্রল-ডিজেলের দামে ততটা আঁচ পড়তে দেয়নি। অনেকের আশঙ্কা, নির্বাচন শেষ হলেই তেলের দাম অনেকটা বেড়ে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অসীমা গোয়েলের দাবি, ‘গত বছর একটা সময় ভাবা হচ্ছিল তেলের দাম একশ’ ডলার ছোঁবে, যদিও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার পর আমি কিন্তু এবারও আশাবাদী দামটা নাগালের মধ্যেই থাকবে। সৌদিসহ ওপেক দেশগুলোর ওপর মার্কিন চাপ, শেল গ্যাস বা নানা ধরনের বিকল্প গ্রিন এনার্জির কারণে আমার মনে হয় না তেলের দাম বেড়ে যাবে।’ এদিকে কামার আগা নিশ্চিত যে এদিন সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবধারিতভাবে চাবাহারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।