• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জিলকদ ১৪৪১

‘পোলাডা স্বপ্নেও বাঁচলো না বাস্তবেও বাঁচলো না’

    সংবাদ :
  • মাসুদ রানা
  • | ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

ইঞ্জিনের ভেতর কেমন যেন করছে রে পোলাডা। বাইরোনার লাইগা ছটফট করছে। মা বইলা চিৎকার করছে। কেউ ওর চিৎকার শোনে নাই। কত কষ্ট পাইয়া মারা গেছে। এহন আমি কার লাইগা দোয়া দুরুদ পইড়া আল্লাহর কাছে হাত পাতমু। আশিকরে ফিরে আয় বাবা। তোর মারে ফেইলা যাস না। এভাবেই আর্তনাত করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন মধ্যবয়স্ক নারী পপি বেগম। মাথায় পানি ঢালার পর জ্ঞান ফিরলে আবারও বিলাপ করতে করতে ছেলেকে খুঁজতে থাকেন।

তার ছেলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার ছেলের নাম আশিক (১৮)। ওই লঞ্চের ইঞ্জিন রুমে কাজ করে। বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ছেলে লঞ্চে কাজ করায় সব সময় দোয়া দুরুদ পড়ে দোয়া করেন তিনি। কিন্তু রোববার রাতে স্বপ্ন দেখেন আশিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা গেছে। এরপর আর সারারাত ঘুমাতে পারেননি। সকালে স্বপ্নের মতোই একই ঘটনা ঘটলো। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না একমাত্র ছেলে আশিককে। স্বপ্নের মতোই আশিক ইঞ্জিনরুমে চিৎকার করতে করতে মারা গেছে বলে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

পপি বেগম যেমন নিখোঁজ ছেলের শোকে আর্তনাদ করছেন, একইভাবে স্বজনহারাদের লাশ বুকে জড়িয়ে আর্তনাদের রোল পড়ে যায় পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড) মর্গের সামনে। কেউ বাবা হারিয়ে, কেউ সন্তান হারিয়ে আবার কেউ বা মা-বোনকে হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আবার কেউ বা স্বজনের খোঁজে অশ্রুশিক্ত চোখ নিয়ে বসে আছেন নতুন লাশের অপেক্ষায়।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ মর্নিংবার্ডে থেকেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা রিফাত কান্নাবিজড়িত কন্ঠে বলেন, মা ময়না বেগম ও বোন মুক্তাকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম। লঞ্চের ছাদে থাকায় প্রাণে বেঁচে গেছি। কিন্তু মা-বোনকে বাঁচাতে পারলাম না। আল্লাহ আমারেও কেন নিয়ে গেলো না বলে অচেতন হয়ে পড়েন রিফাত। পরে স্বজনরা তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। একইভাবে বিলাপ করছিলেন আপন দুই ভাই (বাচ্চু শেখ ও আবদুল শেখ)কে হারানো ইব্রাহিম শেখ। কান্না বিজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, বাড়ি থেকে একই সঙ্গে ঢাকা আসার পথে মারা যান বাচ্চু শেখ ও আবদুল শেখ। ওদের সন্তানদের কিভাবে বলবো তোদের বাবার লাশ নিয়ে এসেছি।

এদিকে, রাজধানীর ভাড়া বাসা ছেড়ে দিতে স্ত্রী হাসিনা রহমান ও আট বছরের ছেলে সিফাতকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন জজ কোর্টে মুহুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা আবদুর রহমান। কিন্তু রাজধানীর মায়া ত্যাগ করতে গিয়ে জীবনের মায়াই ত্যাগ করতে হয়েছে তাদের। মর্গে রাখা লাশের সারির প্রথম দিকেই ভাগ্নে সিফাতকে দেখে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবদুর রহমানের শালিকা হামিদা বেগম। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুঁজে পান বোন হাসিনার মৃতদেহ।

পরে হামিদা বলেন, দুলাভাই অনেক কষ্ট করে সবাইকে নিয়ে চলছিল। বড় ছেলে হাসিবুর রহমান এবার এইচএসসি পাস করেছে, মেজ ছেলে রিফাত নবম শ্রেণীতে পড়ে। করোনাভাইরাসের কারণে দুই মাস আগে পুরো পরিবার গ্রামে চলে যায়। সকালে দুলাভাই বোন ও ছোট ভাগ্নেকে নিয়ে কসাইটুলি আসছিলেন বাসার মালামাল নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আসার পথেই ঘটে গেল এই দুর্ঘটনা। আবদুর রহমানের খোঁজ না মেলায় অশ্রুশিক্ত চোখে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। প্রসঙ্গত, গতকাল সকালে রাজধানীর পুরান ঢাকার শ্যামবাজার এলাকাসংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় মর্নিংবার্ড লঞ্চ। এতে ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।