• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৮ রবিউস সানি ১৪৪১

৫৬ পয়েন্টে পানি বাড়ছে অকাল বন্যা

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০১৯

দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বেড়ে চলায় ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জেলার অনেক এলাকা ডুবে গেছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন মানুষজন। আগামী দু’দিন এই পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পশ্চিম, মধ্য ও নিম্নাঞ্চলের আরও অনেক এলাকায়ই প্লাবিত হবে। বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গে নদ-নদীর বিভিন্ন পয়েন্টেও পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। অতীতের রেকর্ড ভেঙ্গে হঠাৎ অক্টোবরের প্রথমে দেখা দিয়েছে বন্যার আশঙ্কা। এই বন্যা গুরুতর কিংবা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে সংবাদকে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরন কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯৩টি পানি সমতল স্টেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ৫৬টি পয়েন্টের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। তার ওপর ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মাঝারি ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্যমতে, ৬০ বছরের ইতিহাসে দেশে এবারই প্রথম অক্টোবর মাসে এ ধরনের বন্যা দেখা দিয়েছে। মূলত বাংলাদেশের উজানে ভারতীয় অংশে গঙ্গা নদী থেকে আসা পানির কারণে এই বন্যা দেখা দিয়েছে। ভারতীয় অংশে ফারাক্কা বাঁধের বেশির ভাগ গেট খুলে দেয়ায় বন্যার তীব্রতা হঠাৎ বেড়ে গেছে। এই বন্যা ৮ থেকে ১০ দিন স্থায়ী হতে পারে। এই সময়ে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকায় রয়েছে পেকে ওঠা আমন ধান ও শীতের আগাম সবজি। বন্যায় এর বড় অংশের ব্যাপক ক্ষতি ও নদী ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান সংবাদকে বলেন, গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা ও গড়াইসহ ৬টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গঙ্গা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে, যা আরও ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকবে। ফলে পশ্চিমাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের কিছু কিছু জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারনত সেপ্টেম্বরে বন্যা হয়। ঐ মাসের শেষ দিকে আগেও বন্যা হয়েছে। তবে অক্টোবরের প্রথমে বন্যা হয়নি।

এই প্রকৌশলী বলেন, গুরুতর বন্যা পরিস্থিতি তৈরির কোন সম্ভাবনা নেই। আগামী ২-৩ দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এরপর ক্রমান্বয়ে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ব্যতীত দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। গঙ্গা-পদ্মা নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯৩টি পানি সমতল স্টেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ৫৬টি পয়েন্টের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাবনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, ৪ অক্টোবর থেকে আবারও সারাদেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। আগামী ৮ বা ৯ অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।

আমাদের রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি প্রতি মুহূর্তেই বাড়ছে। এরই মধ্যে রাজশাহীর নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের মানুষ উদ্বেগের মধ্যে বসবাস করছে। জেলার গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘায় উপজেলার চরাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ এরই মধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। চর খিদিরপুর এলাকার বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ এরই মধ্যে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে।

উজান থেকে নেমে আসা ঢলে আগে থেকেই হু হু করে পানি বেড়ে চলেছিল রাজশাহীর পদ্মায়। পানির তোড়ে বর্তমানে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। সেই স্রোত আছড়ে পড়ছে শহর রক্ষা বাঁধে। এতে করে হুমকিতে পড়েছে টি-বাঁধসহ সংলগ্ন এলাকা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল সকাল থেকে বাঁধ ঘিরে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ শাহিদুল আলম জানান, নদীর প্রবল স্রোতে কয়েক যুগ আগের টি-বাঁধটি কিছুটা দেবে গেছে। তাই বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তা রক্ষার চেষ্টা চলছে। এর আগে ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট এ বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। পরে পানি উন্নয?ন বোর্ডের কমকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জিও ব্যাগ ফেলে সে ফাটল ঠেকান। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ব সতর্কতা হিসেবে রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের সুরক্ষায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। টি-বাঁধ অংশে এরই মাঝে ৫শ’ জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ লাইনের সামনের বাঁধ রক্ষায় ফেলা হচ্ছে আরও ২ হাজার জিও ব্যাগ।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার এনামুল হক জানান, এদিকে সকাল ৯টায় বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পদ্মা প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই সময় রাজশাহী পয়েন্টে পানির উচ্চতা মাপা হয় ১৮ দশমিক ১৬ মিটার। পরে দুপুর ১২টায় তা বেড়ে ১৮ দশমিক ১৭ মিটার ও বেলা ৩টার দিকে ১৮ দশমিক ১৮ মিটারে গিয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রতি তিন ঘণ্টায় নদীতে ১ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়েছে। এভাবে বাড়তে থাকলে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ রাজশাহীতে পদ্মার পানির উচ্চতা দাঁড়াবে ১৮ দশমিক ১৯ মিটারে।

গতকাল সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহীতে পদ্মা নদীতে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অব্যাহতভাবে যেভাবে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন পদ্মা তীরবর্তী ও বিভিন্ন চরাঞ্চলের মানুষ। এরই মধ্যে রাজশাহীর পদ্মা তীরবর্র্তী নিচু এলাকাগুলো ডুবে গেছে। নগরীর শ্রীরামপুর থেকে পঞ্চবটির বিভিন্ন এলাকা ডুবে গেছে। এছাড়াও পদ্মার ওপারে সীমান্তবর্র্র্তী চর মাঝাড়দিয়াড়, চর আষাড়িয়াদহ, চর খানপুর, বাঘার বিভিন্ন চর ডুবে গেছে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, গত সোমবার পর্যন্ত রাজশাহীর চারটি উপজেলার চররাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। যাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬শ’ পরিবারকে চরাঞ্চল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সরিয়ে নেয়া লোকজনকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এদের অধিকাংশের উচু এলাকায় নিজের বাড়ি বা আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। সেখানে গিয়ে তারা ওঠছেন।

নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোরের লালপুর উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের পদ্মার চরে বসবাসকারী তিন হাজার পরিবারসহ উপরিভাগের কয়েকশ’ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কয়েক হাজার জমির ফসল এখন পানির নিচে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। গতকাল দুপুরে বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের পানিবন্দী পরিবারের মাঝে শুকনো খাবারসহ ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছে উপজেলা প্রশাসন।

জানা গেছে, পদ্মা চরের নওসারা সুলতানপুর, দিয়াড়শঙ্করপুর, চাকলা বিনোদপুর, আরাজি বাকনাই, রসুলপুর, বাকনাই, বন্দোবস্ত গোবিন্দপুর, কাগমারি ও লালপুর চরের ঘরবাড়ি ছাড়াও নওপাড়া, পানসিপাড়া, মহারাজপুর, বাকনাই, আরাজি বাকনাই, মোহরকয়া গ্রামের শতাধিক ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। অধিকাংশ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জেলার নিম্নাঞ্চলের বহু মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ভেড়ামারার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। গত ১২ ঘণ্টায় এ পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে আরও ২ সেন্টিমিটার। যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কুষ্টিয়ার কয়া ইউনিয়নের কালোয়া গ্রামে শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি রক্ষাবাঁধের ৩০ মিটার ধসে গেছে। এতে নতুন করে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙ্গন রোধ করার চেষ্টা করছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পদ্মা ও মহানন্দার পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই। পদ্মার পানি বিপদসীমা হচ্ছে ২২ দশমিক ৫০ সেমি ও মহানন্দা ২১ মিটার। গতকাল বিকেল পর্যন্ত পদ্মার পানি ৭ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে ২২ দশমিক ২২ সেমি ও মহানন্দায় ৯ সেমি পানি বৃদ্ধি ২০ দশমিক ৮০ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। এতে করে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে ভাঙ্গন এবং আলাতুলি ও নারায়নপুর ইউনিয়নে অধিকাংশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, শিবগঞ্জ উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ায় পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলমগীর হোসেন জানান, পানি বৃদ্ধির ফলে চরবাগডাঙ্গা বিওপি এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এছাড়া, আলাতুলি ও নারায়নপুর ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ায় অধিকাংশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ২টি ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে চাল বিতরণ করা হয়েছে। বিকেলে চর অনুপনগর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে চাল বিতরণ করেন।

শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম জানান, পাকা ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বিপদসীমার ২৮ সেমি ও মহানন্দা ২০ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, মহানন্দায় যেভাবে পানি বাড়ছে তাতে বন্যার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।