• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১ মহররম ১৪৪২, ০৩ আশ্বিন ১৪২৭

লকডাউনের ১ মাস ১০ দিন

৫০ লাখ পরিবহন শ্রমিক কর্মহীন

কোন সাহায্য পায়নি তারা কল্যাণ ফান্ডের চাঁদার টাকা কোথায়? প্রশ্ন শ্রমিকদের

সংবাদ :
  • ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০

রাজধানীর সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে ঢাকা-কুমিল্লা রুটে চলাচল করে তিশা পরিবহন বাসের গাঁ ঘেষে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক। কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করতেই শুকনোমুখে উত্তর দিলো তার নাম সজল। তিশা পরিবহনের হেলপার। গত ২৬ মার্চ থেকে কাজ নেই। ১ মাস ১০ দিন পর সায়দাবাদ টার্মিনালে এসেছে গাড়ি কবে চালু হবে খোঁজ নেয়ার জন্য। জুরাইনে ভাড়া বাসায় থাকেন। মা, স্ত্রী, সন্তানসহ সংসারে ৪ জন লোকের প্রতিদিনে খাবার সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হয় তার। গাড়ি বন্ধ থাকায় যাত্রাবাড়ী আড়তে কাজ করে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় যায় সকালে বাসায় আসে। যা পায় তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলছে। ১ মাস ১০ দিনে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারশন থেকে কোন সহায়তা পায়নি সে।

শুধু সজল নয়, এভাবে অসহায়ের কথা বললেন কাওসার, সালাম, জব্বার নামের একাধিক পরিবহন শ্রমিক। তারা বলেন, ‘প্রতিমাসের কল্যাণ ফান্ডের নামে আমাদের কাছ থেকে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা আদায় করে সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। কিন্তু আমাদের দুঃখ-কষ্টের সময় এই কল্যাণ ফান্ড থেকে কোন সহায়তা পাইনি।’ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সারাদেশের গণপরিবহন আগামী ১৬ মে পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে ছয় দফায় এই নিষেধাজ্ঞা বৃদ্ধি করা হয়েছে। করোনার এই দুর্যোগে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে পরিবহন এই শ্রমিকরা। সারাদেশে প্রায় ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের দ্বিধা বিভক্তির কারণে প্রকৃত পরিবহন শ্রমিকরা কোন সাহায্য-সহায়তা পাচ্ছে না।

সারাদেশে নিবন্ধনকৃত ৫০ লাখ শ্রমিক রয়েছে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারশনে অন্তর্ভুক্ত। এই সংগঠন কোন কল্যাণ ফান্ডের নামে কোন চাঁদা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানান সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। তিনি সংবাদকে বলেন, আমাদের ফেডারেশনের নামের কোন শ্রমিকদের কাছ থেকে কল্যাণ ফান্ডের নামের চাঁদা সংগ্রহ করা হয় না। আমাদের সংগঠনে প্রতি মাসে আয় হয় ৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে দেড় লাখ টাকা ব্যয় করা হয় সংগঠনের অফিস ভাড়া ও কর্মচারী বেতন বাবদ। সেগুনবাগিচায় সংগঠনের নামের অফিস ক্রয় করা হয়েছে। বাকি টাকা দিয়ে প্রতিমাসের এই অফিসের কিস্তা পরিশোধ করা হয়। আমাদের ফেডারেশন অন্তর্ভুক্ত শ্রমিকদের প্রতি ১২ দিন পর পর ১০ চাল, ৩ আটা, ১ কেজি করে ডাল, পিয়াজ ও তেল দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে দেশে পরিবহন সেক্টর বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধে সরকারের ঘোষণার আগেই পরিবহন সেক্টরে করোনার প্রভাব পড়ে। যাত্রী কমে যায়। সরকারের নির্দেশের পর সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে পরিবহন সেক্টরে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ৪৫-৫০ লাখ পরিবহন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট হাজি আবুল কালাম বলেন, পরিবহন সেক্টর বললে শুধু বাস-ট্রাক-মিনিবাস ধরলে হবে না। সাড়ে ৭ লাখ বাস-মিনিবাস, ৩ লাখ সিএনজি ও থ্রি-হুইলার, কয়েক লাখ কাভার্ড ভ্যান, প্রায় ৩ লাখ রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মোটরসাইকেল, ১৫ লাখ ইজিবাইকও পরিবহন সেক্টরের মধ্যে ধরতে হবে। সব মিলিয়ে দেশে ৪৫ লাখের মতো পরিবহন শ্রমিক কাজ করে। এদের বাইরে যানবাহনের মেকানিক, গ্যারেজের শ্রমিক, জ্বালানি ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীসহ ১ লক্ষাধিক এবং মোটরপার্টস দোকানগুলোতে কর্মরত ১ লাখ মানুষ পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিপর্যয়ের ফলে সবাই এখন কর্মহীন। এই বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। প্রতিদিন একজন শ্রমিক কমপক্ষে ১ হাজার টাকা আয় করত। এখন সবাই কর্মহীন। সবাই পরিবার নিয়ে বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অনিশ্চয়তায় যানবাহনের মালিকরা। এক টাকা আয় না হলেও একটি বাস বা মিনিবাসের জন্য প্রতি মাসে কমপক্ষে ১৫-২০ হাজার টাকা ব্যাংকের কিস্তি দিতে হচ্ছে। ২০ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান জরুরি পণ্য নিয়ে চলাচল করলেও ৮০ ভাগ পুরোপুরি গ্যারেজে বসে আছে। এ অবস্থায় কতদিন চলতে হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েই চলছে।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন বাস টামির্নাল ঘুরে দেখা গেছে, বাস-মিনিবাসে বসে অলস সময় পার করছে শ্রমিকরা। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কাজ নেই। কাজ না থাকলে আয়ও নেই। বাড়িতেও যেতে পারেননি। মেসে অবস্থান করলেও রান্নার লোক না আসায় নিয়মিত খাওয়া হচ্ছে না। আবার হোটেল বন্ধ থাকায় বাইরেও খেতে পারছেন না। পকেটের টাকা ফুরিয়ে আসছে। বাড়িতে পরিবারের জন্যও টাকা পাঠাতে পারছেন না। কেউ টাকা ধার দিতেও চাইছে না। এই নিষেধাজ্ঞা কতদিন চলবে তা নিয়েও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সব মিলিয়ে খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। সরকারও আমাদের কোন সহযোগিতা করছে না বলে জানান পরিবহন শ্রমিকরা।