• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১

আ’লীগ সরকারের মেয়াদে

৩৩১ কলেজ ও ১৯৫টি হাইস্কুল জাতীয়করণ

সর্বশেষ জাতীয়করণ করা হলো ১৪টি কলেজ

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার টানা দুই মেয়াদে ৩৩১টি কলেজ ও ১৯৫টি হাইস্কুল জাতীয়করণ করেছে। সর্বশেষ গতকাল আরও ১৪ কলেজ জাতীয়করণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ৩৩১টি কলেজের প্রায় ১১ হাজার শিক্ষক এখন সরকার থেকে বেতনভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। স্কুলগুলোতেও প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষক এই সুবিধা পাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১০ বছরে শিক্ষা খাতে এটিকেই অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। নতুন জাতীয়করণ হওয়া সব কলেজের জন্য একত্রে পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এর আগে দেশে সরকারি কলেজ ছিল মাত্র ২৮৯টি। ৩৩১টি বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের ফলে দেশে বর্তমানে সরকারি কলেজের সংখ্যা দাঁড়ালো ৬২০টি। পুরনো ২৮৯টিসহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন অধিদফতর ও প্রতিষ্ঠানে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের মোট পদ ছিল প্রায় ১৬ হাজার। আর নতুন জাতীয়করণ হওয়া কলেজসহ মোট শিক্ষকের পদ দাঁড়াবে প্রায় ২৬ হাজার।

কলেজ জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় দক্ষতার সঙ্গে দাফতরিক দায়িত্ব পালন করে আসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) ড. মোল্লা জালাল উদ্দিন সংবাদকে বলেন, ‘জাতীয়করণ হওয়া কলেজগুলোতে এখন শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

প্রথমে তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের ‘অ্যাডহক’ অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম শ্রেণীর পদে নিয়োগে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাগে। এর আগে জনপ্রশাসন, অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিক্ষকদের নিয়োগ অনুমোদন করাতে হবে। এরপর সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) শিক্ষকদের কাগজপত্র ও এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) যাচাই-বাছাই করে যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগের সুপারিশ করবে। তবে অ্যাডহক নিয়োগের পর থেকেই শিক্ষকরা সরকারিভাবে বেতন ভাতা পেতে শুরু করবে।’

সর্বশেষ গত ১২ সেপ্টেম্বর ১৪টি কলেজ জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এর আগে গত ১২ আগস্ট দেশের ২৭১টি বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, গত ৮ আগস্ট থেকে এসব কলেজকে সরকারি করার আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।

এর আগে গত ৭ আগস্ট ‘সরকারি কলেজ ও মাদ্রাসাসমূহে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের বিভিন্ন স্তরের পদ সৃজন’ সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে একটি চিঠি দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

ওই চিঠিতে এমএল কমিটির (এনাম কমিটি) পর কোন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে কিনা এ বিষয়ে কলেজভিত্তিক তথ্য-প্রমাণ; পদ সৃষ্টি করা হয়ে থাকলে পদ সৃষ্টির প্রস্তাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতির কপি; অর্থ বিভাগের সম্মতির অনুলিপি এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের পদ সৃষ্টির আদেশের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস’র হালনাগাদ সংশোধনসহ তফসিল এবং এনাম কমিটির পর কতসংখ্যক কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে এবং কি পরিমাণ পদ সৃজন-আত্তীকরণ করা হয়েছে তার কলেজভিত্তিক বিবরণ চাওয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপক-৭১টি, সহযোগী অধ্যাপক-১৫৭টি, সহকারী অধ্যাপক-২৮৮টি এবং প্রভাষক-২৫০৮টিসহ মোট তিন হাজার ২৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এ বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকার পরও ১২ হাজার ৫১৯টি পদ সৃজনের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে শূন্য পদ পূরণে মন্ত্রণালয় কর্তৃক কি কি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা জানা প্রয়োজন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে। সরকারি কলেজ ও হাইস্কুল নেই- এমন সকল উপজেলায় একটি করে কলেজ ও হাইস্কুল জাতীয়করণ করতে ২০১৬ সাল থেকে তালিকাভুক্তির কাজ শুরু করে সরকার। এই তালিকা থেকেই কলেজ জাতীয়করণ করা হচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) জানায়, জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে দেশের মোট ৪৮৯টি উপজেলার মধ্যে সরকারি কলেজ ছিল ১৬১টি উপজেলায়। বাকি ৩২৮টি উপজেলায় সরকারি কলেজ ছিল না। সরকারি কলেজ নেই- এমন ৩২১টি উপজেলায় একটি করে বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন জাতীয়করণ হওয়া কলেজে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষক রয়েছেন। তারা সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) অধীনে পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাডারভুক্ত হতে পারবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাতীয়করণ হওয়া কলেজের শিক্ষকদের মর্যাদা কী হবে সে সম্পর্কে গত ৩১ জুলাই ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকৃত বিধিমালা ২০১৮’ জারি করে।

এ ব্যাপারে ড. মোল্লা জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্তির বিষয়ে বিসিএস শিক্ষা সমিতির আপত্তি ছিল। আবার ওইসব কলেজের শিক্ষকদেরও ক্যাডারভুক্তির দাবি ছিল। এজন্য আমরা ‘উইন উইন সিচুয়েশনে অর্থাৎ উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করে এই সমস্যার সমাধান করছি।’

তিনি বলেন, ‘বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকলে বেসরকারি কলেজের যে কোন শিক্ষক শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক পদে নিয়োগ পেতে পিএসসির অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। পরীক্ষা ছাড়া কেউ ক্যাডারভুক্তি হতে পারবে না; এটাই ছিল বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির দাবি। তবে সরকারি হওয়া কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকরা নন-ক্যাডার হিসেবে নিজ নিজ পদে নিয়োগ পাবেন। তাদের চাকরি বদলিযোগ্য নয়।’

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি ও আত্তীকৃত শিক্ষকদের সম্মতিক্রমে ‘আত্তীকরণ বিধিমালা ২০০০ প্রণয়ন’ এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়।

২০১৪ সাল থেকে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি ওই ২০০০ বিধি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা হুমকি দিয়ে আসছেন, আত্তীকৃত কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তি তারা কোনভাবেই মানবেন না। আবার জাতীয়করণের তালিকায় থাকা শিক্ষকরাও তাদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছেন।

হাইস্কুল জাতীয়করণ

মাউশি’র তথ্যানুযায়ী, জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় (হাইস্কুল) ছিল ৩১৭টি এবং ৩০৬টি উপজেলায় কোন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। বর্তমানে জাতীয়করণসহ সরকারি হাইস্কুলের সংখ্যা ৫১২টি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই মেয়াদ ১৯৫টি হাই স্কুল জাতীয়করণ ও নতুন প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে।

স্কুল জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন কাজ করে আসা মাউশি’র ঢাকা অঞ্চলের উপ-পরিচালক শাখায়েত হোসেন বিশ্বাস সংবাদকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে জাতীয়করণ হওয়া ৩০টি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীকে আত্তীকরণের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১৬৫টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর আত্তীকরণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

একসঙ্গে এতসংখ্যক হাইস্কুল জাতীয়করণ করাকে সরকারের বিরাট অবদান আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘স্কুলগুলো সরকারিকরণের ফলে তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের সন্তানরা বিনামূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ পাবে। শিক্ষায় শহর-গ্রামের বৈষম্য হ্রাস পাবে। উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভালোমানের শিক্ষালাভের সুযোগ আরও বাড়বে। শিক্ষায় সব শিশুর অংশগ্রহণও নিশ্চিত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সরকারি বিদ্যালয়বিহীন ৩০৬টি উপজেলায় একটি করে বেসরকারি বিদ্যালয়কে (অপেক্ষাকৃত ভালো অবকাঠামো থাকা) জাতীয়করণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি বিদ্যালয়বিহীন কয়েকটি উপজেলায় প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি হাইস্কুলও প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এছাড়াও বিভাগীয় শহর এবং ঢাকার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায়ও ১০টি নতুন সরকারি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠান করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ৩২৫টি হাইস্কুল জাতীয়করণ ও নতুন প্রতিষ্ঠান করছে সরকার।

আরও ১৪ কলেজ

জাতীয়করণ

নতুন করে আরও ১৪টি কলেজ জাতীয়করণ করেছে সরকার। এ বিষয়ে গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০১৮’ এর আলোকে কলেজগুলো সরকারি করা হয়েছে।

জাতীয়করণ হওয়া কলেজগুলো হলো- ফরিদপুরের সালথা কলেজ, নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী ডিগ্রি কলেজ, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ, নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সৈকত ডিগ্রি কলেজ, রাঙ্গামাটির রাজস্থলী কলেজ, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ মহাবিদ্যালয়, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার চৌহালী ডিগ্রি কলেজ, যশোরের বাঘারপাড়া শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন মহাবিদ্যালয়, খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার এমএ মজিদ ডিগ্রি কলেজ, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আইডিয়াল কলেজ, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা মহিলা কলেজ এবং গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ কলেজ।

এ নিয়ে এখন দেশে সরকারি কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়ালো ৬২০টি। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি হওয়া কলেজগুলোর শিক্ষকদের পদমর্যাদা, বদলি ও পদোন্নতি বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে।