• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭, ৭ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস আজ

মোমবাতি জ্বালিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২০

image

মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক কলঙ্কিত দিন আজ ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। একাত্তরের এদিনে বাঙালি জাতি তথা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা। পাকিস্তানি দানবরা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যার নীলনকশায় মেতে ওঠে নির্বিচারে স্বাধীনতাকামী বাঙালি নিধনযজ্ঞে। এ রাত একদিকে যেমন বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করেছিল, অন্যদিকে এ রাতেই সূচিত হয়েছিল জঘন্যতম গণহত্যা। ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে মাত্র এক রাতেই হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল প্রায় অর্ধলক্ষাধিক ঘুমন্ত বাঙালিকে। ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া সেই নিধনযজ্ঞ চলেছে টানা ৯ মাস। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তাদের এ দেশীয় দোসর ঘাতক দালাল রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিরোধ এসেছে। বিস্তৃত হয়েছে লাশের স্তূপ।

জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে ২৫ মার্চের সেই কালরাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার অগণিত শহীদকে। তবে করানাভাইরাসের কারণে এ বছর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানসহ অন্য আয়োজন স্থগিত করা হয়েছে।

দফায় দফায় ব্যর্থ হয় বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া সিরিজ বৈঠক। সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি এয়ারপোর্ট চলে যান। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এড়িয়ে নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর কাপুরুষোচিত সশস্ত্র হামলা চালাবার নির্দেশ দিয়ে রাত পৌনে ৮টায় তিনি গোপনে বিমানে করাচি পাড়ি জমান। পাকহানাদার বাহিনী জেনারেল ইয়াহিয়ার নির্দেশে জল্লাদের মতো বাংলাদেশের নিরস্ত্র-নিরপরাধ জনগণের ওপর মেশিনগান, মর্টার আর ট্যাঙ্ক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। সন্ধ্যা পেরিয়ে নিঃশব্দে নেমে আসে অন্ধকার। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে নর্থ ঢাকায় সৈন্যরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমানে শেরাটন হোটেল ঘিরে ফেলে)। রিসিপশনে কালো বোর্ডে চকখড়ি দিয়ে একজন বাচ্চা ক্যাপ্টেন লিখে দিল বাইরে বেরুলেই গুলি। বিদেশি সাংবাদিকরা বেরোতে না পেরে রেডিও ধরলেন। না কার্ফুর কোন ঘোষণা নেই। বাইরে ট্যাঙ্কের শব্দ। ছুটে সবাই ১২ তলায় উঠলেন। মেশিনগানের গুলিতে কানপাতা দায়। ভুট্টোর ঘরের দরজায় গিয়ে সবাই থমকে দাঁড়ালেন। কড়া পাহারা। ঢাকা-করাচি টেলিপ্রিন্টার লাইনও কেটে দেয়া হয়েছে। বাইরের পৃথিবী থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বেতারের প্রচারও। সরকারি কোন ঘোষণাও প্রচারিত হয়নি সেদিন। গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে মিছিল-মিটিং- স্লোগানে মুখরিত ঢাকার প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ে এক সময়। কেউ জানতেই পারেনি ততক্ষণে খুলে গেছে নরকের দরজা।

রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তারা প্রথমে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং এরপর একে একে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এর চারপাশ, ধানমন্ডি, পিলখানার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদর দফতরসহ রাজধানীর সর্বত্র নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। পাশাপাশি হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরেও। আগুন ধরিয়ে দেয় গান পাউডার ছিটিয়ে পুলিশ সদর দফতরসহ বিভিন্ন এলাকায়। পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। হত্যা করা হয় ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম গণহত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্তহ। মেডিকেল কলেজ ও ছাত্রাবাসে গোলার পর গোলা ছুড়ে হত্যা করা হয় অজস্র মানুষ। নগরজুড়েও রাতভর চলেছে বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ ও ধ্বংসের তা-ব। হতচকিত বাঙালি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঢলে পড়েছে মৃতু্যুর কোলে। হানাদাররা চলার পথে রাস্তার দুই পাশে গুলি ছুড়ে মেরে ফেলে অসংখ্য নিরীহ, গরিব মানুষকে। দানবীয় বাহিনীর আক্রমণের বিভীষিকায় নিমজ্জিত হয় ঢাকা। কেঁদে ওঠে শহরের রাজপথ, অলিগলি, ফুটপাত, খেলার মাঠ, ক্যাম্পাস। মানুষের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে আকাশ। সে কান্না ছাপিয়ে তখন কেবলই মুহুর্মুহু গোলার শব্দ আর আগুনের লেলিহান শিখা। চারদিকে কেবল ধ্বংস আর মর্মন্তুদ আর্তনাদ। মধ্যরাতেই ঢাকা হয়ে যায় লাশের শহর। দেশের বড় শহরগুলোতেও একইভাবে অতর্কিতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকসেনারা। রাজারবাগে পুলিশের বাঙালি সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তাদের সামান্য অস্ত্রশস্ত্র দিয়েই। তবে ট্যাঙ্ক আর ভারি মেশিনগানের মুখে এ প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় পুরো সদর দফতর।

তবে ২৫ মার্চের কালরাতের পর স্বজনের লাশ আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জেগে ওঠা বাঙালির প্রতিরোধের পালা শুরু হয় ২৬ মার্চ। গ্রেফতারের আগ মুহূর্তে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গোপন ওয়ারলেস বার্তায় তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ছাত্র-জনতা-পুলিশ-ইপিআর শক্রর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়েছে। আমি ঘোষণা করছি আজ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সর্বস্তরের নাগরিকদের আমি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা যে যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন, যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সম্মিলিতভাবে শক্রর মোকাবিলা করুন। এই হয়তো আপনাদের প্রতি আমার শেষ বাণী হতে পারে। আপনারা শেষ শক্রটি দেশ থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যান।’ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন-প্রতিরোধের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পাকসেনাদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরাও। শুরু হয় বাঙালির প্রতিরোধের যুদ্ধ। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

এর আগে ২৫ মার্চ সকালে প্রেসিডেন্ট ভবনে ভুট্টো-ইয়াহিয়া এবং পিপলস পার্টির উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের খবর সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছে যায়। রাত ৯টার পর বঙ্গবন্ধু তার বাসভবনে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আমরা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছেন। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট অখ- পাকিস্তানের সমাপ্তি টানতে চলেছেন।

এদিকে পিলখানায় ইপিআর ব্যারাক ও অন্যান্য স্থান থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার লিখিত বাণী ওয়ারলেসের মাধ্যমে সারাদেশে মেসেজ আকারে পাঠানো হয়। এই বার্তা চট্টগ্রাম ইপিআর সদর দফতরে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম উপকূলে নোঙর করা একটি বিদেশি জাহাজও এই বার্তা গ্রহণ করে। ওই সময় চট্টগ্রাম অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী সাইক্লোস্টাইল করে রাতেই শহরবাসীর মধ্যে বিলির ব্যবস্থা করেন।

অন্যদিকে রাত ১টায় পাকবাহিনীর একটি লরি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের অদূরে শুক্রাবাদে ব্যারিকেডের মুখোমুখী হয়। এখানে প্রতিরোধ বুহ্য ভেঙ্গে হানাদাররা রাত দেড়টায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে চলে আসে। হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে বঙ্গবন্ধুকে রাত দেড়টায় তার বাসভবন থেকে বন্দী করে শেরেবাংলা নগরের সামরিক বাহিনীর সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। সকাল পর্যন্ত আদমজী কলেজের একটি কক্ষে বঙ্গবন্ধুকে আটক রাখা হয়।

আজ ২৫ মার্চ রাত ১১টায় প্রত্যেকে একটি করে মোমবাতি জ্বালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার আহ্বান জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই আহ্বান জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে আপৎকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা প্রতিবছরের মতো এই বছর ২৫ মার্চ গণহত্যার কালরাত্রির আলোর মিছিলসহ সব কার্যক্রম স্থগিত করেছি। আমাদের সব সহযোদ্ধা, সুহৃদ ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন আমরা ঘরে থেকে ২৫ মার্চ রাত ১১টায় প্রত্যেকে একটি করে মোমবাতি জ্বালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ’৭১-এর ২৫ মার্চের মধ্যরাত্রি থেকে বাংলাদেশে আরম্ভ হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতম গণহত্যাযজ্ঞ, মানবজাতির স্মরণকালের ইতিহাসে যার নজির নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে কখনও ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করতে পারত না যদি না তাদের সঙ্গে এদেশের জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের মত দল প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা এবং হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করত।

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাবার জন্য, গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্নকরণ এবং শহীদদের আত্মদানের চেতনায় নিজেদের বোধ শাণিত করবার জন্য শহীদজননী জাহানারা ইমাম ২৫ মার্চ সূচনা করেছিলেন গণহত্যার কালরাত্রি পালন কর্মসূচি। গত ২৮ বছর ধরে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২৫ মার্চ রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে মোমবাতি হাতে আলোর মিছিল নিয়ে জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।