• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

নুসরাত হত্যার রায়

১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, ফেনী

| ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৯

image

বহুল আলোচিত ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হত্যার নির্দেশদাতা মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ চার্জশিটভুক্ত ১৬ আসামিকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল বেলা সোয়া ১১টার দিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ রায় দেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমীন, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আবদুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আবদুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিল।

এর আগে তিনস্তরের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের আদালতে আনা হয়। এ সময় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রায়ের পর দণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি ও তাদের অত্মীয়রা কান্নায় ভেঙে পড়ে।

এ রায়ের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ফেনী জজকোর্টের পিপি হাফেজ আহম্মদ। অন্যদিকে এ রায় প্রত্যাশিত রায় হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু। রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এ রায় দুর্ভাগ্যজনক, অনভিপ্রেত, অনাকাক্সিক্ষত।

প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা পরিবারের, আসামিপক্ষের হুমকির অভিযোগ : এ রায়ে নুসরাতের বড় ভাই ও মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান সন্তুষ্টি প্রকাশ করে রায় দ্রুত কার্যকরের প্রত্যাশা করেছেন। আদালতে নুসরাতের বাবা একেএম মুসা মানিক ও ভাই নোমান উপস্থত ছিলেন। নোমান বলেন, আসামিরা আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে আমাদের হুমকি দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে তারা আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার আদালত চত্বরে নুসরাত হত্যার রায় শোনার পর তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আমরা আশা করব, রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত তিনি আমাদের নিরাপত্তা দেবেন।

নুসরাতের পরিবার, সহপাঠী ও স্বজনরা সন্তুষ্ট : বহুল আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলা রায় ঘোষণার পর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নুসরাতের বাবা একেএম মুসা মানিক, মা শিরিন আক্তার, মামলার বাদী ও নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। এছাড়া নুসরাতের স্বজন, সহপাঠী ও সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষকরাও এ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে রায় কার্যকরের দাবি জানান।

মামলার বাদী ও নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান মামলার ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্প সময়ের মধ্যে নুসরাত হত্যা মামলার নিষ্পত্তির কথা দিয়েছিলেন। এ কথা তিনি রেখেছন। রায়টি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি করছি।

নুসরাতের মাদ্রাসার বর্তমান অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন মোবাইল ফোনে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ রায়ের মধ্য দিয়ে যাতে অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, এর জন্য অল্প সময়ের মধ্যে কার্যকরের দাবি জানান। নুসরাত হত্যা মামলার রায়কে ঐতিহাসিক রায় বলেও আখ্যায়িত করেন তিনি।

নুসরাতের নিকটাত্মীয় আবদুল বাতেন, ওমর ফারুক, তার সহপাঠী নিশাত সুলতানা, নাসরিত সুলতানা ফুর্তি, কায়সার মাহমুদ, আলা উদ্দিন, জামসেদ আলমসহ অনেকে রায় শুনতে আদালত চত্বরে ছুটে আসেন। কাক্সিক্ষত রায়ের সংবাদ শুনে তারাও সন্তোষ প্রকাশ করেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা কারাগারে থাকা অধ্যক্ষ সিরাজের নির্দেশে নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান নুসরাত।

এ ঘটনায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজকে প্রধান করে ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে নুসরাতের ভাই নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

নুসরাত হত্যা মামলায় পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অধ্যক্ষ সিরাজসহ ২১ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে। পরে ২৯ মে ১৬ জনকে আসামি করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় নূর হোসেন, আলাউদ্দিন, কেফায়েত উল্যাহ জনি, সাইদুল ও আরিফুল ইসলামের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়। ৩০ মে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১০ জুন আদালত মামলাটি আমলে নিলে শুনানি শুরু হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারিক আদালত। ২৭ ও ৩০ জুন মামলার বাদী নোমানকে জেরার মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হয়। এরপর ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।

বহুল আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলা রায় ঘোষণার পর ফেনীর আদালত চত্বরে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সন্তান-স্বজনরা কোনভাবেই জড়িত নয় বলে দাবি করেন তারা।