• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১

অনলাইন ক্যাসিনো

হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা

সেলিম প্রধানের বাড়িতে অভিযান : ২৯ লাখ টাকা বিদেশি মুদ্রাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বুধবার, ০২ অক্টোবর ২০১৯

ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনোর চেয়ে অনলাইন ক্যাসিনো ছিল বেশি জনপ্রিয়। ক্লাবে গিয়ে স্বশরীরে ক্যাসিনো খেললেও অনলাইনে খেলা হতো স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ল্যাপটপে। বিশেষ অ্যাপ নামিয়ে এ খেলার জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংকে একাউন্ট করে টাকা জমা দিতে হতো জুয়াড়িদের। খেলাটি পুরো নিয়ন্ত্রণ করত সেলিম প্রধান এবং তার বিদেশি পার্টনার দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক মি. দো। ৩টি ব্যাংকে জুয়াড়িরা একাউন্ট খুলে এ খেলায় অংশ নিত। খেলার হারজিতের টাকা গেটওয়ের মাধ্যমে পেতেন জুয়াড়িরা এবং সেলিম। গত কয়েক বছরে অনলাইন ক্যাসিনো থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ চক্রটি। বিএনপিপন্থি সেলিম যুবলীগের এক নেতার সঙ্গে সখ্যতা করে এ ব্যবসা শুরু করে। তার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ, সীমান্তে অস্ত্র চোরাচালান এবং টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। লন্ডনসহ একাধিক দেশে ক্যাসিনোর অর্থ পাচার করত সেলিম।

গতকাল ও আগের রাতে র‌্যাব সেলিমের গুলশান ও বনানীর দুটি বাসায় অভিযান চালিয়ে নগদ ২৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা, ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ ২৩টি দেশের মুদ্রা, ১২টি পাসপোর্ট, ৩টি ব্যাংকের ৩২টি চেক, ৪৮ বোতল বিদেশি মদ, একটি বড় সার্ভার, চারটি ল্যাপটপ ও দুটি হরিণের চামড়া উদ্ধার করে। অনলাইনে ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় সেলিম ও তার দুই সহযোগী আখতারুজ্জামান ও রোকনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গত সোমবার দুপুরে ঢাকা থেকে থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অনলাইন ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক সেলিমকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট থেকে নামিয়ে আনা হয়। র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম জানান, সোমবার রাতে আটক করার পর সেলিম প্রধানকে র‌্যাব-১ এর হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সেলিমের বাসা এবং অফিসে তল্লাশি চালায় র‌্যাব। সেলিমের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, বৈদেশিক মুদ্রা আইন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিরাপত্তা আইন-২০১২ অনুযায়ী চারটি মামলা করা হয়েছে। এরমধ্যে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় তাকে ছয় মাসের কারাদ-ও দেয়া হয়েছে। সারওয়ার বিন কাশেম আরও জানান, তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান বর্তমানে কারাগারে থাকা গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল সেলিমের। সেলিম প্রধান মামুনকে বিএমডব্লিউ গাড়ি উপহার দেন। সেলিম লন্ডনে টাকা পাঠাতেন বলেও তথ্য পেয়েছে র?্যাব। সেখানে কার কাছে টাকা পাঠাতেন তা তদন্ত করা হবে।

যেভাবে অনলাইন ক্যাসিনো যাত্রা শুরু হয়

অনলাইনে বিশ্বের সুপরিচিত ক্যাসিনোগুলোর সঙ্গে জুয়াড়িদের যুক্ত করার কাজ করত সেলিম। সে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘প্রধান গ্রুপ’-এর কর্ণধার। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস লিমিটেড, পি২৪ ল ফার্ম, এইউ এন্টারটেইনমেন্ট, পি২৪ গেমিং, প্রধান হাউস ও প্রধান ম্যাগাজিন। এরমধ্যে পি২৪ গেমিংয়ের মাধ্যমে সে জুয়াড়িদের ক্যাসিনোয় যুক্ত করত। সেলিমের কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পি২৪ গেমিং শুরুতে বিনোদনমূলক সফটওয়্যার তৈরি ও প্রকাশ করত। এখন তারা এশিয়ায় দ্রুত বড় হতে থাকা ক্যাসিনো কারবারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এশিয়ার লাইভ ক্যাসিনো মার্কেটে প্রতিষ্ঠানটি যেন এক নম্বরে যেতে পারে, সেই চেষ্টা আছে তাদের। ২০১৬ সালে তারা শুধু কম্পিউটার গেমস বাজারে আনত। পরে অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো কারবারে জড়িয়ে পড়ে। পি২৪-এর সঙ্গে বাংলাদেশে ১৫০ অপারেটর এবং ক্যাসিনো যুক্ত আছে। অনলাইনে বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত করে দেয়ার ক্ষমতা আছে তাদের। জুয়াড়িদের মুঠোফোনে লাইভ ক্যাসিনোতে যুক্ত করে দেয়ার সুবিধা তারা এনেছে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সেলিম র‌্যাবকে জানায়, তার জন্ম ১৯৭৩ সালে, ঢাকায়। ১৯৮৮ সালে ভাইয়ের মাধ্যমে জাপানে গিয়ে জাপানিদের সঙ্গে গাড়ির ব্যবসায় নিয়োজিত হয়। পরে জাপানিদের সঙ্গে থাইল্যান্ড গিয়ে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ব্যবসা করে। পরে মি. দু নামের এক কোরিয়ান তাকে অনলাইন ক্যাসিনো খোলার উপদেশ দেয়। তার কাগজপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, ওই কোরীয় ও সেলিমের ৫০-৫০ অনুপাতে লাভ ভাগের চুক্তি হয়েছিল। সেলিমের কাছে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১০০ কোটি টাকা। টেন্ডারবাজি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে সেলিমের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

যেভাবে অনলাইনে ক্যাসিনো খেলা

প্রথমে একজন জুয়াড়িকে মোবাইলে টি-২১ ও পি-২৪ নামের দুটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে হতো। পরে অ্যাপসগুলো থেকে তার পছন্দমতো গেম বাছাই করতেন। এরপর শুরু হতো খেলা। জিতলে টাকা জমা হতো জুয়াড়ির নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, আর হারলে টাকা কাটা যেত ওই একই অ্যাকাউন্ট থেকে। এভাবেই অনলাইনে ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন সেলিম প্রধান। লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম জানান, অনলাইনে ক্যাসিনো কার্যক্রমে অংশ নেয়ার আগে প্রত্যেক জুয়াড়িকে নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হতো। এখন পর্যন্ত এমন তিনটি ব্যাংকের নাম জানতে পেরেছে র?্যাব। ব্যাংকগুলো হলো যমুনা ব্যাংক, কমার্শিয়াল ব্যাংক ও সিলং ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কা। অ্যাকাউন্টগুলোয় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রাখতে হতো। লেনদেন হতো একটি গেটওয়ের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত একটি গেটওয়েরই সন্ধান পেয়েছে র?্যাব। সন্ধান পাওয়া ওই গেটওয়েতে কেবল এক মাসেই প্রায় ৯ কোটি টাকা জমা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আরও গেটওয়ে আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গেটওয়ের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া অর্থ সেলিম তার দুই সহযোগী আখতারুজ্জামান ও রোকনের মাধ্যমে তুলত। এ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করতেন সে।

যুবলীগ নেতার শেল্টার

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সেলিম প্রধানের উত্থান মূলত বিএনপি সরকারের সময়। সে সময় বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে ছিল তার দহরম-মহরম সম্পর্ক। তারেক রহমানের বন্ধু মামুনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় সেলিম প্রধান ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাটের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে সেলিম। থ্যাইল্যান্ডেও সেলিমের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। সেখানে সে ডন সেলিম নামে পরিচিত। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক এবং পাতায়া শহরে তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে ডিসকো বারও আছে।