• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৫, ১২ শাওয়াল ১৪৪০

স্বাগত ১৪২৬

মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , রোববার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯

image

নববর্ষ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি -সংবাদ

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’- বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় বৈশাখকে এভাবেই ধরাতলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবির কিরণে হাসি ছড়িয়ে পুরনো বছরের সব গ্লানি, অপ্রাপ্তি, বেদনা ভুলে নব আনন্দে জাগবে গোটা জাতি। আজ পহেলা বৈশাখ। একটি নতুন দিন, একটি নতুন বছরের শুভ সূচনা। শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৬। চৈত্রের রুদ্র দিনের শেষে আজ বাংলার ঘরে ঘরে নতুন বছরকে আহ্বান জানাবে সব বয়সের মানুষ। বাঙালির জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন এই পহেলা বৈশাখ। আজ নব আলোর কিরণশিখা শুধু প্রকৃতিকে নয়, রঞ্জিত করে নবরূপে সাজিয়ে যাবে প্রত্যেক বাঙালির হৃদকোণও। নব আলোর শিখায় প্রজ্বলিত হয়ে শুরু হবে আগামী দিনের পথচলা। আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো সব জরা-গ্লানিকে মুছে ফেলে সবাই গেয়ে উঠবেন নতুন দিনের গান। বৈশাখী উৎসবের মধ্যে দিয়ে যেন বাঙালি তার শিকড় খুঁজে পান।

চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা ও রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হবে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার বাণী। বিগত বছরের অনেক অসন্তোষ, না পাওয়ার দুঃখ-গ্লানিকে পেছনে রেখে নতুনের কেতন ওড়ানো বৈশাখ এসেছে নতুন সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও সমৃদ্ধি অর্জনের লড়াইয়ে জয়লাভের প্রতিশ্রুতি এবং প্রেরণা নিয়ে। আনন্দ-হিল্লোল, উচ্ছ্বাস-উষ্ণতায় দেশবাসী আহ্বান করছে নতুন বছরকে। গ্রীষ্মের দাবদাহ তুচ্ছ করে, অস্বস্তি উপেক্ষা করে চলবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। এ বছরের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে, ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’।

সৌরপঞ্জিকা অনুসারে বাংলা ১২ মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌরপঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তার সভাসদ আমির ফতেহউল্লাহ খান সিরাজি প্রায় ৪০০ বছরেরও আগে হিজরি সনের সঙ্গে মিল রেখে ফসলি সন হিসেবে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রচলন করেছিলেন। তখনই বাংলা সনের সূচনা হয় বৈশাখের প্রথম দিন থেকে। ওই থেকে আজ পর্যন্ত তা এই জনপদের মানুষের গর্বিত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। বৈশাখী উৎসব সংস্কৃতির অন্যতম সমৃদ্ধ এক উপাদানে পরিণত হয়েছে। এককালে বাংলা নববর্ষে হালখাতাই মুখ্য ছিল। এখনো হালখাতা আছে। ক্রমেই মুখ্য হয়ে উঠছে আনন্দ-উৎসব।

গত দুই বছরের মতো এবারও বর্ষবরণের সব অনুষ্ঠান নিরাপত্তার কারণে বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করা, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা খালি করার সরকারি নির্দেশ দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া মুখোশ পরে এবং মাঝখান থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ, ভুতুড়ে বাঁশি (ভুভুজেলা) বাজানোর ক্ষেত্রেও দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

গত বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রথমবারে মতো সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়। এবারও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা অনুষ্ঠান।

নাচ, গান, মেলা, নতুন হালখাতা, মিষ্টিমুখ, মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ উৎসবের নানা অনুষঙ্গে নববর্ষ উদযাপন নিত্যনতুন মাত্রায় উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষের সর্বজনীন উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে এই পার্বণ। গতকাল চৈত্রের শেষ দিনে গ্রাম ও শহরে ব্যবসায়ীরা গত বছরের বিকিকিনির হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছেন। আজ খুলবেন তারা হালখাতা। বিভিন্ন স্থানে বসেছে বৈশাখীমেলা। পটুয়া আর মৃৎশিল্পীরা মেলায় নিয়ে আসছেন তাদের সৃজনসম্ভার। নাগরদোলায় চড়া আর খেলনা, পুতুল, বাঁশিসহ বৈশাখী মেলার রকমারি পণ্য কেনার দুর্নিবার আকর্ষণে ছেলে-বুড়ো সবাই আজ মেলামুখো হবেন। আশপাশে তাকালে দেখা যাবে পোশাকেও রয়েছে বাঙালিয়ানার ছাপ। নারীরা আজ পরবেন নানা রঙের শাড়ি। কেউ কেউ খোঁপা বা বেণীতে গুঁজবেন নানা রঙের ফুল, হাতে পরবেন চুড়ি, কানে দুল। ছেলেরা পরবেন পাঞ্জাবি। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে হাওয়াই মিঠাই, রঙিন বেলুন, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল, জিলাপি, খৈ-বাতাসা, ঘর-গৃহস্থের দরকারি বস্তুসহ নানা সামগ্রী। গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলা শহরাঞ্চলেও সম্প্রসারিত হয়েছে। রমনার বটমূলে ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার নব উন্মেষকালে ছায়ানট ওই যে কাকডাকা ভোরে নববর্ষকে আবাহনী গান গেয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সেটি আজ রাজধানীবাসীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। আজ রাজধানীর পথ মিশে যাবে রমনায় এসে। তবে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণের অনুষ্ঠানটি আজকাল আর রাজধানী ঢাকার রমনাতেই কেবল সীমাবদ্ধ নেই, নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এবারও মিরপুর, গুলশান, উত্তরা, সাভার প্রভৃতি এলাকায় ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়েই বর্ষবরণ হবে। আর ঢাকার বাইরে গ্রামবাংলায় এক ভিন্ন আমেজে বর্ষবরণ হবে। সেখানে মেলার আয়োজনই মুখ্য।

বাণী : রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পৃথক শুভেচ্ছা বার্তায় দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। রাতের আঁধার ঠেলে ভোরের রবি যখন উঁকি দেবে ঠিক তখনই শুরু হবে বর্ণাঢ্য বৈশাখী অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রগুলো বের করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। রেডিও-টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।