• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১

সবার ঘরে বিদ্যুৎ

স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে

    সংবাদ :
  • ফয়েজ আহমেদ তুষার
  • | ঢাকা , সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯

image

‘সবার ঘরে বিদ্যুৎ’ পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল ২০২১ সালের মধ্যে। প্রায় এক দশক (দশ বছর) আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ঘোষণা অনেকটা স্বপ্ন মনে হলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ। শেখ হাসিনার নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এই অর্জন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, স্বাধীনতার ৩৯ বছরে (১৯৭১-২০০৯) যেখানে ৪৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে, সেখানে ২০২১ সালের মধ্যে অর্থাৎ মাত্র ১২ (২০০৯-২০২১) বছরে অবশিষ্ট ৫৩ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার ঘোষণা ‘স্বপ্নের’ মতোই মনে হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে গত এক দশকে (২০০৯-২০১৯) দেশের আরও ৪৭ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশের ৯৪ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। অবশিষ্ট ৬ শতাংশ জনগণকেও এ বছরের মধ্যেই বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সংবাদকে বলেন, ‘সবার ঘরে বিদ্যুৎ’ পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রতি দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এ সফলতার ‘নেপথ্য নায়ক’। তার (প্রধানমন্ত্রীর) সময়োপযোগী, দূরদর্শী, সহাসী ও কার্যকর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই দেশের বিদ্যুৎ খাত অতি অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর পাশপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থা ও কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং কর্মরতরাও এই সাফল্যের অংশীদার বলে মনে করেন তিনি।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে (২০০৮ সালে) ‘দিনবদলের সনদ’, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে (২০১৪ সালে) ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে (২০১৮ সালে) ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ সেøাগানে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। প্রতিটি ইশতেহারেই নির্দিষ্ট সময়ে ‘সবার ঘরে বিদ্যুৎ’ পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি ছিল। তবে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ সেøাগানে সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য থেকে এক বছর এগিয়ে ২০২০ সালের মধ্যে সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই মেয়াদে টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলেই ‘নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে’ অভীষ্ট লক্ষ্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতে পেরেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। আর টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রতিশ্রুতি পূরণ করে সামনে আরও এগিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, বিদ্যুৎ খাতে সরকারি বিনিয়োগের পাশপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের অবাধ সুযোগের নীতি বাস্তবায়নের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকেও দ্রুত বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. আহমদ কায়কাউস সংবাদকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের অংশীদার হিসেবে ‘বিদ্যুৎ বিভাগ’ কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। প্রধান লক্ষ্য উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে যৌক্তিক ও সহনীয় মূল্যে সবার জন্য নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা। তিনি বলেন, দিন দিন চাহিদা বাড়ছে, বিদ্যুৎ খাত বড় হচ্ছে, কাজের পরিধিও বাড়ছে। তবে যথাসময়ের আগেই সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগ সমর্থ হবে বলে সচিব আশা প্রকাশ করেন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখে গেছে, নির্ধারিত সময়ের আগে এই (শতাভাগ বিদ্যুৎ) লক্ষ্য পূরণে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও ছিল। এর মধ্যে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বিদ্যুতের লাইন নেয়া ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবার মানুষ নিজের গ্রাম, আদিনিবাস ছেড়ে ‘মাঠে-প্রান্তরে’ কিংবা নতুন সড়কের পাশে বাড়িঘর তৈরি করছে। ফলে বিদ্যুতের বর্ধিত চাহিদার জোগান দেয়ার পাশপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন স্থাপনসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিদ্যুৎ বিভাগকে এগোতে হচ্ছে। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সাফল্যের দৃষ্টান্তও রেখেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ ‘সন্দ্বীপ’ও এখন জাতীয় গ্রিডের আওতাধীন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের দৃঢ়চেতা মনোভাব এবং সাহসী সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই চট্টগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত উপজেলা সন্দ্বীপের জনগণ আজ গ্রিড বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। সাগর তলদেশে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের মাধ্যমে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর ‘সাগরদ্বীপ’ সন্দ্বীপকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের আওতায় আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালে সন্দ্বীপে এসে দ্বীপবাসীকে শতভাগ বিদ্যুৎ দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেনÑ এটা তারই প্রতিফলন। বিশাল সাগর পাড়ি দিয়ে জাতীয় গ্রিডের যে বিদ্যুৎ সন্দ্বীপে এসেছে, এটা দ্বীপবাসীর জন্য পরম আনন্দের এবং বিশাল পাওয়া। দ্বীপবাসীর আশা, এই গ্রিড সংযোগ শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ তাদের নাগরিক জীবনে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের সীতাকু- থেকে সন্দ্বীপ পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সাগর তলদেশে সাবমেরিন কেবল স্থাপন করে সন্দ্বীপের চার লাখ অধিবাসীকে গ্রিড বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। উপকূল থেকে ১৫ কিলোমিটারের ৩৩ কেভির দুইটি কেবল স্থাপনের মাধ্যমে গ্রিড সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া সন্দ্বীপ ১৬ ও সীতাকু-ে ১০ কিলোমিটার ওভারহেড লাইন (মাটির ওপর) স্থাপন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে একটি কেবলের মাধ্যমে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকি কেবলটি রাখা হয়েছে চাহিদা বৃদ্ধির বিকল্প হিসেবে। দুই কেবলের মাধ্যমে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা সম্ভব হবে।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা। কয়েক বছর আগে সীমিত সংখ্যক বাড়িতে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও স্থানীয় বেশিরভাগ মানুষের সন্ধ্যা শুরু হতো হারিকেনের আলোয়। উপজেলার আলীখালী এলাকায় ১১৬ একর জমিতে ২০১৮ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া ২০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বদলে দিয়েছে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা।

সরেজমিন দেখা গেছে, এখন আর সন্ধ্যা নামতেই ঘুমের দেশে চলে যায় না ওই এলাকার মানুষ। সৌরবিদ্যুতের বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হওয়া ওই জনপদে লোডশেডিংও নেই।

বিপিডিবি সূত্র জানায়, উপজেলার গ্রাহকদের চাহিদার ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। ২০ মেগাওয়াটের এই প্রকল্প থেকে ১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করে অবশিষ্ট ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিপিডিবির তত্ত্বাবধানে যুক্তরাজ্যের প্রোইনসোর নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জুলস পাওয়ার লিমিটেড (জেপিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। প্রতিষ্ঠানটিকে সহযোগিতা করেছে টেকনাফ সোলারটেক এনার্জি লিমিটেড (টিএসইএল)।

বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ সংবাদকে বলেন, এক সময় চাহিদার তুলানায় বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক কম ছিল। বর্তমানে চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। আশা করি, নির্ধারিত সময়ের আগেই আওয়ামী লীগ সরকারের রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে আমরা সমর্থ হব।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘৫২ লাখ হোম সোলার সিস্টেম’ স্থাপনের বিষয়টি এখন সবারই জানা। বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্র্রেডা) সূত্রে জানা গেছে, সোলার হোম সিস্টেমের (এসএইচএস) মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের বিদ্যুতের আওতায় আনার কাজ করছে সরকার।

সূত্র মতে, রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অধীন এবং বেসরকারি উদ্যোগে দেশের ৫২ লাখের বেশি বাসায় (সোলার হোম সিস্টেম) সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। এই কর্মসূচি সবার জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার সরকারি রূপকল্পের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নবয়নযোগ্য এই জ্বালানি কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে যেসব এলাকায় ঘনবসতি, সেখানে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ছোট আকারের (২০০ কিলোওয়াট) গ্রিড এবং সেচেও সংযোগ দিচ্ছে ইডকল। ফলে চরাঞ্চলের মানুষ শহরের মানুষের শহরের মতো গ্রিড বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে।

কোম্পানি সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ২৪টি ছোট আকারের গ্রিড উৎপাদনে আছে, আরও ১৫টি শীঘ্ররই উৎপাদনে আসবে। ইডকলের আওতায় রংপুর, কুষ্টিয়া এলাকায় ১ হাজার ২০০ সৌরচালিত সেচপাম্প বসানো হয়েছে। এছাড়া শিল্প প্রতিষ্ঠানের ছাদেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সহযোগিতা করছে ইডকল।

পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে সলিড ওয়েস্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জে ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের সলিড ওয়েস্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, এ ধরনের বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেশি হলেও পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার বিষয়টি বিবেচনা করলে তা লাভজনক। এ ধরনের বিদ্যুতের উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশও উৎপাদন খরচ বিবেচনায় না নিয়ে বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় রাখে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন সংবাদকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত দশ বছরে দেশকে যে বিস্ময়কর অগ্রগতির দিকে নিয়ে গেছেন, বিদ্যুৎ খাত এর মধ্যে অন্যতম। বিদ্যুৎ খাতের এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির নেপথ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নিবিড় তত্ত্বাবধায়ন। তিনি এ খাতের ‘আদ্যোপান্ত’ খবর রাখেন।

বিদ্যুৎ খাতের নতুন পরিকল্পনার বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘সলিড ওয়েস্ট’ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। আমাদের দেশেও গরুর গোবর দিয়ে বায়োগ্যাস হচ্ছে। এই গ্যাস রান্না ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। এখন বড় পরিসরে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বেশিরভাগ মানব বর্জ্যই সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। এতে ভয়ঙ্করভাবে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। আমরা চাইছি ‘সলিড ওয়েস্ট’ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে এক দশক আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দেয়। পরিস্থিতির উত্তরণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার মিশ্র ও নাবয়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্যাসের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়। সরকার তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশপাশি কয়লা, তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সৌর, বায়ু, বায়োগ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোগ নেয়। সরকারের ধারাবাহিকতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। নীতিমালা সহজ করায় বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিও বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। তা দেশের বিদ্যুৎ খাততে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাত ছিল চরম অস্থিতিশীল। ওই সময় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খুবই কম থাকায় দিনরাত লোডশেডিং লেগেই থাকত। দ্রুততম সময়ে চাহিদা ও উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ছোট ছোট প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়। এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ায় এ খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। এরপর সরকার মধ্য মেয়াদি এবং পরে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দেয়। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে মিশ্র জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তেল-গ্যাসের পাশপাশি কয়লা এবং এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়।

পাওয়ার সেল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্য ছিল ২৭টি। গত দশ বছরে ১০৯টি বেড়ে বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৬টি। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়। গত ২৯ মে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড হয়েছে ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট। সে সময় স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ স্থাপতি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২২ হাজার ৩২৯ মেগাওয়াট। দেশে গত দশ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়েছে ১৭ হাজার ৩৮৭ মেগাওয়াট। এক দশক আগে দেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিল ১ কোটি ৮ লাখ; শতকরা ৪৭ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। বর্তমানে বিদ্যুৎ গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ৪৮ লাখ; শতকারা ৯৪ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। দশ বছরে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা (কিওঘ) থেকে ২৯০ কিওঘ বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৫১০ কিলোওয়াট ঘন্টায়। সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন এবং গ্রিড সাব-স্টেশন ক্ষমতাও বেড়েছে কয়েকগুণ।

দেশের সিংহভাগ (৬১টি জেলা, ৮৪ হাজার ৮০০ গ্রাম) অঞ্চলে প্রায় ১১ কোটি মানুষকে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীনস্থ ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলকে বিদ্যুতের আওতায় আনতে কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠান। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে পবিসের ‘আলোর ফেরিওয়ালা’র মতো অভিনব কর্মসূচি সব মহলে প্রশংসা পেয়েছে। এক দশক আগে যেখানে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক হতে (একটি মিটার পেতে) বছরের পর বছর ঘুরতে হতো, বর্তমানে ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ কর্মসূচির আওতায় গ্রাহকরা দ্রুততম সময়ে, এমনকি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘স্পট কানেকশন’ (তাৎক্ষণিক সংযোগ) পাচ্ছেন।

বিআরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অব.) সংবাদকে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে গ্রামে বসবাসকারী ৮৫ শতাংশ জনগণকে বিদ্যুৎ দিতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। বিআরইবি এই কর্মসূচির অন্যতম অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী বিআরইবির প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। আশা করি, নির্ধারিত সময়ের আগেই বিআরইবির আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অধীনস্থ অঞ্চল শতভাগ বিদ্যুতায়িত হবে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় জেষ্ঠ্য নেতাদের বক্তব্যেও সরকারের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের বার্তা উঠে আসে। বিগত যে কোন সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে, সেটি দলের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় অনেক নেতা (যারা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন) স্বীকার করেন।

বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন যথেষ্ট বেড়েছে। বর্তমানে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। এখন সরকারকে সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্মত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর কাজ করতে হবে। এছাড়া এ খাতকে যথাসম্ভব দুর্নীতিমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত সময় সংসদ অধিবেশন, গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তার ভাষণ এবং বক্তব্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আমলে বিদ্যুতের উন্নয়নের তুলনামুলক চিত্র উপস্থাপন করে বলেছেন, এ দেশে বিদ্যুৎ খাতে যত উন্নয়ন, সব আওয়ামী লীগের আমলেই হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য দ্রুততম সময়ে সবার ঘর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করা।

‘২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত এবং ‘এক-এগারো’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের তুলনায় বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কেমনÑ সংবাদের এমন প্রশ্নের জবাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলার গ্রাহকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও ‘এখন লোডশেডিং হয় কি না প্রশ্নের জবাবে সবার একই উত্তরÑ ‘লোডশেডিং নেই। হঠাৎ কখনও বিদ্যুৎ চলে গেলেও স্বল্প সময়েই ফিরে আসে। লোডশেডিংয়ের বিষয়ে রাজধানীর ৩৮৩ পশ্চিম রামপুরা থেকে খন্দকার তানভীর উল ইসলাম এক দশক আগের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, সে সময় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যেই ছিল। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। এভাবেই চলত সারা দিন। এখন তার এলাকায় লোডশেডিং নেই। একই কথা জানালেন ৬০৯ বড় মগবাজরের শেফিক রহমান সুমন, ৫০১ বনগ্রামের ইলিয়াস খান, ২৯/১ মাতুয়াইল হাইস্কুল রোডের আসমা উল হোসনাসহ অনেকে। রাজধানীর বাইরে সোনারগাঁয়ের (নারায়গেঞ্জ) জাহের মিয়া, গজারিয়ার (মুন্সীগঞ্জ) মো. মুকুল খান, দাউদকান্তির (কুমিল্লা) আক্তার হোসেন, হালিশহরের (চট্টগ্রাম) মো. শহিদুল ইসলাম, রংপুর সদরের বায়েজিদ বোস্তামি, খুলনার আজাদ হোসেন, সিলেটের রোমান সরকার, রাজশাহীর গৌতম চন্দ্র ঘোষ, বরিশালের আবদুর রহমান, ময়মনসিংহের ফজলুল হক, পাবনার রানা হকসহ অনেকেই বর্তমান বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সবার একই উত্তর, বিদ্যুৎ খুব একটা যায় না গেলেও অল্প সময়েও মধ্যেই চলে আসে।

সার্বিক পরিস্থতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘বিদ্যুতের আসা-যাওয়া’র অভিশাপ থেকে অনেক আগেই মুক্ত হয়ে চাহিদা চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামর্থ্য অর্জন করেছে দেশ। এখন সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে সমস্যা কিংবা ‘ওভারলোড’ সমস্যার কারণে হঠাৎ ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাট’ হলেও অল্প সময়েই তা সমাধান হয়ে যায়। বিদ্যুৎ খাতে ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি’ নিশ্চিত করতে সার্বিক কার্যক্রম ‘ডিজিটাল’ করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য এখন সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।