• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২০, ১৪ সফর ১৪৪২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৭

সুনামগঞ্জে বাউল শিল্পীর গানের ঘরে আগুন : বাদ্যযন্ত্র পুড়ে ছাই

দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করতে পারেনি পুলিশ নিন্দার ঝড়

সংবাদ :
  • লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ

| ঢাকা , বুধবার, ২০ মে ২০২০

image

বাউলের অগ্নিদগ্ধ গানের ঘর -সংবাদ

বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুরের উজান ধলের বাড়ির বাউলগানের আসর ঘর দুবৃত্তদের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘরে থাকা তার ও তার নিজের শিষ্যদের বাদ্যযন্ত্র, গীতিগ্রন্থসহ প্রায় ৪০ বছরের সংগৃহীত বাউল গানের মূল্যবান উপকরণও ভস্মীভূত হয়েছে। এ ঘটনায় মুষড়ে পড়েছেন শিল্পী। এদিকে সহজ সরল ও নির্বিরোধ জীবনের অধিকারী বাউল রণেশ ঠাকুরের গানের ঘর পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। তারা অবিলম্বে দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। গত রোববার রাতে দুস্কৃতকারীরা আগুনে পুড়িয়ে দেয় রণেশ ঠাকুরের গানের ঘর। এদিকে গতকাল বিকেলে কথা বলেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন। তিনি বাউলকে তার শখের দোতারা কিনে দেয়ার কথা বলেছেন।

বাউল রণেশ ঠাকুর ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বাড়ি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের বাড়ির পাশেই অবস্থিত। মৌলবাদীরা যখন গানের শুরুতে শাহ আবদুল করিমের বিরুদ্ধে ছিল তখন বাউল রণেশ ঠাকুরের পিতা হাওরাঞ্চলের বিখ্যাত কীর্তনীয়া ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রবনী মোহন চক্রবর্তী তাকে নানাভাবে মানসিক সহযোগিতা দেন। রণেশ ঠাকুরের ভাই প্রয়াত রুহী ঠাকুর ছিলেন বাউল সম্রাটের প্রধান শিষ্য। তারা দুই ভাইয়ের গুরু ছিলেন তিনি। রণেশ ঠাকুর ও রুহী ঠাকুর শাহ আবদুল করিমকে গুরুভাই ডাকতেন। এই দুই পরিবারে এখনও আজন্মের বন্ধন বিদ্যমান। বর্তমানে জীবিতদের মধ্যে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের অন্যতম প্রধান শিষ্য তিনি।

জানা গেছে, বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিমের বাড়ির পাশে রণেশ ঠাকুরের বাড়িতে গানের ঘরে করোনার আগেই প্রতিদিন বাউল আসর বসত। বাউলের বসতঘরের উল্টোদিকেই রণেশ ঠাকুরের গানের ঘর। গত রোববার রাত ১টার পর রণেশ ঠাকুরের বড় ভাইয়ের স্ত্রী আগুন দেখে সবাইকে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন। অন্যরা ঘুম থেকে ওঠে দেখেন আসর ঘর পুড়ে যাচ্ছে। এ সময় বাউল সম্রাটের ছেলে বাউল শাহ নূরজালাল, ভাগ্নে বাউল শাহ আবদুল তোয়াহেদসহ তাদের আত্নীয়-স্বজনরা ছুটে যান। তারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও পুরো ঘর ছাই হয়ে যায়। এই ঘরে বাউল রণেশ ঠাকুরের বাদ্যযন্ত্র, গানের বইসহ বাউল গানের মূল্যবান উপকরণ ছিল। এই ঘরের পাশেই তার ভেড়াও থাকতো। তবে আগুনের তাপে ভেড়াগুলো বেরিয়ে আসে। ভেতরের জিনিষপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ঘটনার পর মুষড়ে পড়েছেন তিনি। মন খারাপ করে ভস্মীভূত ঘরে বসে আছেন। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে জানেন না তিনি। আগুনে তার ঢোল, ছইট্টা, দোতরা, বেহালা, হারমোনিয়ামসহ নানা যন্ত্র পুড়ে গেছে। কয়েক যুগে এসব যন্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন তিনি।

শাহ্ আবদুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল বলেন, রাত প্রায় দেড়টায় চিৎকার শুনে তিনি এগিয়ে গিয়ে দেখেন বাউল রণেশ ঠাকুরের আসর ঘরে দাউ দাউ করে আগুন জ¦লছে। রণেশ ঠাকুর কান্নাকাটি করছেন। আমাদের বাড়ির সবাই ছুটে গিয়েছিলাম। সবার চেষ্টায় আগুন নেভালেও রণেশ ঠাকুরের প্রায় চল্লিশ বছরের সাধনার সব যন্ত্রপাতি, গানের বইপত্র পুড়ে ছাই হয়েছে। তিনি এ ঘটনার পর মন খারাপ করে বসে আছেন।

এ ঘটনার খবর পেয়ে গত সোমবার বিকেলে দিরাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করছেন বলে জানিয়েছেন দিরাই থানার এসআই জহিরুল ইসলাম।

এদিকে বাউল রণেশ ঠাকুরের গানের ঘর পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছেন সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মীরা। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে দোষীদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত বাউল রশেণ ঠাকুরের ভক্তরাও প্রতিবাদ করেছেন।

সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির কার্যনির্বাহী সদস্য বিজন সেনরায় বলেন, বাউল রণেশ ঠাকুর সুনামগঞ্জ জেলার বিখ্যাত একজন বাউল। তিনি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের অন্যতম প্রধান শিষ্য। নির্বিরোধ বাউল তিনি। যারা তার গানের ঘর ও মূল্যবান জিনিষপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে তাদের বিচার চাই। দিরাই থানার এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, আমি সরেজমিন গিয়ে দেখেছি বাউলের যন্ত্রপাতি সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে রণেশ ঠাকুরকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি কাউকে সন্দেহ করেন কি না। তিনি সন্দেহপ্রবণ কারও নাম বলতে পারেননি। তবে আমাদের ধারণা আশপাশের কেউ এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।

দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সফি উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নগদ অর্থ প্রদান ও ঘর নির্মাণ করে দেয়ার আশ্বাস দেন । জেলা প্রশাসক মো. আবদুল আহাদ জানান, আমরা সার্বক্ষণিক

খোঁজখবর রাখছি, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ।পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, ঘটনাটি যে বা যারা ঘটাক তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে । কোন ছাড় দেয়া হবে না ।