• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, ১২ শাবান ১৪৪১

প্রভাবশালী কয়েক নেতাকে নিয়ে গঠিত

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ক্যাসিনো চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি

মূল হোতা খালেদ-শামীম-ফিরোজ-সম্রাট

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সিন্ডিকেট গড়ে তুলে খালেদ মাহমুদ ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক এবং জিকে শামীম টেন্ডারের মাফিয়া হয়ে ওঠেন। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও মহানগর কমিটির প্রভাবশালী কয়েক নেতাকে নিয়ে গঠিত এসব সিন্ডিকেট ক্যাসিনো চালানো, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ব্যবসা, মাদক ব্যবসা এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে এমন কোন অপকর্ম নেইÑ যা করতেন না। সিন্ডিকেটের অধিকাংশ নেতার অতীত ইতিহাস অন্য দল থেকে আসা। এসব সিন্ডিকেটের নেতারা কেউ ক্যাসিনো ব্যবসা, কেউ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কেউ চাঁদবাজি, কেউ মাদক ব্যবসা, কেউ অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন চলছে। মূলত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মহানগরের কে কোন অফিসের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করবেন, কে কোন ক্লাবের ক্যাসিনো চালাবেন- এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা ঠিক করতেন। এসব সিন্ডিকেটের অধিকাংশ নেতা এখন আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ক্লাব পরিচালনার অন্তরালে মাদকের গডফাদার হয়ে ওঠেন। মূলত মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টাকা কামানোর মেশিন পেয়ে যান তিনি। গ্রেফতার হওয়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া এসব তথ্য নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, অল্প সময়ে ধনী হওয়ার মতো ব্যবসা ক্যাসিনো। ক্যাসিনো বসিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা পেতেন খালেদ মাহমুদ ভূইয়া। একপর্যায়ে ক্যাসিনো পরিসর বাড়াতে নতুন নতুন সরঞ্জামের পাশাপাশি মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ যুক্ত করেন। নেপাল, চীনসহ বিদেশি তরুণীদের এনে ডিজে পার্টি থেকে শুরু করে সব আয়োজন করেন। এসব কারণে দিনে দিনে ইয়াংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো থেকে আয় বাড়তে থাকে। ক্যাসিনোর পাশাপাশি টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিও নিয়ন্ত্রণ করতে বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলেন খালেদ। ইয়াংমেনস ছাড়া রাজধানীতে যত ক্যাসিনো রয়েছে, এর কোনটি কে নিয়ন্ত্রণ করবে- এ বিষয়ে খালেদের সহযোগিতা ছিল। মিলেমিশে রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন তারা। একেক ক্লাব একেকজনের নিয়ন্ত্রণে থাকত। প্রতিদিন সিন্ডিকেটের বৈঠক, গেট টুগেদার অনুষ্ঠান থাকত। বিদেশে গিয়েও সিন্ডিকেটের সদস্যরা ঘুরে বেড়াতেন। মতিঝিলে মোট ছয়টি ক্লাব রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব সভাপতি ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাউছার, আরামবাগ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব সভাপতি ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে মমিনুল হক সাঈদ, ভিক্টোরিয়া ক্লাব সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও ইয়াংমেনসের সভাপতি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। সম্রাট ও খালেদ দুটি ক্লাব সভাপতি হলেও ওই ছয়টি ক্লাবের প্রতিটি জুয়ার আসর সম্রাট ও খালেদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলত। এছাড়া দৈনিক তারা জুয়ার আসর থেকে চাঁদা উত্তোলন করতেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, জিকে শামীম, খালেদ ও কলাবাগান ক্রীড়াচক্র সভাপতি শফিকুল ইসলাম ফিরোজ সবাই একই পথের পথিক। অঞ্চল ভাগ করে তারা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা ও অস্ত্র ব্যবসায় শেল্টার দেয়া, ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে শুরু করে সব ধরনের অসামাজিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাদের অপকর্মের বিষয়ে দলের অনেকেই জানতেন। বিশেষ করে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগের শীর্ষ নেতারা এসব বিষয়ে জানতেন। কিন্তু বিশেষ সখ্য থাকায় এদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অ্যাকশনে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হতো না।

সূত্র জানায়, খালেদ হাইব্রিড যুবলীগ নেতা হয়েও যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কয়েক নেতার আশীর্বাদে পদ পেয়েছেন। এ জন্য কোটি কোটি টাকাও খরচ করেছেন। আর এসব অর্থ পুষিয়ে নিতে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতেন। অপকর্মের কাজে কোন বাধা এলে তা শেল্টারে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনেই অস্ত্রের লাইসেন্স নেন খালেদ। তার নামে দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল। দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও অবৈধ অস্ত্রও নিজের কাছে রেখেছেন খালেদ। মূলত অবৈধ অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি দেখাতেন তিনি। তার কাছে অস্ত্র ও অস্ত্রধারী বাহিনী রয়েছে- এটা জানার কারণে তার অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেত না।

খালেদ মাহমুদের বড় শক্তি ছিল যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসলাম চৌধুরী সম্রাট। সম্রাট গ্রুপের নেতা হিসেবেই যুবলীগের পদ পান তিনি। যুবলীগের পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মতিঝিল, পল্টন, খিলগাঁও, সুবজবাগ, মুগদা, থানা এলাকায় ফুটপাত থেকে শুরু করে টেম্পোস্ট্যান্ড, সরকারি অফিসগুলোয় বিভিন্ন উৎসবের নামে চাঁদা তুলতেন লোকজন দিয়ে। মতিঝিল সরকারি বিভিন্ন অফিসের যাবতীয় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন। ইয়াংমেনস ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো বসিয়ে অসামাজিক কর্মকান্ড বেশ দাপটের সঙ্গেই শুরু করেন। ক্যাসিনো ব্যবসা জমজমাট করতে নেপাল থেকে প্রশিক্ষিত তরুণীদের দিয়ে ডিজে পার্টির আয়োজন করতেন। নেপালি তরুণীদের ডিজে পার্টির সঙ্গে চলত বিভিন্ন ধরনের মাদকের জমজমাট আসর।

সূত্র জানায়, খালেদের বিরুদ্ধে প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ঠিকাদারি কাজ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি সিটি করপোরেশনের মতিঝিলের সড়ক মেরামতের ৫২ কোটি টাকার কাজ করছেন। সম্প্রতি পূর্বাচলে ৪০ কোটি টাকার সরকারের একটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেন তিনি।

খালেদের অন্যতম পার্টনার জিকে বিল্ডার্সের কর্ণধার জিকে শামীমও ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের অনুসারী ছিলেন। মূলত সম্রাটের শক্তি ব্যবহার করে ঠিকদারিতে টেন্ডারের মাফিয়া হয়ে ওঠেন শামীম। গণপূর্তের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রতিটি কাজের পার্সেন্টেস দিয়েই কাজ ভাগিয়ে নিতেন। প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে শামীমের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তার কথামতোই প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল বড় বড় কাজের টেন্ডারের প্রক্রিয়াগুলো গোপনে শেষ করতেন। এসব কাজ কমিশন বিনিময়ে ভাগিয়ে নিতেন শামীম। যুবলীগ নেতা পরিচয়ে ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার জন্য তিনি সব ধরনের শক্তি ব্যবহার করতেন। কখনও অস্ত্রের ভয়, কখনও অর্থের লোভ দেখিয়ে বড় বড় কাজ ভাগিয়ে নিতেন। গণপূর্তের কাজের নিয়ন্ত্রক হলেও শামীমের পদচারণা ছিল সব দিকেই। সব সরকারি দফতরেই তিনি টেন্ডারের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। কোন অফিসের কাজ কে করবে, কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে, ওই কাজে কাকে কীভাবে কমিশন দেয়া হবেÑ এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত ছিল শামীমের। অফিসপাড়ার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের শামীম প্রয়োজনেই খালেদ, সম্রাট, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা জাহিদসহ ডজনখানেক যুবলীগ নেতাদের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

শামীম ও খালেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক আইনে করা ৪ মামলার তদন্তকারী সংস্থা ডিবির উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম সাকলাইন জানান, খালেদ ও শামীমের বিরুদ্ধে অস্ত্র এবং মাদক আইনে করা মামলাগুলো তারা তদন্ত করছেন। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, ওইসব অভিযোগের বিষয়েই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নিয়ম মেনে দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাদের ওষুধ, খাবার দেয়া হচ্ছে ঠিকমতো। তিনি বলেন, খালেদ মাহমুদকে ১০ দিনের রিমান্ড হেফাজতে পেয়েছেন তারা। ইতোমধ্যে ৩ দিন পার হয়েছে। আর শামীমকে গতকাল থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।

রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান জানান, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতির বিরুদ্ধে মামলা তদন্তের জন্য ডিবিতে পাঠানো হয়েছে। তাই তাকে ডিবি হেফাজতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

র‌্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার-বিন-কাশেম সাংবাদিকদের জানান, শামীম তার অফিস ও বাসায় অভিযান না চালাতে এবং গ্রেফতার এড়াতে তাকে ১০ কোটি টাকার ঘুষ প্রস্তাব করেছিলেন। প্রস্তাব আমলে না নিয়ে তিনি শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চালান, তাকেসহ তার সাত দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করেন। মূলত টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ওই অভিযান চালানো হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শামীম র‌্যাবকে জানিয়েছেন টেন্ডারবাজিতে তিনি গণপূর্তের শীর্ষ প্রকৌশলীসহ ২০ জন পদস্থ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতেন। কাউকে টাকা দিয়ে, কাউকে ক্ষমতা দেখিয়ে ম্যানেজ করতেন। সাবেক ও বর্তমান অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন- যাদের মোটা অঙ্কের অর্থ, দামি উপঢৌকন দিয়ে সব সময় খুশি রাখেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের তিনি টাকা দিতেন। বড় বড় কাজ ভাগিয়ে নিতে তিনি শীর্ষ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের দিয়ে তদবির করানোর পাশাপাশি নিজের ক্ষমতাও ব্যবহার করতেন। কোন কোন নেতাকে কত টাকা দিতেন, কীভাবে টাকা দিতেন, কীভাবে টেন্ডার ভাগিয়ে নিতেন- এসব সবই বলেছেন শামীম। ঢাকার বাসাবো ও নিকেতনে তার অন্তত পাঁচটি বাড়ি রয়েছে। রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট আছে। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তার বাড়ি রয়েছে। তার বাসাবো ও নিকেতনের বাড়ি দুটি খুবই অত্যাধুনিক। সেখানে গণপূর্তের যুগ্ম ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক আলাপ ও লেনদেন করতেন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, শামীমই কমিশনের অর্থ বণ্টন করতেন। অধিকাংশ সময় কমিশন হিসেবে টাকা দিতেন। মাঝে মধ্যে শামীমের দু’জন বিশ্বস্ত সহযোগীর মাধ্যমেও কমিশনের টাকা পৌঁছে দেয়া হতো।