• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১ মহররম ১৪৪২, ০৩ আশ্বিন ১৪২৭

সংক্রমণ ঠেকাতে মাঠে কাজ করতে গিয়ে

সারাদেশে সাড়ে ৮শ’ পুলিশ করোনা আক্রান্ত

এক সপ্তাহের ব্যবধানে মৃত্যু ৫ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ২৩২ জন সুরক্ষার অভাব, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে

সংবাদ :
  • সাইফ বাবলু

| ঢাকা , সোমবার, ০৪ মে ২০২০

image

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে মাঠে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা সংক্রমণ। ইতোমধ্যে ১ সপ্তাহের ব্যবধানে পুলিশের ৫ সদস্যের মৃত্যুর হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পুলিশের ২৩২ জন আক্রান্ত হয়েছেন করোনা সংক্রমণ ভাইরাসে। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে সাড়ে ৮শ’ পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপিতে)। মূলত পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব, এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই পুলিশ প্রাণঘাতী এ ভাইরাস প্রতিরোধে মাঠে কাজ শুরু করে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা কোনরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলেও দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসেনি। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা – সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দেয়া হলেও তা ছিল চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তাও সুরক্ষা সামগ্রী পুলিশের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরে ৭টি বেসরকারি ব্যাংকসহ কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে পুলিশকে পিপিই মাস্কসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দেয়া হলেও তাতে চাহিদা মেটেনি। কর্মকর্তা-সদস্য মিলে পুলিশের বর্তমানে ২ লাখেরও বেশি জনবল রয়েছে। বৃহৎ এ জনবলের সবাই বর্তমানে করোনা যুদ্ধে মাঠে রয়েছে। পরিস্থিতি যতোই কঠিন হোক না কেন দায়িত্ব থেকে সরে আসার সুযোগ নেই পুলিশের।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) মীর সোহেল রানা জানান, গতকাল করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজম্যান্ট (পিওএম)-এর পশ্চিম বিভাগের এসআই সুলতানুর আরেফিন। সুলতানুর আরেফিন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউতে) নেয়া হয়। গত শনিবার ভোরে তার মৃত্যু হয়। এসআই সুলতানুরের বাড়ি জামালপুর জেলায়।

তিনি আরও জানান, সুলতানুরসহ এ পর্যন্ত ৫ পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হলো করোনা আক্রান্ত হয়ে। এর আগে গত ২৯ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) দক্ষিণে কর্মরত এএসআই আবদুল খালেক (৩৬), ট্রাফিক উত্তরের বিমানবন্দর এলাকায় কর্মরত কনস্টেবল আশেক মাহমুদ (৪২) এবং ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার ডিএমপি ওয়ারী বিভাগের ওয়ারী থানায় কর্মরত কনস্টেবল জসিমের মৃত্যু হয়। এআইজি সোহেল রানা জানান, গতকাল সকাল পর্যন্ত সারাদেশে ৮৫৪ পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৪৫৯ জন আক্রান্ত। বাকিরা অন্য জেলায়, বিভাগে। গতকাল পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে গিয়েছেন ১২৫০ পুলিশ। আইসোলেশনে রয়েছে ৩১৫ জন। সুস্থ হয়েছে ৫৭ জন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাজারপুর পুলিশের কেন্দ্রীয় হাসপাতালের তথ্য মতে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ৩৫৩ জন ভর্তি রয়েছেন। এছাড়া অন্য জেলায় পুলিশ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে সব মিলিয়ে ৫৫৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল সূত্র জানায়, করোনা নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল। গতকাল থেকে পুলিশ কেন্দ্রীয় হাসপাতালে এ কার্যক্রম শুরু হয়। পুলিশ সদস্য বা তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কারও করোনার লক্ষ্মণ দেখা দিলে এখানে নমুনা পরীক্ষা করা হবে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পুলিশের অনেক কর্মকর্তারা করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। তারা বাসায় থেকে ব্যক্তিগতভাবে আইসোলেশনে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের পর্যাপ্তভাবে করোনা সংক্রমণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ অনেকেই আক্রান্ত হওয়ার পর ১৫ থেকে ২০ দিন বিভিন্ন জায়গায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পরে পরীক্ষা করে তাদের করোনা পজিটিভ আসছে। পুলিশের যে সব সদস্যরা পেট্রোল ডিউটিতে আছেন সেখানে সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব হচ্ছে না। একসঙ্গে পাশাপাশি থেকে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। অনেক সময় রাস্তার পাশে পুলিশ সদস্যদের কাছাকাছি বসে থেকেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে একটি গাইডলাইন প্রয়োজন। অনেক পুলিশ সদস্য মাস্ক বা হান্ড গ্লাভস কোনটাই ব্যবহার করছে না।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করোনা সংক্রমণ পুলিশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুত্বর। মূলত মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের অজান্তে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস নেই। এ পর্যন্ত পুলিশ নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েছে পুলিশ সদস্যদের মাঝে। চাহিদার তুলনায় তা রীতিমতো অপ্রতুল। থানার ব্যারাকগুলো, বিভিন্ন ইউনিটের ব্যারাকগুলোতে ধারণক্ষমতার অনেক বেশি পুলিশ সদস্য থাকে। সেখানে সামাজিক দূরত্ব নেই। এছাড়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের সব খানে যেতে হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশের যে দায়িত্ব সেখানে পুলিশকে সুরক্ষা সামগ্রী থাকুক বা না থাকুক দায়িত্ব পালন করতেই হবে। দেশে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার পর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে পুলিশ দিনরাত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তার দাফনের ব্যবস্থা শুরুতে পুলিশকেই করতে হয়েছে এবং এখনও করতে হচ্ছে। এছাড়া হাটবাজারগুলোতে এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থেকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের কাছ থেকে অন্যরা আক্রান্ত হয়েছে। এভাবে রীতিমতো পুরো বাহিনীতে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে ঢাকা, নারয়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ জেলায় পুলিশ সদস্য করোনায় বেশি আক্রান্ত হয়েছে। সার্বিকভাবে পুলিশ সদর দফতর থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে ২ লাখের বেশি পুলিশ রয়েছে। প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী হিসেবে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, স্যানিটাইজার দেয়া হয়েছে। তবে পিপিই সংকট থানায় তা প্রত্যেককে দেয়া সম্ভব হয়নি। মূলত করোনা পরিস্থিতে যারা বেশি কাজ করছেন, মূল কাজগুলো করছেন পিপিই শুধু তাদের দেয়া হচ্ছে। যেসব জেলায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ সেসব এলাকায় বেশি জোর দেয়া হচ্ছে।

সূত্র মতে ঢাকা বিভাগ, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর রাজশাহীসহ দেশের সব বিভাগ এবং জেলা এবং উপজেলা পয়ায়ে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে এ পর্যন্ত করোনায় ১৭৫ জনের মৃত্যু এবং সাড়ে ৮ হাজার আক্রান্ত হয়েছেন। দিন দিন করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ সারাদেশেই এখন পুলিশ মাঠে রয়েছে কোন সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া। করোনা সংক্রমণের মধ্যে নিরাপত্তা ডিউটিতে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ডিএমপি। ডিএমপির ৩৪ হাজার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মাত্র অল্প সদস্যই পিপিই পেয়েছেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে ৩০ হাজার পুলিশের জন্য রেশন বিতরণ হয়। করোনা পরিস্থিতিতে ওই পুলিশ লাইনসে ডিউটিরত কোন সদস্যদের উন্নতমানের সুরক্ষা সামগ্রী নেই। কিছু পুলিশের মাঝে পিপিই মাস্ক এবং হ্যান্ড গ্লাভস বিতরণ করা হলেও তা উন্নতমানের নয়। পলিথিনের তৈরি গ্লাভস এবং কাপড়ের তৈরি মাস্ক ব্যবহার করে ডিউটি করছে পুলিশ সদস্যরা।

সম্প্রতি পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ বলেছে, করোনাভাইরাস সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুলিশের অন্য হাসপাতালগুলোতেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এছাড়া, দেশের ৫টি বিভাগে চিকিৎসার আয়োজন করা হচ্ছে। আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের ঢাকায় যে চিকিৎসা দেয়া হবে, একই চিকিৎসা বিভাগীয় হাসপাতালেও দেয়া হবে। তাদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের নিজেদের সুরক্ষিত রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষা সামগ্রী দেয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের শৈথিল্য দেখানো যাবে না। ইতোমধ্যে সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের জন্য বিভিন্ন ইউনিটকে পর্যাপ্ত আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের জন্য ভিটামিন সি, ডি এবং জিংক ট্যাবলেট কেনা হচ্ছে। শীঘ্রই তা বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হবে। যে সব পুলিশ সদস্য কোয়ারেন্টিনে, আইসোলেশনে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তাদের নিয়মিত খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য ইউনিট প্রধানদের নির্দেশ দিয়ে আইজিপি বলেন, তাদের প্রার্থনা, বিনোদন ও বই পড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের নয়, তাদের পরিবারেরও খোঁজ-খবর নিতে হবে, যেন তারা নিজেদের একা মনে না করেন।