• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ২৩ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরশায়িত সাদেক হোসেন খোকা

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় সিক্ত বিএনপির সিনিয়র নেতা সাদেক হোসেন খোকাকে তার বামা-মার কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। গতকাল চার দফা নামাযে জানাজা শেষে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয় ঢাকার সাবেক এই মেয়রকে। দাফনের আগে খোকাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

গতকাল সকালে খোকার মরদেহ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকায় আসে। সেখান থেকে নেয়া হয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। সাবেক এই সংসদ সদস্যর প্রথম নামাযে জানাজা সেখানে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও ওয়ার্কাস পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নেতা ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সংগঠনগুলোর মধ্যে সিপিবি, গণফোরাম, এলডিপি, মনোবিজ্ঞান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জাগপা, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, তাঁতী দল, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, ছাত্র ইউনিয়ন, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও বাংলাদেশ যুব সমিতির নেতারা সেখানে ছিলেন।

বিভিন্ন আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খোকার বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা স্মরণ করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের উদ্দেশে বুক পেতে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘গুলি কর, আমার এখানে গুলি কর।’ তার জোরাল কণ্ঠে পুলিশ তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর পুরান ঢাকায় হিন্দুদের বাড়িঘর, মন্দির রক্ষায়ও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। সাবেক তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সায়ীদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর মানুষের জন্য কাজ করার ব্রত নিয়ে আজীবন সক্রিয় ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রেখেছিলেন আজীবন। মুক্তিযুদ্ধের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি গিয়েছিলেন, সেই লড়াই চালু রেখেছেন তিনি। মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন তিনি, মানুষও তাকে সেই সম্মান এখন দিচ্ছে।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর খোকার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। নয়াপল্টনের কার্যালয় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত সড়ক ও তার আশপাশের গলিতে হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থক জানাজায় অংশ নেন। পুরো পল্টন রোড কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। তখন ফুটপাতে হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান ধর্মাবলম্বীরাও মাথা নিচু করে শ্রদ্ধা জানান।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রয়াত নেতার কফিনটি দলীয় পতাকা দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর দলের পক্ষ থেকে কারাবন্দী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে কফিনে ফুল দেয়া হয়। কালো কাপড়ে মোড়া অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয় খোকার কফিন। নেতাকর্মীদের কফিনের সামনে কাঁদতে দেখা যায়। বিএনপি মহাসচিবসহ নেতারাও অশ্রুসজল ছিলেন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের সবার প্রিয় নেতা, দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, দুই বারের নির্বাচিত ঢাকার সাবেক মেয়র, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য, ঢাকা মহানগরের সাবেক সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এমন এক সময় চলে গেলেন যখন আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে। তিনি তাকে শেষ দেখা দেখতে পারলেন না। আজকে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্যাতনে সারা বাংলাদেশের মানুষ যখন অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত, সেই সময়ে যে মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল সাদেক হোসেন খোকা তার অন্যতম। তিনি চলে গেছেন; তার বর্ণাঢ্য রাজনীতির কথা বলার সময় নয়। সাদেক হোসেন খোকার এই অকালে চলে যাওয়ায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়।

দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের প্রতি পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে খোকার বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বাবার আত্মার মাগফেরাতের জন্য দোয়া চান। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শাহজাহান ওমর, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, জয়নাল আবেদীন, আহমেদ আজম খান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, হাবিবউন নবী খান সোহেল, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসহ দলের ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য, যুগ্ম মহাসচিবসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা অংশ নেন। ২০ দলীয় জোটের নেতারাও জানাজায় অংশ নেন। বিএনপির কার্যালয় থেকে কফিন নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে। সেখানে জানাজা শেষে গোপীবাগে পৈত্রিক বাসভবনে কিছুক্ষণ রাখা হয় খোকার মরদেহ। বাদ আসর ধুপখোলা মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

সন্ধ্যা ৬টার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জুরাইন কবরস্থানে। সেখানে বীর এই মুক্তিযোদ্ধাকে দেয়া হয় গার্ড অব অনার। খোকার মরদেহ কবরে নামানোর আগে ১ প্লাটুনের এই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে পুলিশের ১৭ সদস্যের একটি চৌকস দল ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আবদুল আউয়ালের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। তারা এই মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা স্যালুট জানান। এ সময় পুলিশের এডিসি নাজমুন নাহারসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর বাবা-মার কবরের পাশে দাফন করা হয় বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে।