• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১

সম্রাটের উত্থান কাহিনী

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , সোমবার, ০৭ অক্টোবর ২০১৯

image

রাজধানীতে দুই যুগ আগে সাধারণ এক ওয়ার্ড নেতা থাকলেও ক্যাসিনো কারবার থেকে এখন বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। যুবলীগ দক্ষিণের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে সঙ্গী করে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন তিনি। রাজধানীর ক্লাবপাড়ায় রমরমা জুয়ার আসর পরিচালনা করে ব্যাপক আলোচিত সম্রাট। ক্লাবগুলোয় জুয়ার আধুনিক সংস্কার ক্যাসিনো ব্যবসাও যুক্ত করেছেন। এ কারণে জুয়াড়িদের কাছে তিনি ক্যাসিনোসম্রাট নামেও পরিচিতি পেয়েছেন। জুয়া, ক্যাসিনো ছাড়াও ঢাকা দক্ষিণের গোটা অঞ্চলে ছিল তার দাপট। ১০ বছর ধরে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বাড়ি ও জমি দখলÑ সবই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। অবশেষে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে শনিবার মধ্যরাতে আত্মগোপনে থাকা সম্রাট ও আরমানকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

রাজধানীর মতিঝিলে ক্লাবপাড়ায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো চলার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে আলোচনায় ছিল যুবলীগ নেতা সম্রাটের নাম। সেদিন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেফতার হওয়ার পর সদলবলে কাকরাইলে সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে রাতভর সেখানে ছিলেন সম্রাট। এরপর নিরুদ্দেশ হন। র‌্যাবের অভিযানের সময় মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রের ভেতরে সম্রাটের বিশাল ছবি দেখা যায়। ওই ক্লাবের ক্যাসিনো তিনিই চালাতেন এবং মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় অন্য ক্যাসিনোগুলো থেকেও প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে চাঁদা তার কাছে যেত বলে গণমাধ্যমে খবর আসে।

সম্রাটের উত্থান নিয়ে যুবলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সম্রাটের বেড়ে ওঠা মতিঝিল আর রমনা এলাকায়। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার অধিবাসী সম্রাটের পিতা রাজউকের ছোট পদে চাকরি করতেন। বাড়ি পরশুরামে হলেও সেখানে তাদের পরিবারের কেউ থাকেন না। বাবার চাকরির সুবাদে ঢাকায় বড় হন সম্রাট। পরিবারের সঙ্গে প্রথমে বসবাস করতেন কাকরাইলে সার্কিট হাউস সড়কের সরকারি কোয়ার্টারে। তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্রাট দ্বিতীয়। রাজনীতিতে তার আগমন ঘটে নব্বই দশকের শুরুর দিকে। এ সময় কিছুদিন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবশ্য তার আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রসমাজের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে তার পরিচিতজনরা জানান। বিএনপির ১৯৯১-৯৬ আমলে ছাত্রলীগ ছেড়ে দিয়ে যুবলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০০৩ সালে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই সময় দক্ষিণের সভাপতি ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ মহি আর সাধারণ সম্পাদক নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। মূলত শাওনই সম্রাটকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। ২০১২ সালে সম্রাট যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হন। এরপর আর তার পেছনে তাকাতে হয়নি।

এদিকে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নিজস্ব কোন কার্যালয় না থাকলেও সম্রাট দায়িত্ব নেয়ার পর কাকরাইলে রাজমণি সিনেমা হলের উল্টোদিকে বিশাল এক ভবনের পুরোটায় অফিস শুরু করেন। সাংগঠনিক কাজের কথা বলা হলেও এখানে বসেই সম্রাট ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে থাকত তার কর্মী বাহিনী ও অপকর্মের সঙ্গীদের আনাগোনা। যে রাতে খালেদ গ্রেফতার হন, ওই রাতে সম্রাট তার অফিসেই ছিলেন বলে জানা গেছে। অবশ্য পরিবার নিয়ে তার বসবাস মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাড়িতে।

নানা অপকর্মের বিপরীতে সম্রাট যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি কাড়েন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ‘লোকবল’ সাপ্লাই আর অর্থ দিয়ে। তার রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের শোডাউন দেখাতেন তিনি। কর্মী বাহিনীকে একেক কর্মসূচিতে একেক ধরনের পোশাক পরিয়ে দৃষ্টি কাড়তেন সবার। এ জন্য সম্রাটকে শ্রেষ্ঠ সংগঠক বলে আখ্যায়িত করেন যুবলীগ চেয়ারম্যান। এমনকি ক্যাসিনো ব্যবসার খবর প্রকাশের পরও তার পক্ষে অবস্থান নেন যুবলীগ চেয়ারম্যান। গণমাধ্যম কর্মীদের একটি অংশের সঙ্গেও রয়েছে তার সখ্য। এ কারণে তার যে কোন কর্মসূচির মিডিয়া কাভারেজও ছিল চোখে পড়ার মতো।

যুবলীগের এক নেতা বলেন, ২০০৩ সালে যুবলীগের কাউন্সিলে জাহাঙ্গীর কবীর নানক ও মির্জা আজম দায়িত্ব পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্রাটের আসা-যাওয়া বেড়ে যায়। তখনই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সভাপতির দায়িত্ব পান মহিউদ্দিন মহি ও সাধারণ সম্পাদক নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। ওই সময় মহির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে শাওন নিজের হাত শক্ত করতে সম্রাটকে দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। শাওনের বিশ্বস্ত হিসেবেই সম্রাট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা সিটি করপোরশনের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০১২ সালে ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হন সম্রাট। সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর আরমানকে সহ-সভাপতি করে নেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সম্রাটের এই কর্মী বাহিনীর তথ্য জানতেন। এ জন্য তার প্রতি সফটকর্নার ছিল সব সময়। গত বছর সম্রাটের বিরুদ্ধে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। এটা জানতে পেরে শেখ হাসিনা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। আঞ্জুমানকে প্রধানমন্ত্রী নিজে ও তার বোন শেখ রেহানা বিভিন্ন সময়ে অনুদান দিয়ে আসছেন। সম্রাট তাদের কাছে চাঁদা চাওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষুব্ধ হয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সম্মেলনে যাওয়ার আগে তিনি যুবলীগ দক্ষিণের কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে যান। তবে ওই নির্দেশনা তখন বাস্তবায়ন পর্যন্ত গড়ায়নি। এরই মধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সম্রাটের জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবসা পরিচালনার রিপোর্ট পান প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে কানাডা সফরে গেলে মতিঝিল এলাকার সাবেক এক ছাত্রনেতা সম্রাটের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। সম্রাটের কারণেই তিনি রাজনীতি ছেড়ে কানাডা চলে গেছেন বলে জানান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলতে গিয়ে আবারও সম্রাটের নাম আসে। তখন প্রধানমন্ত্রী সম্রাটের জুয়া, ক্যাসিনো ব্যবসার নাম উল্লেখ করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন। এরপরই গ্রেফতার হন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ। এ সময় আলোচনায় আসে সম্রাটের নামও।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্রাট গত দিন দশক ধরে গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে ছিলেন। গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে থেকেও তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে ওই চেষ্টায় সফল হননি। সম্রাটের বড় ভাই বাদল চৌধুরী ঢাকায় তার ক্যাসিনো ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ছোট ভাই রাশেদ ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। তার বাবা মারা গেছেন। মা বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় থাকেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর সম্রাটের পরিবারের সবাই গাঢাকা দেন। সম্রাটের ঘনিষ্ঠ দুই সহচর হলেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ। যুবলীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা জিকে শামীমও সম্রাটকে অবৈধ আয়ের ভাগ দিতেন।

ক্যাসিনো সম্রাট রাজধানীর জুয়াড়িদের কাছে বেশ পরিচিত নাম। সম্রাটের ‘নেশা’ ও ‘পেশা’ জুয়া খেলা। তিনি পেশাদার জুয়াড়ি। প্রতি মাসে অন্তত ১০ দিন সিঙ্গাপুরে যান জুয়া খেলতে। সেখানে টাকার বস্তা নিয়ে যান তিনি। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোয় পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকেও আসেন জুয়াড়িরা। কিন্তু সেখানেও সম্রাট ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। প্রথম সারির জুয়াড়ি হওয়ায় সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনো পর্যন্ত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিলাসবহুল গাড়ি ‘লিমুজিন’যোগে। সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলতে গেলে সম্রাটের নিয়মিত সঙ্গী হন যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমান, সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার, সম্রাটের ভাই বাদল ও জুয়াড়ি খোরশেদ আলম।