• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ০১ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ জিলকদ ১৪৪১

সংসদে তোপের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী : অপসারণ দাবি

সব অভিযোগ অস্বীকার করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

| ঢাকা , বুধবার, ০১ জুলাই ২০২০

image

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারী মোকাবিলায় ‘অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতা’র অভিযোগ তুলে সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেকের অপসারণ দাবি করেছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা। জাহিদ মালেককে এই মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করার দাবিও উঠেছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল একাদশ জাতীয় সংসদের অষ্টম (বাজেট) অধিবেশনে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই তার কঠোর সমালোচনা করেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিগত তিন মাসে মহামারী মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকগুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন। তার দাবি, সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে বলেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চেয়ে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুহার কম।

বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ৩৭ লাখ টাকার পর্দার কথা শুনেছি। ডাক্তারদের ২০ কোটি টাকার খাওয়ার বিল এসেছে। সেখানে একটি কলার দাম ২ হাজার টাকা। একটা ডিমের দাম এক হাজার টাকা। রুটির এক স্লাইসের দাম তিন হাজার টাকা। এ অবস্থা করোনাকালেও। কয়েক দিন আগে দেখেছি কিট কেনার দুর্নীতির কারণে জিম্বাবুয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মানুষ বলছে, আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাকি মিনা কার্টুনে পরিণত হয়েছে। টিয়া পাখি দ্বারা চলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

সুনামগঞ্জে নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের বরাত দিয়ে পীর ফজলুর রহমান বলেন, এই যে আইসিইউ, অক্সিজেন ও চিকিৎসা নেই। গ্রামের বাজারের লোকজন তাকে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়ার কথা তোলার অনুরোধ করেছেন। গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বেগম মতিয়া চৌধুরীর হাতে দেয়ার কথা বলেছেন।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, আমাদের সবই করতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। প্রধানমন্ত্রীকে যদি সব করতে হয় তাহলে মন্ত্রণালয়-অধিদফদর এত রাখার দরকার নেই। তিনি বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। সমন্বয়হীনতার জন্য দেখেছি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, তিনি জানেন না কোথায় কী হচ্ছে। এই সমন্বয়হীনতার জন্য প্যাঁচ খেয়ে গেছে। বেসরকারি হাসপাতালে করোনাভাইরাস চিকিৎসায় খরচের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালগুলো সোনার হরিণ। কাউকেই ভর্তি করে না। কেউ কেউ ভর্তি হলে যদি বেঁচে থাকেন তবে ৩-৪-৫-৭ লাখ টাকা দিতে হয়। ঘুম থেকে জাগলে সকাল, না জাগলে পরকাল। কোন সমন্বয় নেই। এত মন্ত্রণালয় অধিদফতর রেখে লাভ কী? খামোখা পয়সা খরচ করছি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ২৪ ঘণ্টা খবর রাখছেন। কিন্তু আপনার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তো একবার ঢাকা মেডিকেলে, একবার সোহরাওয়ার্দী, একবার জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে কিংবা পিজিতে ভিজিট করা উচিত ছিল। আমি সেখানে এমনিতেই গেছি। ডাক্তাররা বলছেন, এখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এলে আমরা অনুপ্রাণিত হতাম।

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, করোনায় মারা যাবে। সারা পৃথিবীতে যাচ্ছে। কিন্তু কতটুকু চিকিৎসা দিতে পারছি, এটাই বড় প্রশ্ন? দেশে সেই চিকিৎসাটাই নেই।’ বাংলাদেশে সংক্রমণ হার অনেক বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, নমুনা পরীক্ষার ২৩ শতাংশ পজিটিভ আসছে। তাও ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে ১০ থেকে ১৫ দিন পর। এতে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তিনি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বাড়ানোর দাবি জানান।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, বেসরকারি অনেক হাসপাতালে ডাক্তাররা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। বেতন পান ২০ হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লাগাম টানতে না পারলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দাঁড় করানো যাবে না।

সংসদ সদস্যদের সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক তার মন্ত্রণালয়ের নেয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরেন এবং নিজে মাঠে আছেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, অনেক সময় মিডিয়া বলে, আমরা এখন ঘরে বসে আছি। মিডিয়া যদি সব সময় শুধু মৃত্যুর খবর, দুঃসংবাদ দিতে থাকে, তাহলে আমাদের যারা তরুণ জেনারেশন আছে, তারা কিন্তু মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাবে। আমাদের বয়স্করাও অসুস্থ হয়ে যাবে। আমরাও যারা আছি, তারাও অসুস্থ হয়ে যাব। তাই আমাদের একটু পজেটিভলি কথা বলতে হবে।

নিজের ভূমিকার সপক্ষে বলতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পাঁচ মাস কিন্তু আমরাই মাঠে আছি। প্রতিটি হাসপাতাল যে আমরা যাইনি, এ কথাটা সঠিক নয়। বসুন্ধরা কীভাবে বানিয়েছি। ২৫ দিনে বসুন্ধরা আইসোলেশন সেন্টার, হাসপাতাল করা হয়েছে। যেখানে দুই হাজার বেড আছে। যতগুলো কোভিড সেন্টার রয়েছে, সব কটি উদ্বোধন করেছি। ডাক্তার-নার্স আমরা যারা কাজ করি, তাদের অনুপ্রাণিত করলে তারা আরও কাজ ভালো করবে। ৫০ জন ডাক্তার-নার্স মারা গেছেন। সব সময়ই যদি সমালোচনা করি, তাহলে সঠিক হবে না।

সফটওয়্যার ক্রয়ে দুর্নীতি ও ডাক্তারদের থাকা-খাওয়ার জন্য অস্বাভাবিক ব্যয়ের ব্যাখ্যা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সফটওয়্যার ক্রয় হয়নি। এটা প্রাক্কলন। বিশ্বব্যাংকের টাকা। তারাই ক্রয় করবে। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলের যেটা আমি খবর নিলাম। ৫০টি হোটেল ভাড়া নেয়া হয়েছে। ৩ হাজার ৭০০ লোক এক মাস থেকেছেন। হিসাব করে বের করেছি, ১ হাজার ১০০ টাকায় প্রতিটি কক্ষ ভাড়া হয়েছে। খাওয়ার খরচ যেটা বললেন, এটা ঠিক নয়। ৫০০ টাকা তিনটি মিলের জন্য। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার মিলে ৫০০ টাকা। যে হিসাবটি দিলেন, পুরোপুরি ভুল।

করোনায় সাফল্য আছে দাবি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনায় সোয়া লাখ লোক আক্রান্ত হয়েছে। দোকানপাট চালু হয়েছে। জীবন-জীবিকার বিষয় আছে। শিল্পকারখানা চালু হয়েছে। ঈদে আমরা বাড়ি যাই। এ জন্য সংক্রমণের হার একটু বেড়েছে। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা তো কম। আমরা আশা করি, এই সংক্রমণ হারও কমবে, যখন মানুষ বেশি করে মাস্ক পরবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় চলবে এবং মানুষ জানবে যে কিভাবে নিজেকে সুরক্ষিত করা যায়। এই বিষয়গুলো আগে জানত না। এখন জানে।

বর্তমানে সরকারের স্বাস্থ্য খাতে অবদান তুলে ধরে মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ক্যানসার ইনস্টিটিউট, চারটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮টি মেডিকেল কলেজ ও আড়াই শ’ নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করেছে। হাসপাতালে ২৫ হাজার শয্যা বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভ্যাকসিন হিরো হয়েছেন। মাদার অব হিউম্যানিটি, সাউথ সাউথ পুরস্কার পেয়েছেন। সব স্বাস্থ্যের কারণে হয়েছেন। আমাদের এখন গড় আয়ু ৭৩ বছর। আর অল্প দিন হলেই এটা আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলব। তাদের এখন গড় আয়ু ৭৮ বছর। কাজেই এটা স্বাস্থ্যের একটা বড় অবদান।

সবার সহযোগিতা পেলে অল্প দিনের মধ্যেই করোনাভাইরাস থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে দাবি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কোভিড চলে গেলে সাধারণ গতিতে এগিয়ে যাবে দেশ। প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২, যেটা ধরা আছে তা আমরা অর্জন করতে পারব। তবে করোনাভাইরাস যদি না যায়, যদি আমরা সব সময় মৃত্যুর ঝুঁকিতে, ভয়ে থাকি, তাহলে কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকা- ভালো হবে না।

জাহিদ মালেক বলেন, বিশ্বের কোথাও করোনার চিকিৎসা ঠিক মতো নেই। টিকাও আবিষ্কার হয়নি। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের মৃত্যুর হার কম। তবে জীবন-জীবিকার বিষয় আছে। দোকান খুলেছে, ঈদে আমরা বাড়ি যাই। সেই কারণে আমাদের সংক্রমণের হার কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে এই সংক্রমণের হারও কমবে বলে আশা করি।