• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৩ মে ২০২০, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ রমজান ১৪৪১

সংকট কাটলেও স্থায়ী সমাধান হলো কি?

অধিকাংশ ক্রিকেটার দ্বিধান্বিত তবে সমাধানের আশা ছাড়েননি

সংবাদ :
  • বিশেষ প্রতিনিধি

| ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৯

হঠাৎ করেই সব ধরনের ক্রিকেট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। চার দিন ধরে ক্রিকেটার বনাম বিসিবির মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন ছিল মিডিয়ার প্রধান খবর। অচলাবস্থার অবসানে বরাবরের মতোই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ এবং ওডিআই দলের অধিনায়ক তথা সংসদ সদস্য মাশরাফি মর্তুজার মধ্যস্থতার বিষয়টিও ছিল আলোচনায়। চার দিনের সংকট গত বুধবার রাতে কাটলেও এর রেশ সম্ভবত মিলিয়ে যায়নি। গত বুধবার রাতে বিসিবির সঙ্গে ধর্মঘটে যাওয়া টাইগার ক্রিকেটারদের আলোচনার মধ্য দিয়ে বিরোধের আপাত অবসান ঘটেছে। তবে গত বুধবার রাতে বিসিবির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের আক্রমণাত্মক ও উগ্র কথাবার্তায় মন খারাপ করেছেন ক্রিকেটাররা। বিশেষ করে মেহেদি হাসান মিরাজকে দেখেই বিসিবি বস যেভাবে ক্ষ্যাপাটে আচরণ করেছেন, সেটি মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে জাতীয় ক্রিকেটারদের। ফলে সংকট কতটা কাটল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অন্তত বিসিবি বস পাপন যেভাবে প্রথম সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে বুধবার রাতের বৈঠকে ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আক্রমণ করেছেন, এতে সংকট কেটে যাওয়ার পরিবর্তে আরও ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। প্রথম প্রেস কনফারেন্সে তিনি এক ক্রিকেটারের সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে কথা বলেছেন, নিজেকে জাহির করেছেন, তিন ফরম্যাটেই দেশের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তথা ‘মি. ডিপেন্ডেবল’ নামে খ্যাত মুশফিকুর রহিমের পিতাকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, এক ক্রিকেটারের খালাকে নিয়েও কথা বলতে ছাড়েননি। সর্বশেষ সম্মানজনক সমাধানের জন্য বুধবারের বৈঠকে ক্রিকেটাররা যাওয়া মাত্রই পাপনের ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন তরুণ ক্রিকেটার মেহেদি হাসান মিরাজ। সব মিলিয়ে বর্তমান সভাপতির সঙ্গে কতটা সহজভাবে ক্রিকেটাররা

মানিয়ে নিতে পারবেন, এ জন্য আসলে সময়ের অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।

ক্রিকইনফো জানায়, মিরাজকে দেখেই পাপন বলে ওঠেন- ‘মিরাজ, তোমার জন্য আমি কি না করেছি? আর তুমি আমার ফোন ধরো না? আজ থেকে আমি তোমার নাম্বার আমার ফোন থেকে মুছে দেব।’ বিসিবি বসের এমন আগ্রাসী কথার পর নিজের আসনে গুটিশুটি মেরে বসে ভয়ে কাঁপছিলেন মিরাজ।

গত বুধবার রাতের বৈঠকটাকে মঙ্গলবারের প্রেস কনফারেন্সের ধারাবাহিকতা বলেই মনে হয়েছে। পাপন একজন করে ক্রিকেটারকে টার্গেট করে তার কাছ থেকে কোন ক্রিকেটার কোন ধরনের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, এর ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন। একই সঙ্গে বলেছিলেন, এরপরও তোমরা ধর্মঘট ডাকো? ফলে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্মানজনক সমাধানের লক্ষ্যে বুধবার বিসিবির সঙ্গে বৈঠকের জন্য যাওয়া ক্রিকেটারদের দলটা মন খারাপ করেই বেরিয়ে আসে।

নানা কারণেই বৈঠকটা ছিল ব্যতিক্রমী। দেশের প্রায় সবারই নজর ছিল ওই বৈঠকের প্রতি। এই বৈঠকের একটা পক্ষ ছিল ক্রিকেটাররা- যারা তাদের বেতনদানকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের দাবি-দাওয়া পেশ করতে যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তারা- যারা জানতেন, সম্মানজনক সুরাহা না হলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। তবে পাপনের এমন আক্রমণাত্মক কথাবার্তার পর ৪৮ ঘণ্টার আন্দোলনে সরব ক্রিকেটারদের অনেকেরই মুখ বন্ধ হয়ে যায়।

বৈঠক থেকে বের হওয়ার পর ক্রিকেটাররা কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। অনেকটা ভয়ের মধ্যেই তারা আছেন বলে মনে হয়েছে। ক্রিকেটারদের এ রকম চুপসে যাওয়া মানসিক অবস্থা আসন্ন ভারত সফরে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেললেও আশ্চর্যের কিছু হবে না।

এক ক্রিকেটার ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে বলেন, মিরাজের ঘটনাতেই আমরা মুষড়ে পড়ি। মিটিংয়ের শুরু যেভাবে হয়েছে, এতে আমাদের বলার তেমন কিছুই ছিল না। আমাদের দাবিগুলো নিয়ে সাকিব আল হাসান কথা বলেছেন, অন্যদের মধ্যে কথা বলার মানসিকতাই ছিল না। তিনি বলেন, আমাদের সব দাবি মেনে নেয়ার কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিস্তারিতভাবে কিছু বলা হয়নি। এটা বিভ্রান্তিকর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- আমরা জানতে চেয়েছিলাম জাতীয় ক্রিকেট লীগে ম্যাচ ফি কতটা বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে পরিষ্কার কোন জবাব আমরা পাইনি।

পরে অবশ্য এক প্রেস কনফারেন্সে নাজমুল হাসান পাপন কিছুটা উত্তেজিত থাকার বিষয় স্বীকার করে প্রতিটি দাবির বিষয়ে বিসিবির অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।

ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনের ব্যাপারে বিসিবি কোন ব্যাখ্যা না দিলেও শীঘ্রই নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সম্মত থাকার কথা বলেছেন অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি নাইমুর রহমান দুর্জয়।

ক্রিকেটাররা জানান, ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনে তারা বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে প্রতিনিধি মনোনয়নের দাবি জানিয়েছেন- যাতে বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত নিজেদের বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলা যায়।

ক্রিকেটারদের বিভিন্ন দাবির মধ্যে কোয়াবে প্রতিনিধি থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বিসিবি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কেউ নির্বাচিত হলে তাকে যথাযথ সম্মান দেয়া হবে।

ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে খেলোয়াড়দের দলবদলের ব্যাপারে মুক্তবাজার পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত দাবির ব্যাপারে নাজমুল হাসান প্রশ্ন রেখে বলেন, ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের টাকা পরিশোধ না করলে তখন কী হবে। ক্রিকেটাররা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, বিষয়টির নিষ্পত্তির দায়িত্ব তাদেরই (ক্রিকেটারদের) ।

এরপর প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফি বৃদ্ধিসহ তাদের দৈনিক ভাতা ও যাতায়াত ভাতা নিয়ে লম্বা আলোচনা হয়। ঘরোয়া আসরে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ শরীফ, শাহরিয়ার নাফিস, নাবিল সামাদ ও এনামুল হক জুনিয়র কথা বলেন। তবে আলোচনার ফল সম্পর্কে তারা সুনিশ্চিত কোন সিদ্ধান্ত পাননি। বর্তমান ফি খেলোয়াড়দের জন্য মনঃপূত নয়। পাপন অবশ্য আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই এ বিষয়টা ঠিকঠাক করা হবে বলে জানিয়েছেন।

ক্রিকেট সেন্টারের অবকাঠামো তৈরির কাজ এক সঙ্গে শুরু সংক্রান্ত ক্রিকেটারদের দাবিতেও একমত হয়েছেন পাপন। তবে প্রাথমিকভাবে একের পর এক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল বিসিবির।

ঘরোয়া মৌসুমে অতিরিক্ত একটা ওডিআই এবং টি-২০ টুর্নামেন্ট আয়োজনের ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। চলতি মৌসুমের শেষ দিকে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চালানোর কথা বলেছে বিসিবি।

অধিকাংশ ক্রিকেটারই দ্বিধান্বিতভাবে ও অসন্তোষ নিয়ে বৈঠক ছাড়লেও কেউ কেউ আশা ছাড়েননি। একজন ক্রিকেটার বলেন, আমাদের সবার একত্র হওয়াটা বিসিবিকে ভালোভাবেই নাড়া দিয়েছে। আমার মনে হয়, তারা (বিসিবি) ভাবতেই পারেনি, ধর্মঘটের তৃতীয় দিনে আরও ক্রিকেটার আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। তারা হয়তো মনে করেছিলেন, মাত্র গুটিকয়েক ক্রিকেটারই আছেন এই আন্দোলনে। কাজেই নিজেদের দাবি আদায় নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত আমাদের দৃঢ় ঐক্যের প্রয়োজন।

খেলোয়াড়রা মনে করেন, নিজেদের আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার জন্য বিষয়টির ওপর নজর রাখতে হবে- যাতে বিসিবির সঙ্গে দেনদরবার চালানো যায়। দ্রুত কোয়াবের নির্বাচন এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। কেননা কেবল এটাই তাদের প্রতি বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেয়ার জন্য মজবুত ভিত্তি দেবে।

খেলোয়াড়রা বিশ্বাস করেন, ব্যক্তিগত আক্রমণের পরও বাংলাদেশের ক্রিকেট একটা নতুন দিক নির্দেশনা পেল। অন্তত শুরুটা করা গেছে। তবে খেলোয়াড়দের অবশ্যই উচিত হবে নিজেদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নজর রাখা।