• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

টাঙ্গাইল

শিশুসহ অন্তঃসত্ত্বা মাকে জবাই করে হত্যা

সংবাদ :
  • জেলা বার্তা পরিবেশক, টাঙ্গাইল

| ঢাকা , সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯

অনাগত ছেলেসন্তান নিয়ে অনেক স্বপ্ন বুনছিলেন পিতা আলামিন। চার বছরের শিশু মেয়ের পর ছেলে আসছে পৃথিবীতে। এ কারণে আনন্দে পুরো পরিবার ছিল আত্মহারা। স্ত্রীর যতœ নিচ্ছিলেন ভালোভাবে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পৃথিবীতে সন্তানের আলো দেখার দিনও নির্ধারণ করেছিলেন ডাক্তার। আনন্দে আত্মহারা বাবা তার ছেলের জন্য বেশকিছু খেলনাও কিনে রেখেছিলেন। কিন্তু সব স্বপ্ন যেন নিমেষেই বিষাদে পরিণত হলো। স্বপ্নেও ভাবেননি তার জীবনে এমন কিছু অপেক্ষা করছে। মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। দুর্বৃত্তরা তার সাড়ে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী লাকী আক্তার ও চার বছরের শিশু মেয়ে হোমাইরা আক্তার আলিফাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে এবং জবাই করে হত্যা করেছে। তারা অনাগত পেটের সন্তানকেও পৈশাচিকভাবে কুপিয়েছে। শনিবার রাত ১২টার দিকে টাঙ্গাইল পৌর শহরের ভাল্লুককান্দি এলাকায় এই নৃশংস ঘটনা ঘটেছে।

রাতেই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। হত্যার পর দুর্বৃত্তরা বাড়িতে রাখা বিকাশের ৮ লাখ টাকাও নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন নিহতের স্বামী আলামিন। এদিকে রোববার দুপুরে নিহত লাকী আক্তারের পিতা হাসমত বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর মডেল থানায় অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

নিহতের স্বামী আলামিন জানান, তিনি বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির ফ্লেক্সিলোড ও বিকাশের ব্যবসা করেন। ভাল্লুককান্দি এয়ারপোর্ট রোডে আসাদ মার্কেটে তার দোকান। দোকান থেকে তার বাসায় যেতে হেঁটে প্রায় পাঁচ মিনিট সময় লাগে। বাসার একশ’ গজের মধ্যে কোন বাড়ি নেই। শুধু আলামিনের একটিই বাড়ি। বাড়িতে শুধু আলামিনের স্ত্রী ও মেয়ে আলিফা থাকত। একটি টিনের ঘর ও ছোট্ট একটি রান্নাঘর। বাড়ির সামনে ডোবা। ছোট্ট একটি রাস্তা দিয়ে ওই বাড়িতে যেতে হয়। রাস্তাটি অন্ধকার থাকার কারণে প্রতি রাতে দোকান বন্ধ করে আলামিন তার স্ত্রীকে মোবাইল পোনে কল দিয়ে বলতেন। তারপর স্ত্রী লাইট নিয়ে এগিয়ে আসতেন। প্রতিদিনের মতো শনিবার রাত ১২টার দিকে দোকান বন্ধ করে আলামিন তার স্ত্রীকে ফোন দেন। কিন্তু ১০-১২ বার ফোন দিলেও স্ত্রী ফোন ধরেননি। হয়তো ব্যস্ত রয়েছেনÑ এমন চিন্তায় তিনি বাড়িতে চলে আসেন। এসে দেখেন বাড়ির মূল গেট খোলা। ঢুকেই উঠানে দেখেন তার স্ত্রী ও কন্যার বীভৎস লাশ পড়ে রয়েছে। দেখেই তিনি চিৎকার করেন। পরে আশপাশের লোক এসে ভিড় করে।

রোববার সকালে আলামিনের বাড়িতে দেখা গেছে, ঘরে তালা দেয়া। বাড়ির উঠানে যেখানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ রয়েছে। কিছু দূরেই নিহত লাকীর মামা ফেরদৌস হিরার বাড়ি। ওই বাড়িতে দেখা গেছে, সেখানে আলামিন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই চিৎকার করে উঠছেন। অনাগত সন্তানসহ যারা তার স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করেছে, তাদের খুঁজে বের করে বারবার ফাঁসির দাবি জানান।

নিহতের চাচাশ^শুর রওশন আলী বলেন, তার ভাতিজা আলামিন প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ফ্লেক্সিলোড ও বিকাশের ব্যবসা করেন। প্রায় দুই বছর আগে এখানে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। তার স্ত্রী খুবই ভালো ছিল। কী কারণে এই ধরনের নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটল! তিনি এই হত্যাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করার দাবি জানান।

নিহত লাকীর মামা ফেরদৌস হিরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, পরিচিত লোকজনই এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে। বাড়িতে টাকা রয়েছে যারা জানত, তারাই এ কাজ করেছে। আমার ভাগ্নি অত্যন্ত ভালো ছিল। আলামিনের সঙ্গে আমিই বিয়ে দিয়েছিলাম। পেটের সন্তানসহ তিনজনকে এভাবে হত্যার শিকার হতে হবে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। তিনি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল সদর মডেল থানার ওসি মীর মোশাররফ হোসেন জানান, রাতে কে বা কারা তাদের বাড়িতে ঢুকে মা ও মেয়েকে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে। পরে রোববার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুলিশ হত্যাকারীদের খুঁজতে মাঠে নেমেছে। আমরা পারিবারিক পুর্বশত্রুতা, ব্যবসায়িক সমস্যা অথবা অন্য কোন কারণে এই হত্যাকা- ঘটেছে কি না, সবকিছু মাথায় নিয়েই তদন্ত করছি।

এদিকে হত্যাকা-ের খবর পেয়ে রোববার সকালে পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, নৃশংস ও বর্বর এই হত্যাকা-ের প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ, পিবিআই ও সদর থানা পুলিশের সব ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে সব আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই এই হত্যাকা-ের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হব।