• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ১৭ জিলহজ ১৪৪১, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ

শিশু হত্যা ধর্ষণ ও অত্যাচার থামছেই না

শিশুদের অধিকার নিয়ে পৃথক শিশু অধিদফতর গঠনের সুপারিশ

সংবাদ :
  • মোস্তাফিজুর রহমান

| ঢাকা , সোমবার, ০৭ অক্টোবর ২০১৯

শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও গৃহকর্মী শিশুর ওপর অত্যাচার বেড়েই চলছে। বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেছে। গত বছর ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিপরীতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৪৯৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এ হিসেবে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৪১ শতাংশহারে। এছাড়া এবছর প্রথম ছয় মাসে ১২০জন শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৫৩ জন শিশু। শিশু অধিকার বিষয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন বা এনজিওসমূহের জাতীয় নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে। সেভ দ্যা চিলড্রেন বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৫৪৯ জন শিশু ধর্ষণের শিকারের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৫ জন শিশুকে।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু ধর্ষণের ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণ মূলত নির্যাতন করার পরও আইনের আওতায় অপরাধীরা না আসা। এতে একের পর এক শিশু ধর্ষণের মত পৈশাচিক ঘটনা ঘটছে। আইন থাকলেও তা উপেক্ষিত হচ্ছে। আইনের ধীরগতির কারণেও দেখা যায়, যে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, অপরাধীরা জামিন নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এছাড়া মামলা হলে যে চার্জশিট দেয়া হয় তাতে আইনের ফাঁক-ফোকর থাকে। আবার আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া আরও সংকটে উপনীত হয়। কখনও কখনও প্রভাবশালীদেও চাপে নির্যাতিতরা সমঝোতায় যেতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা যখন ঘটে তখন শিশুর অভিভাবকরা সম্মান হারানোর ভয়ে এবং প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে মামলা করে না। কোন কোন ক্ষেত্রে দরিদ্র অভিভাবকের পক্ষে দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে নেয়াও সম্ভব হয় না। সামগ্রিক কারণে সমাজে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে কোন উন্নয়নই টেকসই হবে না। তাই শিশু অধিকার সুরক্ষা প্রচলিত আইনসমূহের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শিশু অধিকার সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং তাদের মানুসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। এছাড়া সংসদে শিশুশ্রম নিরসনের জন্য পৃথক একটি ককাস গঠন, সব শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে আলাদা একটি শিশু অধিদফতর গঠনের সুপারিশ করেছে শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ)।

বাংলাদেশের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের তথ্যানুসারে ২০১৫ সালে পথশিশুর সংখ্যা ছিল ১.৫ মিলিয়ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১৩ অনুযায়ী ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ৩.৪৫ মিলিয়ন। এরমধ্যে ২.১০ মিলিয়ন ছেলে শিশু আর ১.৩৫ মিলিয়ন মেয়ে শিশু। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১.২৮ মিলিয়ন। বিভিন্ন গবেষণার প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে মোট গৃহকর্মীর সংখ্যা ২ মিলিয়নের মধ্যে ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু গৃহকাজে জড়িত যার ৮৩ শতাংশই কন্যা শিশু। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, গত ১০ বছরে শিশুশ্রম অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও ঝুঁকিপূর্ণকাজে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। এখনও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বিপুল পরিমাণ শিশু কর্মে নিয়োজিত রয়েছে।

শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদ বলেন, সরকার শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজের তালিকা তৈরি করলেও গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুশ্রম এর চেয়েও বেশি অনিরাপদ। কেননা অন্য সব ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশুদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলেও গৃহকর্মে চার দেয়ালের ভিতরে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হলে পারতপক্ষে কারও পক্ষেই তা জানা সম্ভব হয় না। বিএসএএফ এর গবেষণা ফলাফল তুলে ধরে তিনি বলেন, শিশু গৃহ শ্রমিকরা গড়ে প্রতিদিন ১৭ ঘণ্টা কাজ করে, যা যেকোন আইনেই নিষিদ্ধ। তাদের কোন সাপ্তাহিক ছুটি বা ওভারটাইম নেই আবার নিজ পরিবার থেকেও এরা বিচ্ছিন্ন। সেই সঙ্গে এই গোষ্ঠীটি যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে সবচাইতে বেশি। তাই গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুশ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে আবদুছ সহিদ মাহমুদ বলেন, শিশুশ্রম নিরসনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সবার সার্বিক প্রচেষ্টা। শুধুমাত্র সরকারের একক উদ্যোগে এই বিপুল পরিমাণ কর্মে নিয়োজিত শিশুদেরকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারণ শিশুশ্রম নির্মূলের কাজ করতে হয় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে। যা এনজিও দ্বারা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। সেখানে কিছু ভুল, উদাসিনতা আর সঠিক জবাবদিহিতা না থাকলে সরকারের এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। বিগত বছরগুলোতে শিশুদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা তুলে ধরে শিশু অধিকার ফোরামের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মাহবুবুল হক বলেন, শিশুশ্রমসহ সব শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য আলাদা একটি শিশু অধিদফতর গঠন করা জরুরি। এছাড়া সরকার গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে তা আইনে পরিণত করা দরকার।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মো. মুজিবুল হক বলেন, সুবিধাবঞ্চিত গৃহ শিশু কর্মীদের অধিকার নিয়ে আমরা এখন নিয়মিত আলোচনা সভা করছি এটাকে এক প্রকার অগ্রগতি মনে করতে হবে। কেননা গৃহশিশু কর্মী গোষ্ঠীটির অধিকার নিয়ে অতীতে তেমন কোন সচেতনতাই ছিল না সবার মধ্যে। এদের অধিকার সুরক্ষার জন্য সবার মধ্যেই মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। এদের অধিকার নিশ্চিত করতে এবং গৃহ শিশুকর্মী কমাতে হলে সরকার এবং এনজিওগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে, কেননা আইন প্রণয়ন করে রাতারাতি এটা কমানো সম্ভব না। অন্য এক অনুষ্ঠানে শিশু অধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাসের চেয়ারপারসন ও সংসদ সদস্য সামছুল হক টুকু বলেন, শিশুদের রক্ষা করা এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব, আমরা আমাদের নিজেদের শিশুদের কল্যাণে যেমন দায়িত্ববোধ অনুভব করি, সেই রকম অন্যের শিশুর ক্ষেত্রেও আমাদের তা উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের এই মুহূর্তে নিকৃষ্ট ধরনের শিশুশ্রমগুলোকে চিহ্নিত করে তা অগ্রাধিকারভিত্তিতে নির্মূলের কাজ করতে হবে। সেই জন্য শুধু সরকারকে একাই কাজ করলে হবে না,সব ধরনের স্টেকহোল্ডারকে সম্মিলিতভাবে এই দায়িত্ব নিতে হবে।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ‘বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ-২০১৯’। এবার প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘আজকের শিশু আনবে আলো, বিশ্বটাকে রাখবে ভালো।’ দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি (৭-১৪ অক্টোবর) সপ্তাহব্যাপী ঢাকায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এছাড়াও শিশু অধিকার বিষয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ উপলক্ষে জাতীয় পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে বলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

এ উপলক্ষে গতকাল সকালে জাতীয় প্রেক্লাবে বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ উপলক্ষে অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি) ও বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ‘শিশু অধিকার ও বর্তমান পরিস্থিতি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করে। এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এএসডির ডিসিএইচআর প্রজেক্টের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইউকেএম ফারহানা সুলতানা। এছাড়া এএসডি নির্বাহী পরিচালক জামিল এইচ চৌধুরী ও বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদ, এএসডি’র মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন ম্যানেজার লুৎফুন নাহার কান্তা বক্তব্য দেন। এ সময় দেশের প্রত্যেকটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান বক্তারা।

কর্মসূচি : আগামী ৯ অক্টোবর সকাল ১০টায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ ২০১৯-এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ প্রথম দিনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শিশু একাডেমি পর্যন্ত শিশুদের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া আগামী ১০ অক্টোবর বেলা ১১টায় শিশু একাডেমি মিলনায়তনে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম আয়োজন করেছে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এদিন দুপুর ১২টায় ‘শিশুর প্রারম্ভিক যতœ, বিকাশ ও সুরক্ষা বিষয়ক’ এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১১ অক্টোবর সকাল ৯টায় রয়েছে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনার থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পর্যন্ত শোভাযাত্রা। ১২ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল খেলার মাঠে পথ শিশুদের নিয়ে রয়েছে সমাবেশ ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। ১৩ অক্টোবর সকাল ১০টায় ব্র্যাকের আয়োজনে আছে শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাল্যবিয়ে নিরোধ দিবস উপলক্ষে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টায় শিশু একাডেমি মিলনায়তনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। এ উপলক্ষে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে র‌্যালি, শিশু সমাবেশ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৩টায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে শিশুদের নিয়ে ‘আমার কথা শোন’ শিরোনামে অনুষ্ঠান হবে। যেখানে শিশুরা বলবে বড়রা শুনবে। শিশু একাডেমিতে বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ-২০১৯ উপলক্ষে শিশু বান্ধব নগর, খেলনা মেলা, যাদু প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠিত হবে।