• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১ মহররম ১৪৪২, ০৩ আশ্বিন ১৪২৭

খোলা হয়েছে গার্মেন্ট কারখানা

শপিংমল খোলার সিদ্ধান্তে জনমনে ভীতি ও শঙ্কা

সিদ্ধান্তটি আত্মঘাতী ও জনস্বার্থবিরোধী 

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০

image

চলমান লবডাউনে রাজধানীর গতকালের একটি সড়ক চিত্র -সংবাদ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের মধ্যেই পোশাক কারখানা চালু করা, শপিংমল ও দোকানপাট খুলে দেয়া এবং ধর্মীয় উপাসনালয় উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তে জনমনে ভীতির সঞ্চার হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্তের ফলে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও যে বাড়বে, এটা ধরেই নিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। মন্ত্রীও স্বীকার করছেন, শপিংমল খুললে করোনার সংক্রমণ বাড়বে। গার্মেন্টস খুলে দেয়ায় ইতোমধ্যে ১৭ জন গার্মেন্ট কর্র্মীর করোনা শনাক্ত হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে, তোলপাড় চলছে।

শপিংমল খুলে দেয়ার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নিজেই স্বীকার করেছেন, শপিংমল ও দোকানপাট খুলে দেয়ার কারণে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরদিনই দেশব্যাপী মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে সরকারের সাধারণ ছুটি বা লকডাউন যেমন অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে; তেমনি সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার সরকারি নির্দেশনাও ব্যাপকহারে অগ্রাহ্য হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শপিংমল ও দোকানপাট খোলার প্রবল বিরোধিতা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, শপিংমলগুলো খুললেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেকে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

দোকানপাট খুলে দেয়ার সরকারের এ সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘করোনা সংক্রমণের কাছাকাছি সময়ে যেসব দেশে সংক্রমণ ঘটছে সেসব দেশে এখনও মার্কেট, শপিংমল ঢালাওভাবে খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। তাহলে আমরা কেন ভয়ঙ্কর সিন্ধান্ত নিয়েছি? কাদের প্ররোচনায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে?’

ফেসবুকে অনেকে প্রশ্ন করছেন, ‘করোনা সংক্রমণ রোধে গণপরিবহন বন্ধ রেখে কোন যুক্তিতে শপিংমলগুলো খুলে দেয়া হচ্ছে? গণপরিবহন যদি বন্ধই থাকে তাহলে দোকানি, দোকানকর্মী বা ক্রেতারাই শপিংমল বা বাজারে যাবেন কিভাবে? মূলত এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর প্ররোচনায় শপিংমলগুলো খুলে দিয়ে লোকজনকে কার্যত ঘর থেকে বেরিয়ে কেনাকাটা করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে; মানুষের মৃত্যু ঘটবে, সেটা কী কেউ ভাবছে? তাছাড়া মার্কেট, শপিংমল খুলে দিলেই কি ক্রেতারা যাবে? এতদিন ঘরে অবস্থান করে সচেতনতা অবলম্বনের পর হঠাৎ ক্রেতারা কেন নিজেদের ঝুঁকিতে ফেলবে?’ কাদের পরামর্শে বা কাদের স্বার্থে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেটা সবারই প্রশ্ন।

দেশের শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাটে কেনাকাটার যে প্রক্রিয়া তাতেও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। কারণ কাপড় বিশেষ করে জামা, শার্ট ও পাঞ্জাবি, কসমেটিকস, জুতা এগুলো ক্রেতারা অনেকে স্পর্শ করবে। সেগুলো প্রতিনিয়ত জীবণুমুক্ত করা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে দেশে করোনার সংক্রমণ ব্যাপক রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক সংবাদ অফিসে টেলিফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘সরকার কার নির্দেশে মার্কেটগুলো খুলে দিচ্ছেন, তা বোধগম্য নয়। এখন মসজিদও খোলার নির্দেশ দিয়েছেন! তাহলে সরকার কী জেনে-বুঝেই মানুষকে করোনা সংক্রমণের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন? নাকি গুটিকয়েক শপিংমলের মালিকের স্বার্থে সাধারণ মানুষকে মৃত্যু ও ঝুঁকির মুখে ফেলছেন?’

দৈনিক সংবাদ অফিসে টেলিফোন করে উত্তরাঞ্চলে কর্মরত একজন চিকিৎসক ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করছি। দু’মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছি না। এরপরও করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না; অবনতিই ঘটছে। আর এই অবস্থায় কাদের পরামর্শে প্রশাসন শপিংমল, দোকানপাট ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান খুলে দিচ্ছে। এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সবাইকে মৃত্যুঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে না? সবকিছু যদি উন্মুক্ত করেই দেয়া হয়, তাহলে চিকিৎসক ও পুলিশকে করোনা ঠেকাতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হলো কেন?’

ঢাকার উত্তরার ব্যবসায়ী সৈয়দা ফারজানা আফরোজ সোমা ফেসবুকে ‘বিদ্রুপ’ করে লিখেছেন, ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা শপিংমলে যাই, ঈদের জামা গায়ে দিয়ে হাসপাতালে যাই’।

শামিম হাসান নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মসজিদ খোলা মন্দির খোলা, আরও খোলা শপিং মল, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে ছুটছে, লাখো লাখো শ্রমিক দল, এসেছে করোনাভাইরাস, মরছে মানুষ লাখে লাখ, বাংগালি করছে বড়াই, আমরা করোনারে ন ডরাই।’

শর্তসাপেক্ষে আজ থেকে দেশের সব মসজিদ খুলে দেয়া হচ্ছে। জোহরের নামাজের পর থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে মসজিদগুলোতে জামাতে নামাজ ও তারাবি পড়া যাবে। তবে সামাজিক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ আদায় করতে হবে বলে গতকাল সাংবাদিকদের জানান ধর্ম সচিব নুরুল ইসলাম। স্বাস্থ্যবিধি মেনে তিন ফুট দূরত্ব নিশ্চিতসহ ১২ দফা শর্তসাপেক্ষে আজ থেকে দেশের সব মসজিদ সর্বসাধারণের জামাতে নামাজ আদায়ের অনুমতি দিয়েছে সরকার।

‘লকডাউন’র মধ্যেই গত ২৬ এপ্রিল থেকে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা খোলা হয়েছে। আগামী ১০ মে থেকে হাটবাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট ও শপিং মলগুলো শর্তসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে খোলা হবে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।

পোশাক কারখানা খুলে দেয়ার পর থেকেই দেশে ‘লকডাউন’ কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়। ৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায় ১৭ জন কর্মীর করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে রীতিমত যানবাহনের ভিড় দেখা গেছে। গণপরিবহন বিশেষ করে রিকশার স্বাভাবিক চলাচল দেখা গেছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের চলাচলও দিনদিন বাড়ছে। ‘লকডাউন’ নামেমাত্র কার্যকর থাকলেও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ন্যূনতম লক্ষণ দেয়া যাচ্ছে না মানুষের মধ্যে। অথচ দিন দিন করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে।

এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষায় করোনা সংক্রমণ উপেক্ষা করে দোকানপাট ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া হলেও দেশের আরেক শ্রেণীর ব্যবসায়ী ঠিকই বুঝতে পারছে সামনে ‘খারাপ ও ভয়ানক’ পরিস্থিতি আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের আগে কেনাকাটার জন্য শপিং মল খুলে দিলে ভিড় বাড়বে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ন্যূনতম পরিবেশও বজায় থাকবে না। আর কেনাকাটার এই ভিড় থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।

তবুও খুলছে না অনেক মার্কেট : শপিংমল বা বিপণীবিতান থেকে করোনা সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় বসুন্ধরা সিটি শপিংমল না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা আবু তৈয়ব জানান, মানবতার কথা চিন্তা করেই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। শপিংমল না খোলা তার আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে যমুনা ফিউচার পার্কও না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (মার্কেটিং, সেলস অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ আলমগীর আলম বলেন, ‘যমুনা ফিউচার পার্ক খুললেই ঘরবন্দী হাজার হাজার মানুষ এই শপিংমলে ছুটে আসত। সে ক্ষেত্রে শত শত মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ ঝুঁকি থাকত। যেহেতু যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে দেশ আগে, জীবন আগে, ব্যবসা পরে। তাই তিনি যমুনা ফিউচার পার্ক শপিংমল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এছাড়াও নিউ মার্কেট, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটসহ রাজধানীর আরো কয়েকটি মার্কেট ও বিপনি বিতান না খোলার সিন্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। দেশে করোনায় প্রথম রোগীর মৃত্যু হয় গত ১৮ মার্চ। এর পর করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। গতকাল পর্যন্ত দেশে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৭১৯ জন। মারা গেছে ১৮৬ জন।