• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৯ রবিউস সানি ১৪৪১

লাইফ সাপোর্টে দগ্ধ ছাত্রী : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সিঙ্গাপুর পাঠানো হচ্ছে

লাইফ সাপোর্টের আগে জবানবন্দি নেয়া হয়

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ এপ্রিল ২০১৯

image

অধ্যক্ষের অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জীবন্ত দগ্ধ ফেনীর সোনাগাজী দাখিল মাদ্রাসার ছাত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর গতকাল দুপুর থেকে লাইফ সাপোর্টে থাকা দগ্ধ ছাত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে গতকাল বেলা সাড়ে ১২টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের দোতলায় আইসিউতে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয় দগ্ধ ছাত্রীকে। এর আগে যন্ত্রণাকাতর দগ্ধ ছাত্রী দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে কিভাবে তাকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় সেই ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনায় জবানবন্দি দিয়েছেন চিকিৎসকের কাছে। এদিকে এ ঘটনায় দগ্ধ ছাত্রীর বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান গতকাল বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেছে। মামলায় ঘটনার বর্ণনায় অধ্যক্ষের কুকর্মের প্রধান সহযোগী নুরউদ্দিন, জাবেদ, শাহদাত হোসেন শামিম এবং মহিউদ্দিন শাকিল নামে ৪ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পুলিশ গতকাল পর্যন্ত ওই ছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারেনি। ঘটনার পর মাদ্রাসা অধ্যক্ষের অপকর্মের সহযোগী মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষক শাহে আলমসহ দুজনকে আটক করা হলেও ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

বার্ন ইউনিটের দগ্ধ ছাত্রীর বাবা মাওলানা আবুল কাশেম মো. মুসা জানান, তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তার মেয়েকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে মেয়ের উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন তারা। এর আগে গতকাল বেলা সাড়ে ১২টায় তার মেয়েকে লাইফ সাপোর্টে নেয় চিকিৎসকরা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তাকে সুস্থ করার জন্য। এ পর্যন্ত তারা যে চিকিৎসা দিয়েছেন এর চেয়ে বেশি চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই।

ছাত্রীর ছোট ভাই রায়হান তার বোনকে কিভাবে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলে তার বর্ণনা দিয়েছেন। ঘটনার দিনও কিভাবে তাকে ডেকে নিয়ে আগুন দেয়া হয়েছে তা জানিয়েছেন তার বোন। বোনের সেই বক্তব্য তারা রেকর্ড করে রেখেছেন। গতকালও একই কথা বলেছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল সকালের দিকে দগ্ধ ছাত্রীর অবস্থা আগের চেয়ে সংকটাপন্ন হয়ে উঠে। এরপর বেলা সাড়ে ১২টায় বার্ন ইউনিটের দোতলায় আইসিউইতে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয় তাকে। তার অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টে রাখা হবে। আগের দিন পাইপের মাধ্যমে দগ্ধ ছাত্রীকে খাবার দেয়া হলেও গতকাল থেকে খাবার বন্ধ রাখা হয়েছে। মেয়ের জন্য আইসিইউ’র সামনে অপেক্ষায় রয়েছেন বাবা মাওলানা আবুল কাশেম মো. মুসা। তিনি বারবার মেয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চাচ্ছেন। বড় ভাই মাহমুদুল হাসান এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছেন। আইসিইউ’র বাইরে আছে মা শিরিন আক্তর। ছোট ভাই রায়হান, চাচাসহ আত্মীয়রা নির্বাক হয়ে বসে আছেন বার্ন ইউনিটের বারান্দায়। কিছুক্ষণ পরপর মেয়ের অবস্থার কথা জানতে ছুটে যান আইসিইউ’র দরজায়। কারও খাওয়া ঘুম নেই গত ৩ দিন ধরে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামনে দিনরাত নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছেন স্বজনরা। অপেক্ষায় আছেন তাদের প্রিয় মুখ সুস্থ হয়ে উঠবে কখন।

ঘটনার পর ও লাইফ সাপোর্টে নেয়ার আগে যা বলেছিল দগ্ধ ছাত্রী : অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী গতকাল লাইফ সাপোর্টে নেয়ার আগে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। গত শনিবার দগ্ধ হওয়ার পর তাকে ঢাকায় আনার সময়ও তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ওই বক্তব্য তার স্বজনরা রেকর্ড করে রেখেছিল।

দগ্ধ ছাত্রী বলেন, কেন্দ্রে ঢোকার পর একটা বোরখা পরিহিত মেয়ে এসে তাকে বলে তোমার বান্ধবি নিশাদকে ছাদে কারা যেন মারধর করছে। নিশাদকে মারধরের খবর শুনে তিনি সাইক্লোন শেল্টার যা মাদ্রাসার ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেখানে যান। ছাদে গিয়ে তিনি বোরখা পরিহিত ৪ জনকে দেখতে পান। তাদের মুখ হিজাব করা ছিল এবং হাত মোজা পরিহিত ছিল। তাদের মধ্যে দুজন নারীকণ্ঠে তার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই দুজনের কথায় নারী মনে হলেও অন্য দুজন কথা বলেনি। যে দুজন নারী কণ্ঠে কথা বলেছেন তারা বলেছেন মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে হবে। সেখানে বলতে হবে ঘটনা মিথ্যে ছিল। ওই ৪ জন তার কাছ থেকে জোরপূর্বক মামলা প্রত্যাহারের স্বাক্ষর নিতে চায়। তারা আমার বক্তব্য রেকর্ডিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এক পর্যায়ে আমি বলি আমার জীবন চলে গেলেও মামলা প্রত্যাহার হবে না। অনেক মেয়ের সঙ্গে অধ্যক্ষ অন্যায় কাজ করেছে। এর প্রতিবাদ হওয়া দরকার। আমি এর প্রতিবাদ করব। আমার শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত এর প্রতিবাদ করব। এরপর দুজন শক্ত করে তার হাত ধরে ফেলে। ওড়না দিয়ে তার দুহাত বেঁধে ফেলা হয়। চারজনের মধ্যে দুজন যেভাবে শক্ত করে ধরেছে তাতে মনে হয়েছে দুজন পুরুষও ছিল দুই নারীর সঙ্গে। এরপর তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে তার শরীর জ্বলে উঠলে তিনি চিৎকার করে দোতলায় নেমে আসেন।

থানায় মামলা হলেও আসামি গ্রেফতার হয়নি : এদিকে শ্লীলতাহানির মামলা করার জেরে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে গতকাল ফেনীর সোনাগাজী থানায় মামলা করেছে দগ্ধ ছাত্রীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। মামলায় তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলায় করায় অধ্যক্ষের অনুসারী এবং মাদ্রাসার ছাত্র নুরউদ্দিন, জাবেদ, শাহাদাত হোসেন শামিম এবং মহিউদ্দিন শাকিলের নাম উল্লেখ করে বলেছেন, তারা দগ্ধ ছাত্রী ও তার পরিবারকে মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দিত। অধ্যক্ষের নির্দেশনায় উল্লেখিত আসামিরা এ নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ গতকাল পর্যন্ত ওই ৪ জনের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এদিকে ঘটনার পর পুলিশ দুজনকে আটক করলেও ছাত্রীকে ডেকে নেয়া পিয়ন নুরুল আমিন, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের অপকর্মের মূল সাক্ষী মোস্তফাকেও গ্রেফতার করতে পারেনি। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ঘটনার পর থেকে আসামিদের বাঁচাতে ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে একটি মহল নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। এলাকার একজন কাউন্সিলর, স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মাদ্রাসা অধ্যক্ষকে রক্ষায় বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছেন।

সিঙ্গাপুরে নেয়া হচ্ছে দগ্ধ ছাত্রীকে : অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ওই ছাত্রীকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া এই নির্দেশের কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী দগ্ধ ছাত্রীর সর্বশেষ স্বাস্থ্যবিষয়ক কাগজপত্র সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিপ্লব বড়ুয়াকে পাশে রেখে হাসপাতাল থেকে ফোনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন। এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দগ্ধ ছাত্রীকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ওই ছাত্রীর স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। পরে বিপ্লব বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি ছাত্রীটিকে দেখতে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী ছাত্রীটিকে সিঙ্গাপুর পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর সব খরচ বহন করবে সরকার।