• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

ভারতের নির্বাচন

রামমন্দির নির্মাণসহ ৭৫ প্রতিশ্রুতির ইশতেহার বিজেপির

সংবাদ :
  • সংবাদ ডেস্ক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ এপ্রিল ২০১৯

image

আগামী বৃহস্পতিবার থেকে ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট গ্রহণের দু’দিনের মাথায় গতকাল ‘সংকল্পপত্র’ হিসেবে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি)। এতে অযোধ্যায় বিতর্কিত স্থানে সুবিধামতো রামমন্দির নির্মাণ, শবরীমালা ও তিন তালাকের মতো দেশটির চলমান রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর যেমন উল্লেখ রয়েছে তেমনই মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশ কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতির কথাও বলা রয়েছে। এর পাশাপাশি দেশটির মুসলিম অধ্যুষিত জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দাদের বিশেষ অধিকার দেয়া কয়েক দশকের পুরনো একটি আইনও বাতিল করার অঙ্গীকার করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। তবে এ ইশতেহার প্রকাশের পর দেশটির প্রধান বিরোধীদল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস একে ‘অমূলক’ বলে উল্লেখ করেছে। গতকাল দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, এটি সংকল্পপত্র নয় বিজেপির উচিত ক্ষমাপত্র হিসেবে প্রকাশ করা।

এবারের লোকসভা নির্বাচনের দেশটির প্রধান দুই দলের পক্ষ থেকে প্রভাবশালী নেতা নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদির পুঁজি যদি হয় ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’ তাহলে রাহুল গান্ধীর লক্ষ্য থাকছে জনগণের জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের দিকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বনাম কংগ্রেসের লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র হতে চলেছে এটাই। দেশের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে ৭৫টি প্রতিশ্রুতি পূরণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ‘নেশন ফাস্টর্’ নামের ৪৫ পৃষ্ঠার এ ইশতেহার প্রকাশ করেছেন নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ’র পদ্মবাহিনী। নয়াদিল্লিতে দলের সদর দফতরে সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহসহ বিজেপির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এটি প্রকাশ করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ‘জাতীয়তা বোধ আমাদের অনুপ্রেরণা। দুর্বলকে শক্তিশালী করা আমাদের লক্ষ্য এবং সুশাসন আমাদের মন্ত্র।’ ‘৭৫টি প্রতিশ্রুতি নিয়েছি আমাদের ইশতেহারে। সময়মতো সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করব।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ইশতেহারে রামমন্দির নির্মাণের কথাও বলেছে বিজেপি। সমস্ত দলই ইশতেহার প্রকাশ করবে। কিন্তু রাজনাথ সিং দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম করে এ ইশতেহার তৈরি করেছেন। এটা এমন একটা ইশতেহার যা প্রতিফলিত হবে। আমাদের দেশ একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যাবে। এ সময় বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গত পাঁচ বছরে সরকার ৫০টি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের সরকার দেশ বদলাতে ভূমিকা নিয়েছে। আমরা এ সংকল্পপত্র তৈরির আগে ৬ কোটি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ২০১৪ সালে আমরা যখন ক্ষমতায় আসি তখন ভারত বিশ্বের ১১তম অর্থনীতি ছিল এখন আমরা বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি। তিনি আরও বলেন, ‘২০১৪-২০১৯ সাল দেশের উন্নয়নের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে মোদি সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।’ এদিকে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, ‘আমাদের সব প্রতিশ্রুতির কথা বলা রয়েছে ইশতেহারে। আমরা নতুন ভারত গড়ার দিকে এগোচ্ছি।’ এটি প্রকাশ করতে গিয়ে রাজনাথ আরও বলেন, ‘দ্রুত রামমন্দির নির্মাণ করা হবে।’ এবারের ইশতেহার বাস্তব দিক মাথায় রেখে নিখুঁতভাবে করা হয়েছে বলেও এ সময় উল্লেখ করেন তিনি। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানা যায়, বিজেপির সংকল্পপত্র নামের গতকালের এ ইশতেহারে কিষাণ সম্মান নিধির আওতায় সমস্ত কৃষককে বছরে ৬ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ৬০ বছরের পর বিশেষ পেনশন দেয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে শবরীমালা ইস্যুর কথাও বলা রয়েছে দলটির ইশতেহারে। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পাশাপাশি একই বছরের মধ্যে সবার জন্য বাড়ি তৈরি করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে দেশটির জাতীয়তাবাদী দলটির পক্ষ থেকে। ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় সড়ক চওড়া করার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নাগরিকত্ব বিল, অনুচ্ছেদ ৩৭০, অনুচ্ছেদ ৩৫ এ, তিন তালাক নিয়েও কথা বলা হয়েছে বিজেপির ইশতেহারে। এদিকে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের বিশেষ অধিকার প্রত্যাহারের অঙ্গীকার প্রসঙ্গে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫এ অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দারা ছাড়া অন্য ভারতীয়রা এই রাজ্যটিতে সম্পত্তি কিনতে পারে না। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন বিজেপির ইশতেহারে ১৯৫৪ সালে সংবিধান সংশোধন করে যুক্ত করা ওই ধারাটির বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘আমরা বিশ্বাস করি আর্টিকেল ৩৫এ রাজ্যটির উন্নয়নের পথে একটি বাধা।’ বিজেপির এ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভারতের একমাত্র মুসলিম প্রধান রাজ্যটিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ আইনটির পরিবর্তন করা হলে তা ব্যাপক অস্থিরতার কারণ হতে পারে বলে ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতারা। শেষ মুহূর্তে প্রকাশ করা এ ইশতেহার বিজেপির গত পাঁচ বছরের কর্মকা-ের খতিয়ান তুলে ধরে কাজ করা (কাম করনেওয়ালি) সরকার হিসেবে মোদি সরকার জাহির করা হয়েছে। এবারের বিজেপির এ ইশতেহারে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে সন্ত্রাসবাদ ও অনুপ্রবেশ। সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সাঁড়াশি চাপ বাড়ানো হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান সীমান্তে তল্লাশি চৌকি (চেক পোস্ট) বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বিজেপির ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের মতোই সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে একই অবস্থানে রয়েছে বিজেপি। ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার আবারও ক্ষমতায় এলে তারা সন্ত্রাসবাদকে মেনে নেবে না। পাশাপাশি উগ্রবাদকেও সহ্য করা হবে না বলে জানানো হয়েছে। এছাড়াও বেশ কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাকে যেমন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে সেই নীতিতেই আগামীতে চলতে চায় বিজেপি। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কেনার উপর জোর দিয়েছে জাতয়িতাবাদী এ দলটি। ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করতে সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলার ভাবনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।গতকালের এ ইশতেহারে পরিষ্কার ভাষায় বিজেপি জানিয়েছে, কোনোমতেই অনুপ্রবেশকে তারা সহ্য করবে না। দাবি করা হয়েছে, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অনুপ্রবেশের জন্য সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত প্রভাব পড়েছে। এনআরসির (জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন) ওপরে জোর দেয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার প্রকাশ করা নির্বাচনী ইশতেহারে বিরোধী দল কংগ্রেস কংগ্রেস তার অঙ্গিকার নামায় বলেছে, এক বছরে ৩৪ লাখ সরকারি শূন্য পদ পূরণ করা, কৃষকদের ঋণ মুক্তির পথে নিয়ে যাওয়া, লোকসভার প্রথম অধিবেশনে নারী বিল পাস, শিক্ষায় জিডিপি’র ছয় শতাংশ খরচ করা, যুবকদের তিন বছরের জন্য কোনওরকম লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাহুলের ইশতোহারে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে গরিব, কৃষক, নারী, যুব, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী । এর পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো বিষয়গুলো।

২০১৪ সালে বিজেপি ৯ দফা নির্বাচনের প্রথম দিনে ইশতেহার প্রকাশ করে। এবার তাতে আপত্তি করে নির্বাচন কমিশন। তারা জানায় প্রথম দফা ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে ইশতেহার প্রকাশের পর্ব শেষ করতে হবে। সেই অনুযায়ী, দু’দিন আগে ইশতেহার প্রকাশ করলো মোদির দল বিজেপি। দলটির ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতিগুলো হলো-

গঠন করা হবে জল শক্তি মন্ত্রণালয়

আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে প্রত্যেক জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ গঠন করা হবে।

আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে ভারতকে। এবং ২০২৫ এর মধ্যে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ২০৩২ এর মধ্যে ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা হবে ভারতকে।

প্রত্যেক মানুষের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে যাতে ব্যাংকিং পরিষেবা পাওয়া যায় সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রত্যেকের জন্য শৌচাগার ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হবে।

আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ইলেকট্রিফিকেশন হবে।

তৈরি করা হবে ৬০ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক।

আগামী ২০২৪ এর মধ্যে তৈরি করা হবে ২০০টি নতুন বিমানবন্দর।

সব দিক খতিয়ে দেখে যত দ্রুত সম্ভব তৈরি করা হবে রাম মন্দির।

কৃষকদের জন্য ঋণে কোনো সুদ লাগবে না।

পাঁচ বছরে কৃষিক্ষেত্রে খরচ করা হবে ২৫ লাখ কোটি রুপি।

ছোট কৃষকদের জন্য পেনশন স্কিমের উল্লেখও বিজেপির এবারের ইশতেহারে রয়েছে।

দেশের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে বলেও অঙ্গিকার করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন এ দলটি।