• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৮ রবিউস সানি ১৪৪১

ক্যাসিনো চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি

রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ জগতের মূল হোতারা আত্মগোপনে

সংবাদ :
  • সাইফ বাবলু

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০১৯

ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো পরিচালনা, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণকারী যুবলীগ নেতা খালেদ, জিকে শামীমদের জায়গা দখলে নতুন মাফিয়ারা তৈরি হচ্ছে! যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ, জিকে শামীম গ্রেফতার হলেও রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় তাদের অনেক গডফাদার অন্তরালে রয়ে গেছেন। এসব গডফাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ উঠছে, খালেদ ও শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর পরই আত্মগোপনে চলে যায় অনেক নেতা। আত্মগোপনে দেশ ও দেশের বাইরে থাকা এসব নেতার বিরুদ্ধেও অভিযোগের শেষ নেই। আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের ক্লিন ইমেজের রাজনীতির সঙ্গে নেতাকর্মীদের দাবি, সরকারের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে শুধু ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে চলবে না, ব্যবস্থা নিতে হতে অফিসপাড়ার টেন্ডার ও চাঁদাবাজসহ আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণকারী কতিপয় দলীয় নেতার বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অনেক নেতাই খালেদ, শামীমদের ওপর সব দোষ চাপিয়ে নিজেরা শুদ্ধ নেতা সাজার চেষ্টা করছেন। অথচ খালেদ ও শামীমদের মতো মাফিয়ারা তাদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের একাধিক সূত্র জানায়, ক্যাসিনো পরিচালনা, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ, হাইব্রিড যুবলীগ নেতা শামীম, আত্মগোপনে থাকা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ, দফতর সম্পাদক আনিসুর রহমান, সভাপতি স¤্রাটের নাম আলোচনা এলেও আওয়ামী লীগ, যুবলীগের কেন্দ্রীয়, মহানগর, থানা কমিটির দুই ডজন নেতার নাম পাওয়া গেছে। নেপথ্য থেকে তারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। এসব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা সরকারি অফিসপাড়ায় অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ইসমত জাহান আকন্দ লাভলু, ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম তুহিন, যুবলীগের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুন্নবী চৌধুরী ভূঁইয়া রাজু, মতিজিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান টিপু, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস ফারুক হোসেন, মাহাবুবুর রহমান হিরণ, আতাউর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহিসহ বেশ কয়েক নেতা। এসব নেতার বিরুদ্ধে যুবলীগের প্রভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া যুবলীগের মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি হারুন অর রশিদের নামও রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রক। বিএনপি-জামায়াতের ঠিকাদারকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দিয়ে থাকেন। এছাড়া বিতর্কিত ঠিকাদার শামীমের প্রধান নিয়ন্ত্রক ফারুক হোসেন। শিক্ষা প্রকৌশলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান হানজেলার সব অপকর্মের নেপথ্যের শক্তি ছিলেন এই যুবলীগ নেতা। ওই অভিযোগগুলো এখন খতিয়ে দেখছেন সরকারের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। তার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তার রয়েছে শান্তিনগরে টুইন টাওয়ারে আলিশান কয়েকটি ফ্ল্যাট। টুইন টাওয়ার, জোনাকী মার্কেট ও পলওয়েল মার্কেটে রয়েছে তার একাধিক দোকান।

যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহাবুবুর রহমান হিরণ যুবলীগ করার কারণে রূপালী ও জনতা ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, বড় বড় ঋণ পাইয়ে দেয়া ও ঋণখেলাপিদের নানা সুযোগ দিতে কলকাঠি নেড়েছেন যুবলীগের এই নেতা। ক্ষমতা খাটিয়ে দখলে নিয়েছেন সেঞ্চুরি মার্কেটের চতুর্থতলা। এখানে তার বর্তমান অফিস। ওই মার্কেটে হিরণ অপটিকসসহ রয়েছে বেশ কয়েকটি দোকান। সেঞ্চুরি অর্কিড আবাসিক এলাকা। এই এলাকার একেকটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৩-৪ কোটি টাকা। এছাড়া শামীমের সঙ্গে বেশ সখ্য ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান আতার বিরুদ্ধেও ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রক খালেদকে শেল্টার দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি দেশের নারীশিক্ষার ঐতিহ্যবাহী ভিকারুনিসা নূন স্কুলের গভর্নিং কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় ভর্তি বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে বিভিন্ন সংস্থা। যুবলীগে ফাররুক-হিরণ-আতা-মাসুদ শক্তিশালী সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিত ছিল যুবলীগের রাজনীতিতে। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজউক, শিক্ষা ভবন, নগর ভবন, গণপূর্ত, ওয়াসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় বড় কাজের সমঝোতা করেন।

মহিউদ্দিন মহি কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক। টানা ১০ বছর সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তার রয়েছে ঢাকায় কয়েকটি বাড়ি, ২০টির মতো আলিশান ফ্ল্যাট। তিনি ব্রাদার্স ক্লাবের সভাপতি। অভিযোগ রয়েছে, এই ক্লাবে তার নির্দেশেই ক্যাসিনো চলত। তিনি মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতির স¤্রাট নিয়ন্ত্রিত সব ক্যাসিনো থেকে নিয়মিত টাকা পেতেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রকে ২০ কাঠা জমি দান করেছিলেন মতিঝিল এলাকায়। মহানগর আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ইসমত জামান আকন্দ লাভলু, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ভারপপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজাসহ তিনি একটি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে ওই সম্পত্তি ডেভেলপ করতে দেন। সেখান থেকে দেয়া ৭০ কোটি টাকা তারা তিনজনে আত্মসাৎ করেছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পেরেছে।

সূত্র জানায়, যুবলীগ দক্ষিলের সহ-সভাপতি হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের যুবলীগের কমিটিতে পদ পাইয়ে দিতে চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর শ্যামপুর থানার জামায়াত আমির মাওলানা কাজী আকতারের ছেলে কাজী মারুফ হোসেনকে যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করার জন্য মনোনীত করেছিলেন। অথচ তার বাড়িতে শিবিরের বৈঠক হতো। হারুনের বিরুদ্ধে শ্যামপুর, ডেমরা এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। যুবলীগের দক্ষিণের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান ঢাকা জেলা পরিষদের সদস্য মনোনীত হয়ে ক্ষমতার অপব্যহার দেখিয়ে যাবতীয় ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণে নেন। মিজানুর ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রক খালেদের ক্যাসিনো ব্যবসার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। এছাড়া খালেদের ম্যানেজার হিসেবে বকুল নামের এক যুবলীগ নেতাও কাজ করতেন। তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন।

খালেদ ও শামীমের সামাজ্য কার দখলে?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত খালেদ ও শামীমের সা¤্রাজ্য এখন কার দখলে? মতিঝিল, খিলগাঁও, শাজাহানপুর, মুগদা, সবুজবাগ এলাকায় নিয়মিত চাঁদা আদায়, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারকারী মাফিয়া খালেদ গ্রেফতার হওয়ার পর তার সা¤্রাজ্য দখলে নেয়ার জন্য তৎপর রয়েছে একাধিক গ্রুপ। এছাড়া টেন্ডার নিয়ন্ত্রকারী শামীমের জায়গা দখলের জন্য একাধিক গ্রুপ তৎপর রয়েছে। খালেদ ও শামীমের সহযোগীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।