• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

রাজনীতি নিষিদ্ধের বিপক্ষে সব ছাত্র সংগঠন

‘এটি অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত’

সংবাদ :
  • আবদুল্লাহ আল জোবায়ের

| ঢাকা , রোববার, ১৩ অক্টোবর ২০১৯

image

আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রশাসন। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত নোটিশও দেয়া হয়েছে। তবে, বুয়েট প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ বা ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল বুয়েট প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়নি। বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যও বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিপক্ষে। সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। বক্তৃতা, সংবাদ সম্মেলন, টকশোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন থেকে

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট। জোটের অভিযোগ, বাস্তবে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছাত্র রাজনীতির ওপর নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ছাত্রলীগকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে জোটের নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। এগুলো হলো : আবরার ফাহাদসহ ক্যাম্পাসগুলোয় সব হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রায় অবিলম্বে কার্যকর, আবাসিক হলগুলোয় টর্চার সেল ও গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা, প্রথম বর্ষ থেকেই প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে সব শিক্ষার্থীর হলের সিটের অধিকার নিশ্চিত, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিকভাবে বুয়েটসহ সব ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি করার অধিকার এবং রাজনীতির নামে কেউ অপরাজনীতি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এটি একটি ভয়ঙ্কর অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং সব ধরনের বিরোধী মত ও তার ভিত্তিতে সংগঠিত শক্তিকে দমনের হাতিয়ারমাত্র; এটি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি প্রতারণাও বটে। আবরার ফাহাদ হত্যাকে কেন্দ্র করে অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বুয়েটে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ছাত্রলীগের একচ্ছত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অগণতান্ত্রিক আচরণ ও দখলদারির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে।

জোটের অন্যতম নেতা নাসির উদ্দীন প্রিন্স বলেন, ছাত্রলীগের রাজনীতি কোন রাজনীতি নয়, বরং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। গত ১০ বছরে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া আর কেউ ছিল না। তাদের নির্যাতন ও দখলদারিত্বই শিক্ষার্থীদের সামনে রাজনীতি হিসেবে দৃশ্যমান ছিল। আর এ কারণেই শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ক্যাম্পাসগুলো থেকে যদি ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়ে থাকে, একই কর্মকাণ্ডের দায়ে ছাত্রলীগকেও নিষিদ্ধ করা উচিত।

বিকেলে আবরারের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে ঢাবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য। মিছিলটি মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশ থেকে আবরারের হত্যার সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা, গণরুম-গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ এবং বুয়েটে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি ও টর্চার সেলগুলো বন্ধ করে ছাত্র রাজনীতি উন্মুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।

ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের কাছে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে সবাই তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ বিষয়ে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (বাসদ) কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী জয় সংবাদকে বলেন, আবরারের হত্যায় প্রশাসন তার ও ছাত্রলীগের দায় এড়াতে সব দায়ভার ছাত্র রাজনীতির ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বুয়েটে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তো বন্ধ হবেই না বরং এটা নিয়ে প্রতিবাদ করার যতটুকু শক্তি ছিল, তাও বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বুয়েট, চুয়েট, কুয়েটসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রভাব থাকে। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ফলে সেটা আরও কয়েকগুণ বাড়বে। আল কাদেরী বলেন, আমরা দখলদারিত্ব বন্ধ করে সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ‘মুক্ত ক্যাম্পাস’ হিসেবে তৈরি করতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছি। পাশাপাশি ক্যাম্পাসগুলো থেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় সংবাদকে বলেন, ছাত্র সংগঠনের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমরা কখনওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে নই। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে সব সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ছাত্র রাজনীতি না থাকলে সেখানে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে বুয়েটে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও জঙ্গি সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দেয়ার চেষ্টা করেছে। সেখানে রাজনীতি না থাকলে সে শক্তিগুলো তাদের কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়ে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করতে পারে। জয় বলেন, ছাত্র রাজনীতি না থাকলে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব চলে আসতে পারে। তাই প্রশাসনের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, তারা যেন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি বিবেচনা করে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কখনও কোন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিল না, থাকবেও না। আমরা পূর্বের কিছু ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, বুয়েটে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির একটি ভালো তৎপরতা আছে। তারপরও বুয়েটের প্রশাসন কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল, তারাই তা ভালো বলতে পারবে। তাদের এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা একমত হতে পারিনি। লেখক বলেন, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের মাধ্যমে যদি মৌলবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে ছাত্রলীগ অবশ্যই এ বিষয়ে কথা বলবে। বুয়েটে মৌলবাদী শক্তির তৎপরতা দেখলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ প্রয়োজনে বুয়েটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল সংবাদকে বলেন, ছাত্রলীগ লাগামহীন হয়ে পড়েছে, সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ একটি দখলদারিত্ব ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। এটা ছাত্র রাজনীতির দায়ভার না। দায়ভার ছাত্রলীগের। নিষিদ্ধ করতে হলে ছাত্রলীগকে করতে হবে। মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা তো কোন সমাধান নয়। শ্যামল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বাকস্বাধীনতার জায়গা। সেখানে কেউ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে না পারলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যবোধের পরিপন্থী হয়। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুয়েটের প্রশাসন সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করলে এবং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে যদি ‘সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রশাসন’ হতে পারে, তাহলে সমস্যাগুলো আর থাকবে না।