• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, ৭ রবিউল সানি ১৪৪০

ইতিহাসের সাক্ষী কল-রেডী

যে মাইকে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক

সংবাদ :
  • সেবিকা দেবনাথ

| ঢাকা , বুধবার, ০৭ মার্চ ২০১৮

image

একাত্তরের ৭ই মার্চ। ভাষণ দেবেন বাঙালির পথপ্রদর্শক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) মঞ্চ প্রস্তুত। সেই সঙ্গে প্রস্তুত ডায়াস। ডায়াসের সামনে রাখা হলো মাইক্রোফোন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ যার তরঙ্গের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক পৌঁছে গিয়েছিল মুক্তিকামী প্রতিটি মানুষের কাছে সে হলো ‘কল-রেডী’। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতাকামী প্রতিটি মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির সংগ্রামে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সভা-সমাবেশেও যোগ দিয়েছে কল-রেডী। একাত্তর; কিংবা তারও পরবর্তী বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় সাহসী ভূমিকা ছিল কল-রেডীর। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেও কল-রেডীর মাইক্রোফোনে ভাষণ দিয়েছিলেন। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, কল-রেডীর মাইকে বক্তব্য দিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের বাঘা বাঘা নেতারা। সেই সঙ্গে বিশ্বনেতারাও। তাদের মধ্যে রয়েছেন; প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, বিল ক্লিনটন। লক্ষ্মীবাজারের ৩৬ ঋষিকেশ দাস লেনে, আজও ইতিহাসকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী কল-রেডী। মার্চ মাসে কল-রেডীর মালিক দুই ভাই হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষকে ধানমন্ডির বাসায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে মাইক লাগানোর। সে সময় শাসকগোষ্ঠীর তীক্ষè দৃষ্টি এড়িয়ে কাজটা করা মোটেও সহজ ছিল না। তবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী কাজে নেমেছিলেন দুই ভাই। তিন দিন ধরে ৩০ জন কর্মী নিয়ে বাঁশ, খুঁটি গাঁথার কাজ করেছিলেন তারা। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে মাইক লাগানোর কাজ করেছিলেন হরিপদ ও দয়াল ঘোষ। ৭ই মার্চের তিন দিন তখনও বাকি। গোপনে মাইক লাগিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন তারা। আর সমাবেশের দিন তাৎক্ষণিকভাবে লাগিয়ে দেবার জন্য কিছু বাড়তি মাইক মজুদ রেখেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। তারপর এলো বাঙালির বহুল প্রতীক্ষিত দিন ৭ই মার্চ। মাঠের মঞ্চে কল-রেডীর ১৮টি মাইক্রোফোন বসানো হয়েছিল। মাঠ ও আশপাশে লেগেছিল দু’শর মতো মাইক। সারাদেশে ভাষণ ছড়িয়ে দিতে ছিল একটি রেকর্ডার। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ দেবেন তখন যাতে কোন যান্ত্রিক ত্রুটি না হয়, সে জন্য সেখানে উপিস্থত ছিলেন হরিপদ। সেই সঙ্গে একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারও নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর অতিরিক্ত তিনটি মাইক্রোফোন সঙ্গে রেখেছিলেন দয়াল ঘোষ। ৭ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকারের লোকেরা জ্বালিয়ে দিয়েছিল কল-রেডীর অফিস।

কল-রেডীর শুরুটা হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। তখন অবশ্য এর নাম ছিল আরজু লাইট হাউস। হরিপদ ও দয়াল ঘোষ মিলে আরজু লাইট হাউসের যাত্রা শুরু করেন। বিয়ে কিংবা কোন অনুষ্ঠানে লাইটের পাশাপাশি গ্রামোফোনও ভাড়া দিতেন তারা। পরিচিতি পেতে খুব একটা সময় লাগলো না। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভারত থেকে কয়েকটি মাইক নিয়ে আসেন দুই ভাই। তাতেও চাহিদা মিটছিল না। চাহিদা বাড়তে থাকে দিনে দিনে। চীন, জাপান, তাইওয়ান থেকে আনা শুরু হলো মাইক। তবে মাইকের মূল অংশ মানে ইউনিট বেশি আনা হতো বাইরে থেকে। মাইকের কারিগরি কিছু কাজ জানতেন হরিপদ। এরপর নিজ ও দোকানের কারিগর দিয়ে তৈরি করে নিতেন হর্নসহ বাকি অংশ।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর আরজু লাইট হাউস বদলে হয় কল-রেডী। দয়াল ঘোষ এই নামটি ঠিক করেন। এমন নামের পেছনে তার যুক্তিও ছিল। মানুষ তো কাজের জন্যই তাদের কাছ থেকে মাইক ভাড়া নেয়। মানুষ কল করলে তারা যেন রেডি থাকে। এক কথায়, কল করলেই রেডী। সে থেকে কল-রেডী।

রেডীর বর্তমান স্বত্বাধীকারী হরিপদ ঘোষের বড় ছেলে কল বিশ্বনাথ ঘোষ (বিশু)। ঘোষ পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, কল-রেডী কেবল একটি মাইক সার্ভিস নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাক্ষীও। তবে সেই সম্মানটুকু এই প্রতিষ্ঠান পায়নি। ৭ই মার্চ কল-রেডীর যে মাইক্রোফোনে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই মাইক্রোফোন, মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ড আজও যতœ করে রেখেছে ঘোষ পরিবার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওই জিনিসগুলো আর ব্যবহার করা হয়নি। অথচ সেগুলো জাদুঘরে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নেয়নি সরকার।