• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৩ মে ২০২০, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ রমজান ১৪৪১

ভয়াবহ ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম

যে কোন সময় লকডাউন হতে পারে

সহস্রাধিক বিদেশ ফেরত হোম কোয়ারেন্টিনে

সংবাদ :
  • চট্টগ্রাম ব্যুরো

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে সরকারের একাধিক সংস্থা। জনসচেতনতায় দিন-রাত তারা মাঠে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা এই চট্টগ্রামে গতকাল পর্যন্ত প্রায় সহস্রাধিক বিদেশ ফেরত মানুষ হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। এদের মধ্যে কারও করোনাভাইরাস থাকলে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল প্রশাসন থেকে। তাই তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, কাউকে বিনা কারণে ঘর থেকে বের না হওয়ার সরকারি নির্দেশনা পালন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি অলিগলিতে তৎপর রয়েছেন। এর থেকে বোঝা যায় চট্টগ্রাম লকডাউনের পথে যাচ্ছে। তবে লকডাউনের ঘোষণা না এলেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ইতোমধ্যে আন্তঃনগর ট্রেন, লোকাল, মেইল ও ডেমু ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ সব ফ্লাইটও বন্ধ হয়েছে। যাত্রীবাহী লঞ্চও আর চলছে না। বাস চলাচল বন্ধ হতে যাচ্ছে আজ থেকে। আপাতত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকছে আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে আগেই। অফিস-আদালতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের স্কুল-কলেজ, বিনোদন স্পটগুলো ছাড়াও কোচিং সেন্টার-রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সব ধরনের জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গতকাল বিপণিবিতান-মার্কেটও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ধীরে ধীরে লকডাউনের (অবরুদ্ধ) দিকে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম। আবার সরকারের মন্ত্রীরাও বলছেন অবস্থা বুঝে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, অর্থাৎ যদি করোনা শনাক্ত হয় তার বিস্তার রোধে সরকার অবশ্যই লকডাউনের পথে হাঁটবে। সরকার বলছেন, প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ানো হবে লকডাউনের পরিধি। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত থেকে কোনভাবেই বাইরে নয় চট্টগ্রাম। এখানেও চলছে একের পর এক লকডাউন ঘটনা। চট্টগ্রামে প্রথম লকডাউন ঘটনা ঘটে গত ২৪ মার্চ। সেদিন এক জাপানি নাগরিক কোয়ারেন্টিন না মানায় নগরীর খুলশি এলাকার একটি বিল্ডিং লকডাউন করা হয়। এছাড়াও একই সময়ে পাশের এলাকার একটি রেস্টুরেন্টেও লকডাউন করেছে প্রশাসন। প্রশাসন বলছে, এক কোরিয়ান নাগরিকের কোয়ারন্টিনে থাকার কথা থাকলেও তিনি কোয়ারান্টিনে ছিলেন না। বরং ওই কোরিয়ান নাগরিক লকডাউন করা ওই রেস্টুরেন্টে যাওয়া-আসা করেন। যার কারণে রেস্টুরেন্টটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে নগরীর সড়ক ও অলি-গলিতে টহল শুরু করেছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। মূলত জেলা প্রশাসনকে সহায়তা দিতেই তারা নগরীর অলি-গলিতে টহল দিচ্ছেন। গতকাল সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনা সদস্যরা মাঠে নামেন। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সরকারের নির্দেশেই সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সহায়তা করবেন তারা। জেলা প্রশাসন আরো জানান, যাদের কোয়ারান্টিনে থাকার কথা তাদের অনেকেই কোয়ারেন্টিন মানছেন না। সেজন্য অনেককে জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কোয়ারেন্টিন। এ জন্য বিশেষভাবে কাজ করবে সেনাবাহিনী।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বদিউল আলম বলেন, সকাল থেকেই সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে। তারা মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। পাশাপাশি সবাইকে ঘরের ভেতর থাকতে বলছেন এবং কেউ যাতে কোনভাবে কোন জায়গায় জটলা সৃষ্টি না করেন তার জন্য অনুরোধ করছেন। বদিউল আলম বলেন, করোনা বিস্তার ঠেকাতে আমাদের সবাইকে সজাগ থাকবে হবে। এ সময় নিয়ম যারা মানবেন না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন বলেন, নগরীর ১৬ থানা ও জেলার ১৬ থানায় জেলা প্রশাসনকে সহায়তা করতে মাঠে নেমেছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় করোনা বিস্তার ঠেকাতে যা যা করা প্রয়োজন তার সবটায় করবে জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর যৌথ টিম। এর আগে মঙ্গলবার বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন।

জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে অভিযানে নেমেছে সেনাবাহিনীর ১৭ টিম। তিন পার্বত্য জেলাসহ সেনাবাহিনীর মোট ৪৩টি টিম এখন করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চট্টগ্রামের মাঠে আছে। ৬ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর টিম নগরজুড়ে অভিযান চালাচ্ছে। নগরীর খুলশী এলাকায় বিদেশি নাগরিকসহ পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া একটি কোরিয়ান রেস্টুরেন্ট সিলগালা করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সেনানিবাসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত তিনটি বিষয়ে তারা কাজ করছেন। এগুলো হচ্ছে- করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা তদারক, বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা তদারক এবং জনসমাগম ঠেকানো।

অন্যদিকে, সৌদি আরব থেকে আসা কক্সবাজারের এক বৃদ্ধ নারীকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হল। ৭৫ বছর বয়সী ওই নারী দেশে ফিরে ১৩ মার্চ উঠেন চট্টগ্রামের সিডিএ আবাসিক চান্দগাঁওয়ে ছেলের বাসায়। এ কারণে নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক ও বাকলিয়া থানার কালামিয়া বাজার এলাকায় ওই নারীর দুই ছেলের দুটি বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছে প্রশাসন। এ ঘটনায় কক্সবাজার শুধু নয়, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামেও। লকডাউন হওয়া এই দুটি গতকাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর নজরদারিতে রেখেছেন।

লকডাউনের বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, এখনও সরকারের পক্ষে থেকে আমাদের সে রকম কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। আপাতত জনসমাগম বন্ধের নির্দেশনা আছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী হোম কোয়ারেন্টিনের বিষয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। সার্বিক অবস্থা যদি লকডাউনের দিকে যায়, সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তখন আমরাও সেদিকে যাব।

পূর্ণাঙ্গ তথ্যউপাত্ত না থাকার কারণ হিসেবে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে বিদেশ ফেরতদের সবাই চট্টগ্রামের অধিবাসী নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবাসী চট্টগ্রাম হয়ে দেশে ফিরছেন। কড়াকড়ি আরোপের আগেই হাজার হাজার প্রবাসী দেশে প্রবেশ করেছেন। প্রথম দিকেতো শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারও ছিল না। ১০ মার্চ এসেছে সেই থার্মাল স্ক্যানার।

আরও আশঙ্কার বিষয় সম্প্রতি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বিভাগীয় কমিশনারের বৈঠকে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক একেএম শামসুল হক তুলে ধরে বলেন, ইমিগ্রেশন ডাটা অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে কুমিল্লায় এসেছেন ১০ হাজার প্রবাসী। কিন্তু তাদের ১০ ভাগও কুমিল্লায় নেই। তারা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন।