• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জিলকদ ১৪৪১

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসাদের হৃদয়বিদারক বর্ণনা

স্বজনদের কান্নায় বুড়িগঙ্গা তীর ভারি

সংবাদ :
  • সাইফ বাবলু

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

image

সকাল ৯টা। পুরো লঞ্চে যাত্রী ঠাসা। কিছুক্ষণের মধ্যেই লঞ্চটি ঘাট করবে। এরপর যে যার মতো গন্তব্যে চলে যাবেন। কিন্তু হঠাৎ বিকট শব্দে ধাক্কা। এরপর কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই ডুবতে শুরু করে যাত্রীবাহী লঞ্চ মর্নিংবার্ড। যাত্রীভর্তি লঞ্চটি তলিয়ে যেতে সময় নিয়েছে মাত্র ১০ সেকেণ্ড। আর এতে কয়েকজন সৌভাগ্যভান যাত্রী বেঁচে গেলেও সলিল সমাধি ঘটেছে অধিকাংশ যাত্রীর। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা যেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। বেঁচে যাওয়া কয়েকজন যাত্রী এভাবেই বর্ণনা করছিলেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার ঘটনা।

ডুবে গিয়ে সাঁতরে কূলে উঠে জীবন ফিরে পাওয়া যাত্রীরা নিজেদের বড়ই সৌভাগ্যবান মনে করছেন। এদিকে উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়েছে সদরঘাট থেকে শুরু করে মিটফোর্ড হাসপাতালে। আবার এখনও যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারিতে বুড়িগঙ্গার পার ভারি হয়ে ওঠেছে। লঞ্চ ডুবিতে সাঁতরে কূলে উঠা যাত্রী ওমর চান। নিজের কাজেই ঢাকায় আসছিলেন। কয়েকজনের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ছিলেন ওমর চান। কিছুক্ষণের মধ্যেই লঞ্চ ঘাটে ভিড়বে। এমন সময় হুট করেই বিকট শব্দ আর কাঁপুনি। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই উল্টে যাচ্ছিল লঞ্চটি। কোনকিছু না ভেবেই জীবন বাঁচাতে পানিতে লাফিয়ে পড়েন ওমর চান। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন পানিতে লাফ দেন। অনেকে পানির নিচ থেকে টেনে ধরছিলেন। কোন রকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন ওমর। তীরে ওঠার আগে তিনি এক নারীকেও উদ্ধার করে আনেন। শুধু ওমর চানই নয় সাঁতরে জীবন বাঁচাতে পেরেছেন এমন অনেক যাত্রীই।

লঞ্চডুবির সময় লাফ দিয়ে নদীতে পড়ে সাঁতরে কূলে আসেন মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভার বাসিন্দা এনায়েত নগরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। বেঁচে যাওয়া জাহাঙ্গীর বলেন, জীবন ফিরে পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। এভাবে বাঁচতে পারবো ভাবতেও পারিনি। যেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি। জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, রাজধানীর বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করেন তিনি। জীবিকার তাগিদে মীরকাদিম থেকে প্রতিদিনই লঞ্চে সদরঘাটে আসেন। এরপর সেখান থেকে কর্মস্থলে যান। এভাবে গত আট বছর ধরে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন তিনি। কিন্তু এভাবে লঞ্চ দুর্ঘটনায় কখনও পড়েননি। জাহাঙ্গীর বলেন, প্রতিদিনের মতো সকাল পৌনে ৮টায় তিনি মর্নিংবার্ড লঞ্চে করে ঢাকার পথে রওনা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন মীরকাদিম পৌর এলাকার প্রায় ১০ জন যাত্রী। কথা আর আড্ডা দিয়ে তারা লঞ্চের ভেতরে সময় কাটাচ্ছিলেন। লঞ্চটি ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকায় পৌঁছায় সকাল সোয়া ৯টার দিকে। এ সময় হঠাৎ তাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয় ময়ূর-২ নামের একটি লঞ্চ। ধাক্কা খেয়ে একপাশে কাত হয়ে যায় মর্নিংবার্ড। সবাই লঞ্চ থেকে ছিটকে নদীতে পড়তে থাকে। তিনিও পানিতে পড়ে যান। তার গায়ের ওপর পড়েন ১০-১২ জন যাত্রী। চোখের সামনেই অনেকে পানিতে তলিয়ে যান। তিনিও ডুবতে ডুবতে ভেসে ওঠেন। কোন রকম সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন তিনি। জাহাঙ্গী বলেন, ডুবে যাওয়ার আগেও যাদের মধ্যে প্রাণবন্ত আড্ডা চলছিল, তারাই চোখের সামনে ডুবে হারিয়ে গেলেন। এটা যে কতটা কষ্টের, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না।

দুর্ঘটনা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা নাজমা আক্তার, জুমকি, কাকলি বেগম ও মমিন আলীও জানান, চোখের সামনে মৃত্যুদূতকে দেখেছি। ধরেই নিয়েছে মারা যাব। কিন্তু কিভাবে যে বেঁচে গেলাম তা কল্পনা করলেও গা শিউরে উঠে। নদীতে যখন ডুবে যাই তখন সর্বশক্তি দিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করি। নাজমা আক্তার বলেন, চিকিৎসা নিতে তিনি ঢাকায় যাচ্ছিলেন। লঞ্চটি যে পাশ দিয়ে ডুবছিল, তার বিপরীত পাশে ছিলেন। সেখানকার জানালা দিয়ে তিনি বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিনি বের হতে পারলেও তার চোখের সামনে পরিচিত মুখগুলো লাশ হয়ে গেল। যাদের সঙ্গে দেখা হলো কথা হলো সেই মানুষগুলো মুহূর্তে লাশ হয়ে গেল। পানিতে তলিয়ে গেল। এমন দৃশ্য মনে হতেই আতকে উঠি।

বেঁচে যাওয়া আরেক যাত্রী ছিলেন মুন্সীগঞ্জের আবদুর রউফ। তিনি সাঁতরে কূলে উঠলেও চোখের সামনে ঘনিষ্ট বন্ধু সত্যরঞ্জনকে ডুবে যেতে দেখেছেন। যদিও পরে সত্যরঞ্জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। বেঁচে যাওয়া যাত্রী আবদুর রউফ জানান, সত্যরঞ্জন আর তিনি দুই বন্ধু। দুই বন্ধু গত ২০ বছর ধরে প্রায়ই একসঙ্গে ঢাকায় আসেন আবার কাজ শেষ করে মুন্সীগঞ্জে ফিরে যান। প্রতিদিনের মতো গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে মর্নিংবার্ড লঞ্চে দুই বন্ধু ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাট টারমিনালের কাছাকাছি চলে আসে। লঞ্চটি তখন ঘাট থেকে ২০০ হাত দূরে ছিল। লঞ্চের যাত্রীরা নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখই দুর্ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি তলিয়ে যায়। আবদুর রউফ বলেন, ‘লঞ্চটি সদরঘাটের একেবারে কাছে চলে আসে। আমরা নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ঘাটের খালি একটি লঞ্চ আমাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। ভয়ে আমরা সবাই চিৎকার দিই। ৩০ সেকেণ্ডের মধ্যে আমাদের লঞ্চটি উল্টে যায়। আমরা ছিলাম লঞ্চের নিচের তলায়। পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকি। দম আমার বের হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি পানির ওপরে উঠতে পারায় বেঁচে যাই। কিন্তু আমার বন্ধু সত্যরঞ্জন উঠতে পারেনি, সে মারা গেছে। আবদুর রউফ জানান, লঞ্চের যারা মারা গেছেন বা ডুবে গেছেন, তাদের অনেককে চিনি। অনেকেই পরিচিত। ঘনিষ্টতা রয়েছে। এসব মানুষ মুন্সীগঞ্জ থেকে প্রতিদিন ঢাকায় আসেন। কাজ শেষে আবার মুন্সীগঞ্জে চলে যান।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে বেঁচে ফেরা যাত্রী মো. মাসুদ জানান, আমি ও আমার দুই মামা আফজাল শেখ এবং বাচ্চু শেখ ওই লঞ্চে উঠেছিলাম। সদরঘাট নামার কথা ছিল। ঘাটে ভেড়ার জন্য লঞ্চ সোজা আসছিল। অন্য একটা লঞ্চ তেছড়াভাবে (বাঁকা) রওনা দিছে। তেছড়াভাবে রওনা দেয়াতে ওই লঞ্চটা বাড়ি দিছে আমাদের লঞ্চের মাঝে। বাড়ি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটা কাইত হয়ে ডুবে গেছে। তলিয়ে যেতে ১০ সেকেণ্ডও সময় নেয় নাই। আমি কেবিনে ছিলাম। গ্লাস খুলে আমি বের হইছি। ভেতরে আমার আপন দুই মামা ছিলেন। তারা তো বের হতে পারেন নাই। মো. মাসুদ জানান, রাজধানীর ইসলামপুরের গুলশানআরা সিটিতে কাপড়ের ব্যবসা করেন তিনি। প্রতিদিন তিনি সকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে কাপড়ের দোকান করেন। গত রোববার ময়মনসিংহ থেকে তার দুই মামা তাদের মুন্সীগঞ্জের বাসায় বেড়াতে যান। তাদের নিয়ে সকালে লঞ্চের একটি কেবিনে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। কিন্তু লঞ্চ পাড়ে ভেড়ার আগে মুহূর্তে লঞ্চ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। মাসুদ আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর লঞ্চে থাকা প্রায় ৫০ জনের মতো যাত্রী আমরা সাঁতরে উঠতে পারছি। বাকি যাত্রী কেউ উঠতে পারে নাই। তারা লঞ্চের ভেতরেই ছিল। আমরা প্রায় ১৫০ জনের মতো যাত্রী ছিলাম।

স্বজনদের কান্নায় ভারি বুড়িগঙ্গা ও মিটফোর্ড

এদিকে লঞ্চ দুর্ঘটনায় সলিল সমাধি হওয়া যাত্রীদের মরদেহ শনাক্ত করতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন স্বজনরা। স্বজনদের আত্মচিৎকারে মিটফোর্ডে হৃদয় বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। একই অবস্থা ছিল দুর্ঘটনাস্থলে। অনেকেই লাশ শনাক্ত করলেও যাদের লাশ এখনও পাওয়া যায়নি তাদের স্বজনরা একবার মিডফোর্ডে একবার সদরঘাটে ছুটছেন। প্রিয় স্বজনদের লাশ ফিরে পেতে শুধু কান্না করেই যাচ্ছেন। কোনভাবেই তারা চোখের পানি বন্ধ করতে পারছেন না। লঞ্চ ডুবিতে কারো পরিবার, কারো বাবা, কারো স্ত্রী সন্তান, কারো স্বামী, কারো ভাই লাশ হয়েছেন। সলিল সমাধি হওয়া যাত্রীদের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছেন যারা ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। এমন যাত্রীও রয়েছে- সে মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন। যাদের আয়ে চলতো সংসার।

বাবা সত্যরঞ্জনের মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে দোলা বণিক। কোনভাবেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলেন না। করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ী বাবাকে লঞ্চে উঠতে নিষেধ করেছিলেন আগের দিনই। একদিন পরই বাবার লাশ নিতে ছুটে এসেছেন মুন্সীগঞ্জ থেকে। দোলা বণিক বলেন, তার বাবার মিটফোর্ডে দোকান আছে। তিনি থাকেন ঢাকায়। তার বাবা প্রতিদিন মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন। আবার কাজ শেষে চলে যান। গত পরশু দিন তার বাবা তার বাসায় আসেন। তিনি বাবাকে বলেছিলেন বাবা, এখন করোনাভাইরাস। তুমি লঞ্চে করে যাতায়াত কোরো না। আমার বাসায় থেকে ব্যবসা করো। কিন্তু আমার বাবা কথা শুনল না। চলে গেল। সেই চলে যাওয়া চিরদিনের জন্য হয়ে গেল।

ফল ব্যবসায়ী আবু সাঈদ মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার সদরঘাটের বাদামতলীতে ফল কেনার জন্য বাসা থেকে সকাল ৭টায় রওনা হন। পরে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে ওঠেন। আবু সাঈদের কোন খবর পাচ্ছেন না তার স্বজনরা। আবু সাঈদের স্ত্রী নূর জাহান বেগম বলেন, ‘অভাবের সংসার। করোনায় অনেক দিন ফলের দোকান বন্ধ। আয় নেই। এখন আবার ব্যবসা শুরু হয়েছে। আমার স্বামী ফল কেনার জন্য ঢাকায় আসেন। সকাল সকাল লঞ্চ ধরতে হবে বলে খেয়েও আসেননি। তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। শেষ দেখাটা দেখতে চাই।