• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬, ৩০ রজব সানি ১৪৪১

মীমাংসার পথে বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির বিরোধ

    সংবাদ :
  • সংবাদ ডেস্ক
  • | ঢাকা , শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯

ভারতের অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমির দাবি ছেড়ে দিতে পারে এই মামলার অন্যতম পক্ষ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড। গত ১৬ অক্টোবর ১৩৪ বছরের আইনি লড়াইয়ের মামলার শুনানি শেষে এমন আভাস দিয়েছে ভারতের গণমাধ্যমগুলো। খবরে বলা হয়, আগামী ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণার আগেই ভারতের কিছু হিন্দু সংগঠন অযোধ্যা মামলা বিষয়ে আগাম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। আইনি প্রক্রিয়ায় কিছু হিন্দু ও মুসলিম সংগঠন ক্ষোভ প্রকাশ করায় উত্তেজনার আশঙ্কায় অযোধ্যায় ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করেছে ভারত সরকার।

৬ আগস্ট থেকে একটানা ৩৯ দিন ধরে প্রতিদিন চলছিল অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জমির অধিকারের মামলার শুনানি। এই বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ার কাজ ১৮৮৫ সালে শুরু হলেও এখনও কোন সুরাহা মেলেনি। এরমধ্যে আদালতে উঠেছে নানা পক্ষের নানা পিটিশন। ২০১১ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টে এই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ দিলে আবার ২০১৭ সালে নতুন করে মামলার শুনানি শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট, যা তখন সম্পূর্ণ হয়নি। অবশেষে চলতি বছরের ১৬ অক্টোবর শুনানি পর্যায়ের শেষ দিনে সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী কমিটি জানায়, যে আগামী ১৭ নভেম্বর মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে। এই মামলায় মসজিদের পক্ষে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড ও মন্দিরের পক্ষে হিন্দু মহাসভা, নির্বাণী আখড়া ও রাম জন্মস্থান পুনরুদ্ধার সমিতি লড়ছে।

মসজিদ ও মন্দির পক্ষের মধ্যে বিতর্কিত দুই দশমিক ৭৭ একর জমির মালিকানা বিষয়ে কোন সমাধান না পাওয়া গেলে আগস্ট মাসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত নতুন করে মধ্যস্থতাকারী কমিটি গঠন করে। এই প্যানেলে রয়েছেন জজ কলিফুল্লা, সিনিয়র অ্যাডভোকেট শ্রীরাম পাঞ্চু ও গুরু শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর। ১৯৯৩ সালে উত্তরপ্রদেশে জারি হয় রাষ্ট্রপতি শাসন। সেই সময় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার বিতর্কিত দুই দশমিক ৭৭ একর জমিকে ঘিরে মোট ৬৭ দশমিক ৭০৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে, যারমধ্যে ছিল রাম জন্মভূমি ন্যাস সংগঠনের ৪২ একর জমি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে আন্দাজ করা যাচ্ছে, হয়ত গোটা জমিটিই সরকারের হাতে তুলে দেবে আদালত। কিন্তু বিতর্কিত জমির দখল কার হাতে যাবে, সেটাই হবে নভেম্বরের রায়ের মূল বক্তব্য।

কী থাকবে নভেম্বরের চূড়ান্ত ঘোষণায়, এই নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে নানা মতামত। আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, সুপ্রিম কোর্টে মামলাতেও মোদি সরকার রামমন্দির তৈরির রাস্তা সহজ করার চেষ্টা করেছে। প্রেমাংশু চৌধুরী সেই সম্পাদকীয় প্রবন্ধে নজরে আনছেন অযোধ্যায় রামমন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত নানা ধারণাকে। শুধু তাই নয়, প্রবন্ধে জোর দেয়া হয়েছে মন্দির/মসজিদের রাজনীতিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের রুটিরুজির প্রশ্ন। তিনি বলছেন, অযোধ্যাবাসীর আশা— রাম মন্দিরের হাত ধরে রুটিরুজি আসবে। রাম মন্দির হলে অবশ্য গোটা দেশেই হিন্দু-আবেগ উসকে দেয়া হবে। চাকরির অভাব, গাড়ি কারখানায় ছাঁটাই থেকে নজর সরে যাবে। আর যদি রাম মন্দিরের বিরুদ্ধে রায় আসে, তা হলে গোটা সঙ্ঘ পরিবার ফের রাম মন্দির আন্দোলনে মাঠে নামবে। সে ক্ষেত্রেও রুটিরুজির সমস্যা থেকে নজর সরে গিয়ে ফের দেশের প্রধান চর্চার বিষয় হয়ে উঠবে আড়াই হাজার বছরের পুরনো এক মহাকাব্য।

মন্দিরপক্ষের জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে বর্তমান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ। সেখানে বলা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের শুনানির পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী কমিটির রিপোর্টে চূড়ান্ত কিছু জানানো হয়নি। কিন্তু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, সরকার যদি বাবরি মসজিদের জমি অধিগ্রহণ করেও নেয়, তাহলে আপত্তি করবে না ওয়াকফ বোর্ড। অন্যদিকে, আনন্দবাজারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা সাক্ষী মহারাজের একটি উদ্ধৃতি। সেখানে তিনি বলেন, প্রভু রামের পক্ষেই রায় আসবে। ৬ ডিসেম্বর বা তার আগেই রামমন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এ বছর দু’বার দীপাবলি হবে প্রসঙ্গত, বাবরি মসজিদের কাঠামো ভাঙা হয় ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর।

ইংরেজি সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জোর দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে, যার নির্বাচনী ইশতাহারে প্রতিবারই উঠে এসেছিল রাম মন্দির নির্মাণের কথা। মোদি বলেছেন, সরকার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব যাই হোক না কেন, আমাদের ইশতেহার অনুযায়ী এই বিষয়ে আমরা সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাব।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটি প্রতিবেদনে তুলে এনেছে ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্গত প্রাসঙ্গিক বিধান। সেখানে উঠে এসেছে ১৯৯১ সালের ধর্মীয় উপাসনার স্থান বিষয়ক আইনি ধারা। সেই প্রতিবেদনে রয়েছে জামায়াত উলেমা-ই-হিন্দের প্রধান মৌলানা আরশাদ মাদানীর বক্তব্য। তিনি বলেছেন, ‘শরিয়া আইন অনুযায়ী, মুসলমানদের মসজিদের মর্যাদা পরিবর্তন করার কোন অধিকার নেই। কারণ এটি বিচারের দিন পর্যন্ত সর্বদা ইবাদতের জায়গা হিসাবে রয়েছে। সুতরাং মুসলমানরা এই মসজিদের জমির অধিকার অন্যত্র সমর্পণ করে তাকে অন্য কোন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে না।

হিন্দি-ইংরেজি-বাংলা সব মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশ তথা ভারতের একাধিক হিন্দু সংগঠনের অযোধ্যা মামলা বিষয়ে আগাম উচ্ছ্বাসের খবর। রয়েছে বিচ্ছিন্ন কিছু হিন্দু ও মুসলিম সংগঠনের আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি ক্ষোভের কথাও।

রায় কোন পথে যাবে, সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট ধারণা এখনই না পাওয়া গেলেও, বিশেষজ্ঞরা আঁচ করছেন, মন্দির গড়ার জন্য হয়ত শেষ পর্যন্ত সরকার জমি দিতে বাধ্য হবেই। মধ্যস্থতাকারী কমিটি যে ‘সমঝোতা’র প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে পুরোপুরি খুশি নয় মন্দির বা মসজিদ কোন পক্ষই। ফলে, রায় ঘোষণার পর উত্তপ্ত হতে পারে পরিস্থিতি।

রামায়ণ-খ্যাত অযোধ্যা শহর ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের ফৈজাবাদ জেলায় অবস্থিত। তারই কাছে রামকোট পর্বত। ১৫২৮ সালে সেখানে সম্রাট বাবরের আদেশে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, যে কারণে জনমুখে মসজিদটির নামও হয়ে যায় বাবরি মসজিদ। আবার এও শোনা যায়, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের আগে এই মসজিদ ‘মসজিদ-ই-জন্মস্থান’ বলেও পরিচিত ছিল।