• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

সংসদ সদস্য

মঈন উদ্দীন খান বাদল আর নেই

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি), বাংলাদেশ জাসদের নেতা, বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মঈন উদ্দীন খান বাদল মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। গতকাল ভোরে ভারতের বেঙ্গালুরুর নারায়ণ হৃদরোগ রিসার্চ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি তিন ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার ভাই মনির উদ্দীন খান জানান, গত ১৮ অক্টোবর থেকে ভারতে প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠির তত্ত্বাবধানে ছিলেন তিনি। চিকিৎসাধীন হার্টফেল করায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মরহুমের মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে আনা হবে বলে জানান তিনি তার মরদেহ দেশে আনা এবং শেষকৃত্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে পরে তা জানানো হবে।

মঈন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা মরহুদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া এবং সংসদের প্রধান হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন।

এক শোক বার্তা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, মরহুম মইন উদ্দীন খান বাদল সংসদের বিভিন্ন কমিটিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গঠনমূলক মতামত প্রদান করে সংসদ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পৃথক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মঈন উদ্দীন বাদলের অবদানের কথা গভীর সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, বাদলের মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদকে হারাল। দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকার কথা দেশবাসী স্মরণ করবে।

এক শোক বার্তায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মইন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে দেশ একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারালো। তার মৃত্যু দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এক শোকবার্তায় বলেছেন, মইন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে দেশ একজন নির্ভিক মুক্তিযোদ্ধা, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রগতিশীল অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারাল।

মইন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেও বলেন, বলেন, তার মৃত্যুতে একজন অসম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ দেশপ্রেমিক রাজনীতিককে হারিয়েছে বাংলাদেশ। গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অসামান্য অবদানের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি।

এ ছাড়া মঈন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম মোজাম্মেল হক এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আবদুল মোমেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ মন্ত্রীপরিষদের বিভিন্ন সদস্য।

মইনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে কেন্দ্রীয় ১৪ দল গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে। এক শোক বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম খান বলেন, বাদলের মৃত্যুতে দেশ একজন অসম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ দেশপ্রেমিক রাজনীতিককে হারাল। তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অসামান্য অবদানের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

শোক প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা।

তার মৃত্যুতে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি ঐক্য ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এসএম এ সবুর ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ্ তারেক গভীর শোক প্রকাশ করেন ও শোকাহত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন। পৃথক এক শোক বার্তায় সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি জিয়াউদ্দিন তারেক আলী ও সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ।

বছর দুই আগে ব্রেইন স্ট্রোক হওয়ার পর থেকেই অসুস্থ ছিলেন বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী পরিষদের সভাপতি বাদল। ৬৭ বছর বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ হৃদযন্ত্রের জটিলতায়ও ভুগছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ আগে নিয়মিত চেকআপের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন বাদল। সেখানে প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মইন উদ্দীন খান বাদল। তার বাবা আহমদ উল্লাহ খান ও মা যতুমা খাতুন। ষাটের দশকে ছাত্রলীগের ‘নিউক্লিয়াসে’ যুক্ত বাদল একাত্তরে ভারতে প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস প্রতিরোধের অন্যতম নেতৃত্বদাতা ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন বাদল। জাসদ হয়ে বাসদ এবং পরে আবারও জাসদে ফেরেন। এরশাদের সামরিক শাসনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়।

২০১৬ সালের ১২ মার্চ জাসদের জাতীয় কাউন্সিলে আবার দুই ভাগ হয় দলটি। হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতার নেতৃত্বাধীন অংশটি ইসির স্বীকৃতি পাওয়ার পর শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান নেতৃত্বাধীন অংশটি বাংলাদেশ জাসদ নামে আলাদা দলের স্বীকৃতি চায়। তবে ইসি তাদের নিবন্ধন দেয়নি। এই অংশের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন মইন উদ্দীন খান বাদল। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসন থেকে ২০০৮ সালে মহাজোটের মনোনয়ন পান শরিক দল জাসদের নেতা বাদল। নৌকা প্রতীকে তার বড় জয়ের মধ্য দিয়ে ওই আসনে বিএনপির দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটে। এরপর ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে আরও দুই বার তিনি আসনের এমপি নির্বাচিত হয়ে সংসদে যান। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে দৃপ্ত বক্তব্য দেয়া বাদল সমাদৃত ছিলেন একজন দক্ষ পার্লামেন্টেরিয়ান হিসেবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল গঠনেও তার ভূমিকা ছিল। চট্টগ্রাম ৮ (চাঁদগাঁও-বোয়ালখালী) আসনের তিনবারের সাংসদ বাদল বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।