• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জিলকদ ১৪৪১

সংক্রমণ তীব্র হচ্ছে

ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে করোনাভাইরাস

বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, স্বাস্থ্যবিধি না মানা, রোগী শনাক্তে বিলম্ব পরিস্থিতি অবনতির কারণ

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন

| ঢাকা , বুধবার, ০১ জুলাই ২০২০

করোনা মহামারীর ছয় মাস শেষে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সংক্রমণ পরিস্থিতি। গত এক সপ্তাহে বিশে্ব রেকর্ড সংখ্যক মানুষের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশেও ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে করোনার প্রাদুর্ভাব। গত এক সপ্তাহে সারাবিশে্ব দৈনিক প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের পর ২৪ এপ্রিল একদিনে সর্বোচ্চ এক লাখ দুই হাজার মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। আর গত ২৬ জুন একদিনে প্রায় এক লাখ ৯৬ হাজার মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দেশে লকডাউন (অবরুদ্ধ) শিথিল করা, নাগরিকদের চলাফেরায় আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, রোগী শনাক্তে বিলম্ব করা এবং স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণেই করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি ও ওয়াল্ডওমিটারের করোনা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৩ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত সাত দিনেই সারাবিশে্ব ১২ লাখ ১৭ হাজার ৭৩ জনের করোনা শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে গত এপ্রিলের তুলনায় বিশে্ব করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে।

সর্বশেষ এক সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুন বিশে্ব শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯৮৫ জন করোনা রোগী। এর আগে ২৮ জুন এক লাখ ৬৪ হাজার ৩২৬ জন, ২৭ জুন ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯৮৪ জন, ২৬ জুন ১ লাখ ৯৫ হাজার ৮৯ জন, ২৫ জুন ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৩৭ জন, ২৪ জুন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৪ জন এবং ২৩ জুন ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৫৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।

আর গত ২৯ জুনে সারাবিশে্ব করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৪১৫ জনের। এর আগে ২৮ জুন ৩ হাজার ৪৬৭ জনের, ২৭ জুন ৪ হাজার ৫৫৬ জনের, ২৬ জুন ৪ হাজার ৮৪৩ জনের, ২৫ জুন ৫ হাজার ১৬৮ জনের, ২৪ জুন ৫ হাজার ৪৪ জনের এবং ২৩ জুন ৫ হাজার ৪৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে প্রথম পর্যায়ে চূড়ান্ত সংক্রমণের সময় গত ২৪ এপ্রিল একদিনে সারাবিশে্ব শনাক্ত হয়েছিল ১ লাখ ২ হাজার ১২১ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৬ হাজার ৪০৯ জনের। এর আগে ২৩ এপ্রিল শনাক্ত ৮৫ হাজার ১৯৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৬ হাজার ৭৬৮ জনের, ২২ এপ্রিল ৮০ হাজার ৪০৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৬ হাজার ৬৫৩ জনের, ২১ এপ্রিল ৭৫ হাজার ৭৪৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৭ হাজার ২২৬ জনের, ২০ এপ্রিল শনাক্ত হয়েছিল ৭৩ হাজার ৭৮২ জন এবং করোনা মৃত্যু হয়েছিল ৫ হাজার ৫৬১ জনের।

দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের চলমান ঊর্ধ্বগতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। সাধারণ ছুটি বাতিল করা, সবকিছু উন্মুক্ত করা এবং নাগরিকদের চলাফেরা স্বাভাবিক করার কারণেই দেশে সংক্রমণ বাড়ছে। তাছাড়া বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানেও করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রায় সবদিকেই ভারতের সীমান্ত থাকায় ভারতে সংক্রমণের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘দেশে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। এখন করোনা শনাক্তে টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশনে বা কোয়ারেন্টিনে নিতে হবে। নাগরিকদের আরও বেশি সচেতন করতে হবে।’

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেসাস গত ২৯ জুন এক ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘করোনার সংক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার সঠিক পদক্ষেপ না নিলে আরও বেশি মানুষ করোনাভাইরাসের শিকার হবে।’

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এখনও আসেনি-মন্তব্য করে তেদরোস আধানম গেব্রেসাস বলেন, ‘ছয় মাস আগে চীনের উহান শহরে রহস্যময় নিউমোনিয়ার মতো অসুস্থতার খবর যখন পাওয়া যায় তখন যে আশঙ্কা করা হয়েছিল এখন পরিস্থিতি তারচেয়ে অনেক বেশি খারাপ। বিশ্বের প্রতিটি দেশকে তার মানুষকে রক্ষা করতে সঠিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনা ঠেকাতে দরকার পরীক্ষা, শনাক্ত, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিন। আমরা চাই চলমান পরিস্থিতির অবসান হোক। আমরা চাই প্রতিটি জীবন বাঁচুক। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে এ পরিস্থিতির অবসান হচ্ছে না। বেশিরভাগ মানুষ এখনও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় এখনও ভাইরাসটির বিস্তারের যথেষ্ট সুযোগ আছে। আমরা সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই। কিন্তু কঠিন সত্য হলো এটা অবসানের কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।

বিশ্বের কয়েকটি দেশ কিছুটা উন্নতি করলেও সত্যিকার অর্থে মহামারীর গতি বাড়ছে-এমন মন্তব্য করে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার প্রধান বলেন, ‘বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু সত্য হলো সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এখনও আসেনি।’

চীনে উহান শহরে গত ৩১ ডিসেম্বর প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। বিশে্বর ২১৫টি দেশ ও অঞ্চল প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। চীন থেকে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে। প্রথম পর্যায়ে গত মার্চের শেষের দিক থেকে এপ্রিল নাগাদ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুও হয়। গত ১৭ এপ্রিল বিশে্ব একদিনে সর্বোচ্চ আট ৪৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে গত ২৪ এপ্রিল একদিনে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২ হাজার ২১ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। ইউরোপের দেশগুলোতে করোনার প্রাদুর্ভাব এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ইউরোপে সংক্রমণের ‘পিক টাইমে’ (চূড়ান্ত পর্যায়) করোনার সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী রূপ প্রকাশ পায় যুক্তরাষ্ট্রে, সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও সংক্রমণ দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, পেরু, মেক্সিকো, বলিভিয়া ও চিলিতে সংক্রমণ এখন ঊর্ধ্বমুখী। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় রয়েছে।

একইসঙ্গে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ও আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশে এতদিন করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে সম্প্রতি সংক্রমণ ব্যাপক হারে বাড়ছে।

ফের বাড়ছে সংক্রমণ বিভিন্ন দেশে

সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ কঠোর লকডাউন ও এ সংক্রান্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে করোনা পরিস্থিতি বেশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। পরবর্তীতে গত এপ্রিল ও মে পর্যন্ত ওইসব দেশে করোনা সংক্রমণ খুব বেশি বৃদ্ধি পায়নি। কিন্তু লকডাউন তুলে নেয়া বা জনগণের চলাফেরায় আরোপিত বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করায় সম্প্রতি ওইসব দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে।

ওয়ার্ল্ডওমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৯৩ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত এবং ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনে ৭০৬ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত এবং ১২ জনের মৃত্যু, ওমানে ১ হাজার ১০ জনের সংক্রমণ শনাক্ত এবং সাতজনের মৃত্যু, ফিলিপাইনসে ১ হাজার ৭৬ জনের করোনা শনাক্ত এবং ১১ জনের মৃত্যু, নেপালে ৩১৬ জনের করোনা শনাক্ত, পোলান্ডে ২৩৯ জনের করোনা শনাক্ত এবং ৩৯ জনের মৃত্যু, রুমানিয়ায় ৩৮৮ জনের করোনা শনাক্ত এবং ১৭ জনের মৃত্যু, আর্মেনিয়ায় ৪১৫ জনের করোনা শনাক্ত এবং ১৫ জনের মৃত্যু, কাজাখস্তানে ৪৯২ জনের করোনা শনাক্ত, হুন্ডুরাসে ৭৩৬ জনের করোনা শনাক্ত ও ছয়জনের মৃত্যু, গুয়াতেমালায় ৪৭৯ জনের করোনা শনাক্ত এবং ১৯ জনের মৃত্যু, এল সালভাদরে ২৬৫ জনের করোনা শনাক্ত এবং ১০ জনের মৃত্যু, কিজিকিস্তানে ২৭৯ জনের করোনা শনাক্ত এবং সাতজনের মৃত্যু, ফেলেস্টাইনে ২০৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, উজবেকিস্তান, হাঙ্গেরি, মালাউ, আফ্রিকার দেশ বেনিন, মাদাগাসকার, আলবেনিয়া, হাইতি, সেনেগাল, মরক্কো, দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েল, আফগানিস্তান, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও সিঙ্গাপুরে কিছুদিন ধরে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে।

বিশে্ব গতকাল পর্যন্ত ১ কোটি ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৫৩২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে সারাবিশে্ব করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৫ লাখ ৮ হাজার ৮১০ জনের। সবচেয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হয়েছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। মৃত্যুও হয়েছে দেশটিতে সর্বোচ্চ। গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ লাখ ৮২ হাজার ১১ জনের করোনা শনাক্ত এবং মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭৮৮ জনের।

দক্ষিণ এশিয়ায়ও ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ

গত কিছুদিন ধরে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় রয়েছে। ভারতে গতকাল পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৮ হাজার ৫২২ জনের করোনা শনাক্ত এবং ৫২২ জনের মৃত্যু, বাংলাদেশে ৩ হাজার ৬৮২ জনের করোনা শনাক্ত এবং ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানে ২ হাজার ৮২৫ জনের করোনা শনাক্ত এবং ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংক্রমণের শীর্ষ তালিকায় ভারতের অবস্থান চতুর্থ, পাকিস্তানের অবস্থান ১২তম এবং বাংলাদেশ ১৭তম অবস্থানে রয়েছে।