• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৩০ মহররম ১৪৪২, ০২ আশ্বিন ১৪২৭

করোনা চিকিৎসা

ভেঙে পড়েছে অন্য রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে চালু না করলে অবনতি হতে পারে

সংবাদ :
  • বাকী বিল্লাহ

| ঢাকা , সোমবার, ০৪ মে ২০২০

করোনাভাইরাসের চিকিৎসার কারণে দেশের হাসপাতালগুলোতে অন্য রোগের (নন-কোভিড) চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অন্য রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক রোগী এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ব্রেন স্ট্রোক, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, গাইনি সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগ এবং জরুরি অপারেশনের রোগীদের অনেক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীরা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হতে পারছেন না। প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে অচলাবস্থা আরও বেশি। হাসপাতালগুলোতে অনেক রোগী করোনায় আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত না হওয়ার কারণে ভর্তি করা হয় না। করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে সে আশঙ্কায় অনেক রোগীকে হাসপাতালের গেট থেকে বিদায় করে দেয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাস সহজে শেষ হবে না। তাই করোনা রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি অন্য রোগের চিকিৎসা ও অপারেশন করতে হবে। এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দ্রুত এ পরিকল্পনা নিয়ে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে হবে। অন্যদিকে অপারেশন করার জন্য অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নিয়োগ দেয়া দরকার। তা না হলে অপারেশন প্রক্রিয়া চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ বেশিরভাগ অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউতে করোনা রোগীর চিকিৎসায় জড়িত। করোনা ও লকডাউনসহ নানা কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাধিক সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে প্রফেসর ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, করোনা রোগীর কারণে দেশের হাসপাতালগুলোতে কিছু জরুরি অপারেশন ছাড়া নিয়মিত রুটিন অপারেশন বন্ধ রয়েছে। সিজার অপারেশনসহ কিছু জরুরি অপারেশন করা হলেও অন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। করোনা রোগীর মিথ্যা তথ্য দেয়া, ডাক্তার আক্রান্ত হওয়া এমনকি অনেকে ভয়েও হাসপাতালে জরুরি ও বহির্বিভাগে যাচ্ছে না। ফলে বহিঃবিভাগগুলোতে এখন রোগীর সংখ্যাও কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ অ্যান্ড নন-কোভিড-১৯ এক সঙ্গে চিকিৎসা করতে হবে। এখন নন-কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ রয়েছে। সব জনবল করোনা রোগের চিকিৎসায় লাগানো হয়েছে। আবার করোনা চিকিৎসা করতে গিয়ে ডাক্তার আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। নতুন করে ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তারাও করোনা রোগীর চিকিৎসা করছে। এখন স্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ফিরে আনার জন্য অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক দরকার।

সূত্র মতে, যেহেতু করোনা রোগী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থা সহজেই দূর হবে না। তাই স্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে কোভিড-১৯ আলাদা হাসপাতালে রোগী গেলে চিকিৎসা দিবে। সে ব্যবস্থাও প্রয়োজনে করোনা রোগীদের পাশাপাশি অন্য রোগের জরুরি অপারেশন চালু করতে হবে। তা না হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় গভীর সংকট সৃষ্টি হবে। তাই এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

মহাখালী রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, ডাক্তার ও নার্সরা রোগী দেখার সময় সংক্রমিত হওয়ায় ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ক্রনিক ডিজিজের চিকিৎসায় সমস্যা হচ্ছে। অনেকেই রোগী দেখতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন, রোগী ফেরত দিচ্ছেন। তিনি বলেন, সম্ভব্য করোনা রোগী মনে হলে পিপিই ও মাস্ক পড়ে চিকিৎসকরা নিয়ম মেনে চিকিৎসা দিতে হবে। যাদের মৃদু লক্ষ্মণ আছে। তাদের হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে আইসোলেশনে রাখতে হবে। আর স্ক্র্যানিং টেস্টে ডাক্তারদের মাস্ক থাকতে হবে। ডাক্তার হোক ও নার্স হোক এন-৯৫ মাস্ক লাগবে। এখন সব ধরনের চিকিৎসাই ডাক্তারদের করতে হবে।

একজন সিনিয়ার ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে করোনা রোগীর ভয়ে এবং আতঙ্কের কারণে এখন অন্য রোগী দেখা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। একজন ডাক্তারের মৃত্যু ও সাড়ে ৫শ’ ডাক্তার আক্রান্ত হওয়ার পর এখন বহু ডাক্তার ও হাসপাতাল তার প্রাইভেট চেম্বার বা ক্লিনিকে রোগী দেখতে ভয় পান। অনেকেই চেম্বার ও ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছেন। পরিবার ও সন্তানরা চেম্বারে যেতে বাধা দিচ্ছে। আর অধিকাংশ প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগোনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা কমে গেছে। রোগী কমে যাওয়া ও আতংকের কারণে অনেক হাসপাতালে চিকিৎসা বন্ধ। ডাক্তারদের কিছু বেতন দিয়ে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছে। আর লকডাউনের কারণে ঢাকার বাইরের প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিকে সমস্যা হচ্ছে। সেখানে আগে ঢাকা থেকে ডাক্তার গিয়ে রোগী দেখত। এখন তাও বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারণে প্রায় সব হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কিছু প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী গেলে বেশি টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা গাইডলাইন দেয়া হচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানান।

এ সম্পর্কে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব প্রফেসর এমএ আজিজ বলেন, করোনার পাশাপাশি সাধারণ চিকিৎসাও করতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্পেশালাইজড হাসপাতালগুলোতে এখনই ব্যবস্থা করা দরকার বলে তিনি মনে করেন। কোভিড-১৯ হাসপাতাল আছে। আর নন-কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এ সম্পর্কে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি প্রফেসর ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, নন-কোভিড রোগীদের জন্য রাজধানীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালও খোলা আছে। এভাবে ঢাকা ছাড়াও ঢাকার বাইরে অন্য নন-কোভিড হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। সেসব জায়গায় রোগীরা যেতে পারেন। আর ডাক্তারও আছেন বলে তিনি জানান।