• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জিলকদ ১৪৪১

করোনাভাইরাস

ভিয়েতনামে সর্বশেষ আইসিইউ রোগীকে যেভাবে সারিয়ে তোলা হয়

    সংবাদ :
  • সংবাদ ডেস্ক
  • | ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

image

তিনি একজন স্কটিশ পাইলট। নাম স্টিভেন ক্যামেরন। বয়স ৪৩। ভেন্টিলেটরে ছিলেন ৬৮ দিন। পৃথিবীর কোন দেশেই সাধারণত কোন কোভিড-১৯ রোগীকে এতো লম্বা সময় ভেন্টিলেটর দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয় না। কিন্তু তাকে রাখা হয়েছিল কারণ তিনি ছিলেন ভিয়েতনামের হো চি মিন শহরে। এই দেশের জনসংখ্যা সাড়ে নয় কোটি। তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকশ’ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আইসিইউতে ভর্তি করাতে হয়েছে এমন রোগীর সংখ্যা ১০ জনেরও কম। আর সরকারি হিসেবে এই দেশে করোনাভাইরাসে একজন লোকেরও মৃত্যু হয়নি। সে কারণে স্টিভেন ক্যামেরনের সেরে ওঠার প্রত্যেক মিনিটের বিস্তারিত খবর প্রকাশিত হয়েছে ভিয়েতনামের জাতীয় সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সংবাদ বুলেটিনে। এই বিষয়ে গতকাল বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে মি. ক্যামেরন বলছিলেন, ‘আমি যদি পৃথিবীর অন্য যে কোন জায়গায় থাকতাম, আমি মারা যেতাম। ৩০ দিন পরেই তারা সুইচ বন্ধ করে দিত।’ মি. ক্যামেরন, যার পাশে এখনও কোন বন্ধু নেই, আত্মীয়স্বজনরাও কয়েক হাজার মাইল দূরে, তিনি ভিয়েতনামের কোন হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে বা আইসিইউতে থাকা শেষ কোভিড-১৯ রোগী। ভিয়েতনামে তিনি এখন পরিচিত ‘রোগী ৯১’ হিসেবে, যে নামটি তাকে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দিয়েছিলেন, গত মার্চ মাসে যখন তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনামের জনগণ যেভাবে আমাকে তাদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছে তাতে আমি ?কৃতজ্ঞ। আর সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে যারা চায়নি তাদের চোখের সামনে আমি মারা যাই।’

বাঁচার সম্ভাবনা ১০ শতাংশ

মি. ক্যামেরনের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে ভিয়েতনামের ইনটেনসিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত কনফারেন্স করেছেন। যেহেতু গুরুতর অসুস্থ রোগীর সংখ্যা কম তাই তারা দেশের সেরা সেরা ডাক্তারদের চিকিৎসা পেয়ে থাকেন,’ বলেন ড. কিদং পার্ক। তিনি ভিয়েতনামে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার একজন প্রতিনিধি। মি. ক্যামেরনকে আড়াই মাসের মতো সময় ওষুধের সাহায্যে অচেতন করে রাখা হয়েছিল। এর বেশিরভাগ সময় তিনি নির্ভর করতেন একমো নামেরি একটি মেশিনের ওপর। রোগীর অবস্থা একেবারে চরম পর্যায়ে পৌঁছালে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়। এই যন্ত্রটি রোগীর দেহ থেকে রক্ত বের করে নিয়ে তাতে অক্সিজেনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সেই রক্ত আবার রোগীর দেহে ফিরিয়ে দেয়।

‘দুটো পায়ে আমাকে ধরে রাখার মতো শক্তি ছিল না। দিনে আমাকে দু’বার ফিজিওথেরাপি দেয়া হতো। এক পর্যায়ে আমার এক বন্ধুকে ফরেন অফিস থেকে বলা হলো যে আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ১০ শতাংশ। সে কারণে সবচেয়ে খারাপ জিনিসের জন্য সে প্রস্তুত ছিল। সে আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিল এবং বাকশোতে করে কারও মৃতদেহ গেলে আর সবাই যা যা করে সেও সেরকম করতে লাগলো।’

মি. ক্যামেরন যখন কোমায় ছিলেন তখন তার শরীরে নানা রকমের সমস্যা দেখা দেয়। তার রক্ত আঠা আঠা হয়ে গিয়ে দলা বাঁধতে শুরু করে। তার কিডনি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে তার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়। এবং তার ফুসফুসের কাজের ক্ষমতাও ১০ শতাংশে নেমে আসে। ‘সংবাদ মাধ্যমে যখন এই খবরটা দেয়া হলো যে আমার ফুসফুস প্রতিস্থাপন করতে হবে তখন প্রচুর মানুষ এগিয়ে এল। তাদের মধ্যে ৭০ বছর বয়সী এক ভিয়েতনামী যোদ্ধাও ছিলেন।’

ভিয়েতনামের বহু মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, সমর্থন ও তার চিকিৎসায় হাজার হাজার ডলার ব্যয় করা সত্ত্বেও যখন পরীক্ষা করে জানা গেল মি. ক্যামেরন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, তখন তাকে তেমন কেউ সমর্থন করেনি।

যেভাবে আক্রান্ত হন

ফেব্রুয়ারি মাসে ভিয়েতনামে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বহু পশ্চিমা পাইলটের মতো তিনিও আরও বেশি বেতনের চাকরির জন্য ছুটে যান এশিয়ার এই দেশটিতে। দু’দিন পরেই তার ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের একটি বিমান চালানো শুরু করার কথা ছিল এবং করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে একরাত পরেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল হো চি মিন সিটির পানশালা। ওই রাতেই তিনি শহরের কেন্দ্রে প্রবাসীদের একটি পানশালায় ছুটে যান এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। সে সময় ভিয়েতনামের সরকারি হিসেবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ছিল ৫০ জনেরও কম। কিন্তু হো চি মিন সিটিতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ইউনিটের পরিচালক এবং সংক্রামক ব্যাধির বিষয়ে সরকারের একজন উপদেষ্টা প্রফেসর গাই থোয়াইটস বলেন, ‘ইতোমধ্যে এই ভাইরাসের ব্যাপারে ভীতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।’ মি. ক্যামেরন ‘বুদ্ধা বার অ্যান্ড গ্রিলে’ গিয়েছিলেন রাত দশটার পরে। তখন লোকে পূর্ণ ছিল সেই পানশালা। ‘আমি পান করি না, এক কোনায় বসেছিলাম, কিছুক্ষণ পুল খেলেছি এবং রাত সোয়া তিনটার দিকে বাড়িতে ফিরে যাই।’

প্রথম ফ্লাইটের পর দিন তার জ্বর আসে। এর পরের কয়েকদিনে ওই পাবে গিয়েছিলেন এরকম ১২ জনের শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন যা কিনা দক্ষিণ ভিয়েতনামে সবচেয়ে বড় প্রকোপের ঘটনা। এজন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে কেউ কেউ মি. ক্যামেরনকে দায়ী করেন, কারণ তিনি শহরে ঘুরে বেরিয়েছিলেন। এর পক্ষে কোন প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ‘রোগী ৯১’কে ‘টাইম বোমা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আইন ভঙ্গ করার অভিযোগে তাকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার কথাও বলা হয়। পুলিশ পানশালাটি খুলে দেয়ার আগে সেখানে কয়েকবার পরীক্ষা করে দেখেছে।

অবস্থার অবনতি

পরীক্ষায় করোনাভাইরাস নিশ্চিত হওয়ার পর ১৮ মার্চ স্টিভেন ক্যামেরনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গেই ওই বারটি বন্ধ করে দেয়। তার অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় কোয়ারেন্টিনে। এই বারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪,০০০ লোককে পরীক্ষা করা হয়। ভিয়েতনামে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোভিড-১৯ টাস্কফোর্সের সদস্য লুং এনজক খুয়ে বলেন, ‘রোগী ৯১-এর অবস্থার খুব দ্রুত অবনতি ঘটে। শুধু যে তার ফুসফুস কাজ করছিল না তা নয়, তার কিডনি, লিভার ও রক্ত চলাচলও ঠিক ছিল না।’ অবস্থার অবনতির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মি. ক্যামেরন অনুরোধ করেন তাকে ভেন্টিলেটরে দিতে। এরপর কয়েক সপ্তাহ তিনি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন। সে সময় ডাক্তাররা তাকে নানা রকমের চিকিৎসা দিতে থাকেন। এরমধ্যে আইসিইউতে থাকা অল্প কিছু রোগী সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যান। এর ফলে সবার কাছ থেকেই তিনি মনযোগ পেতে থাকেন। শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিকরা প্রতিশ্রুতি দেন তাকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেয়ার। প্রফেসর খুয়ে বলেন, সবাই- বিদেশি অথবা ভিয়েতনামী- ভালো সেবা পেয়েছেন। ‘অসুস্থ রোগীকে আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেছি, সুযোগ সুবিধা, প্রযুক্তি, ডাক্তার নার্স- সবকিছু দিয়েই।’ তিনি জানান, ৫০ জন বিদেশি রোগীর মধ্যে ৪৯ জনই সুস্থ হওয়ার পর তাদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়।

ভেন্টিলেটরে স্টিভেন

মি. ক্যামেরনকে এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে ভেন্টিলেটরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ততোদিনে সারাবিশ্বে ১০ লাখ কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়ে গেছে। ডাক্তাররা তাকে জ্ঞান ফিরিয়ে দেন ১২ জুন, সেদিন আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু ভিয়েতনাম এই ভাইরাসটি ঠেকাতে মোটামুটি সক্ষম হয়েছে। দেশটিতে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত কোন কমিউনিটি সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। ‘আমি কখনও ভাবিনি যে আমাকে ১০ সপ্তাহ পর ডেকে তোলা হবে। সেই জেগে ওঠার মুহূর্তটি আমি মনে করতে পারি। হুইল চেয়ারে করে আমাকে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তার পরের কয়েকদিন সবকিছু ঝাপসা মনে হতো।’ তিনি ২০ কেজি ওজন হারিয়েছেন। তার পেশিও দুর্বল হয়ে গেছে। মানসিকভাবেও তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।

‘স্কটল্যান্ডে ফিরতে চাই’

স্টিভেন ক্যামেরন বলেন, ‘আমি এখন বাড়িতে ফিরতে চাই। এখানে স্কুটারের প্রচ- শব্দ। আর বৃষ্টিও হচ্ছে। আমার নিজের দেশে তাপমাত্রা এখন ১৫ ডিগ্রি যা খুবই দারুণ।’ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে তার বেডের পাশে ডাক্তার ও নার্সদের ভিড় লেগেছিল। তাকে দেখতে এসেছিলেন উচ্চ পদস্থ কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনীতিবিদরাও। শহরের মেয়রও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে মি. ক্যামেরন শীঘ্রই ‘ইংল্যান্ডে’ ফিরে যাবেন। ‘আমি তাকে বলেছিলাম যে আমাকে ইংল্যান্ডে ছুঁড়ে ফেলা হলে খুশি হবো না। আমি স্কটল্যান্ডে নিজের বাড়িতে ফিরতে চাই।’ স্টিভেন ক্যামেরনের চিকিৎসা ফ্রি ছিল না। একটি একমো মেশিন একদিন চালাতে খরচ হয় পাঁচ থেকে দশ হাজার ডলার। এই যন্ত্রটির ওপর তিনি নির্ভরশীল ছিলেন সাড়ে আট সপ্তাহ। ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মি. ক্যামেরন ব্রিটেনে ফিরে আসবেন ১২ জুলাই। কিন্তু তিনি আরও আগেই ফিরতে চান। ‘যেহেতু ভিয়েতনামের সবাই এখন আমাকে চেনে, তাই আমার সবকিছুই সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে।’ স্টিভেন ক্যামেরনের এই গল্প যে শুধু একজন কোভিড-১৯ রোগীর সেরে ওঠার কাহিনী তা নয়, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ ভিয়েতনামের সমস্যা-সংকুল ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও করোনাভাইরাস মহামারী জয়ের গল্পও।