• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ মহররম ১৪৪২, ১১ আশ্বিন ১৪২৭

ঈদে বাড়ি যাওয়া

ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে করোনা

ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়া ঠেকাতে কঠোর ডিএমপি

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন

| ঢাকা , সোমবার, ১৮ মে ২০২০

image

ঈদে ঢাকা ছাড়ছে বাড়িমুখো মানুষ। ঘাটে ঘাটে উপচেপড়া ভিড়। শিবচর-কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে তোলা -সংবাদ

করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে এবার ঈদের এক সপ্তাহ আগেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন মানুষ। এতে ব্যাপকভাবে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায়ে পিকআপ ভ্যান, ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেট গাড়ি, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, মাইক্রোবাস, অটোরিকশায় করে গ্রামমুখী হচ্ছে মানুষ। তবে ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়া ঠেকাতে ফের কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঈদে কাউকে গ্রামে যেতে দেয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও গতকাল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডের কাঁচপুর ব্রিজ, গাবতলী ঘাট, ঢাকা-গাজীপুর ও টঙ্গী সড়ক দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে রাজধানী ছাড়তে দেখা গেছে। ঈদের আগে ‘লকডাউন’ কার্যকরে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হতে পারে- এই আশঙ্কায় নগরবাসী আগাম ঢাকা ত্যাগ করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের প্রধান কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদকে বলেন, ‘বিভিন্ন মহলের তদবিরের কারণেই কিছু কিছু মানুষকে ঢাকায় প্রবেশ ও ঢাকা ছাড়তে দেয়া হচ্ছে। শক্তি প্রয়োগ করে সবাইকে ঢেকানো যাচ্ছে না। তবে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে এখন থেকে পুলিশ আরও বেশি তৎপর ও কঠোর হবে।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পিকআপ ভ্যান ও ট্রাকসহ কিছু পণ্যবাহী পরিবহন ঢাকায় পণ্য সরবরাহ শেষে যাত্রী নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করছে। এবার এসব পরিবহনের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’

সাধারণ ছুটি ও ‘লকডাউনে’ রাজধানীতে প্রবেশ ও ছেড়ে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঈদের আগে ঢাকা ছাড়ার হিড়িক পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও সড়ক ও নৌপথে স্রোতের বেগে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে মানুষ। কেউই সরকারি বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করছেন না। এর ফলে মহামারী করোনা প্রতিরোধে ‘সামাজিক দূরত্ব’ প্রতিপালন ও নাগরিকদের ঘরে থাকা বা রাখার সিদ্ধান্তও ভেস্তে যাচ্ছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের জটলা দেখা গেছে। কোথাও কোথাও যানজটও ছিল।

আবার পুলিশ বিভাগের প্রায় আড়াই হাজার সদস্যের ইতোমধ্যে করোনা শনাক্ত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে পুলিশের মধ্যেও আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাদের অনেকেই এখন অতিমাত্রায় ঝুঁকি নিয়ে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নিশ্চিত করা ও নাগরিকদের ঘরে রাখার নির্দেশনা পালনে কঠোর হতে দেখা যাচ্ছে না। এই সুযোগে ঈদের এক সপ্তাহ আগেই ¯স্রোতের বেগে রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছেন মানুষ।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে মানুষের গ্রামমুখী প্রবণতার কারণে করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, দেশের করোনা আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের। এই শহর থেকেই অনেকেই নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। এতে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও করোনার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগামী ২৫ মে ঈদ হতে পারে। ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ৩০ মে পর্যন্ত চলমান সাধারণ ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে সরকার। এ সংক্রান্ত সরকারি আদেশে বলা হয়েছিল, সাধারণ ছুটি এবং চলাচল নিষেধাজ্ঞাকালে এক জেলা থেকে অন্য জেলা বা এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় জনসাধারণের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। জেলা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় এ নিয়ন্ত্রণ সতর্কভাবে বাস্তবায়ন করবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে জনগণকে অবশ্যই ঘরে অবস্থান করতে হবে। রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অতীব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, ওষুধ কেনা, চিকিৎসা নেয়া, মৃতদেহ দাফন বা সৎকার করা, ইত্যাদি) কোনভাবেই বাড়ির বাইরে আসা যাবে না। এই নিষেধাজ্ঞা থাকাকালে জনসাধারণ ও সব কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই চলমান ‘লকডাউন’ আরও কঠোর হতে পারে-এমন আশঙ্কায় অনেকে আগভাগেই ঢাকা ছাড়ছেন। ঢাকা থেকে গতকাল সকালে কিশোরগঞ্জে রওয়ানা হওয়া মোস্তাক হোসেন বলেন, ‘আমি একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করি। করোনার কারণে বেতন ঠিকমতো হচ্ছে না। চাকরিও ঝুঁকিতে। এখন ঢাকায় থাকলে ঋণের বোঝা বাড়বে। তাছাড়া সাধারণ ছুটি কখন শেষ হয় সেটাও অনিশ্চিত। একটি ফ্ল্যাটে কতদিন আটকে থাকা যায়? এজন্য আগাম গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছি। যাত্রাপথে করোনার ঝুঁকি আছে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই সেই ভোগান্তিও আছে, সেটা মাথায় নিয়েই ভেঙ্গে ভেঙ্গে ছোট পরিবহনে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি।’

স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সংক্রমণ আরও বাড়বে- স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল রাজধানীর বসুন্ধরায় ২০১৩ শয্যার করোনা হাসপাতাল উদ্বোধন করে বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সংক্রমণ আরও বাড়বে। যানবাহন থেকে শুরু করে সব খানে স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই বাড়ছে করোনা সংক্রমণ।’

এজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রিকশা, সিএনজি থেকে জটলা করে করোনা ছড়ায়। ফেরিঘাট, দোকানের সামনে জটলা দেখে আমরা আতঙ্কিত হই। কারণ এতে সংক্রমণ বাড়ে। আর বাড়ছেও।’

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। দেশে করোনায় আক্রান্ত প্রথম রোগীর মৃত্যু হয় গত ১৮ মার্চ। গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট ২২ হাজার ২৬৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর সরকারি হিসেবে, করোনায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩২৮ জন।

আরও কঠোর হচ্ছে পুলিশ

এদিকে একান্ত জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ঢাকা শহরে প্রবেশ বা এখান থেকে বাইরে বের হতে পারবে না কেউ। করোনা প্রতিরোধে নাগরিকদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আবারও কঠোর হওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

ডিএমপি জানিয়েছে, গতকাল থেকে ঢাকা মহানগরীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে চেকপোস্ট ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে কোন ব্যক্তি একান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঢাকায় প্রবেশ বা ঢাকা থেকে বাইরে যেতে পারবেন না। তবে জরুরি সেবা ও পণ্য সরবরাহ কাজে নিয়োজিত যানবাহনসমূহ এই নিয়ন্ত্রণের আওতামুক্ত থাকবে। যথোপযুক্ত কারণ ছাড়া কোন ব্যক্তি যানবাহন ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। মহামারী প্রতিরোধে এই নিয়ন্ত্রিত চলাচলের ক্ষেত্রে নাগরিকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

ঈদ উপলক্ষে ও সরকার ঘোষিত বর্ধিত ছুটি উদযাপনের জন্য অনেকেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন জানিয়ে পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘এটি কোনভাবেই হতে দেয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সবাইকে অনুসরণ করতে হবে।’ তিনি গতকাল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে এ কথা বলেন।

পুলিশের মহাপরিদর্শক সংশ্লিষ্ট সব পুলিশ কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে আরও বলেন, ‘সরকারের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত যেন কোনভাবেই ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় এবং ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে কেউ যেতে না পারে। একইভাবে প্রতিটি জেলা ও মহানগরীও জনস্বার্থে কঠোরভাবে এ বিষয়টি বাস্তবায়ন করবে।’ এছাড়া শপিংমল ও মার্কেটগুলো যেন যথাযথ নিয়ম-কানুন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখা হয় সেটি নিশ্চিত করতে বলেন তিনি। আইজিপি সবক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন।

নৌরুটে উপচেপড়া ভিড়

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারাদেশে লঞ্চ, স্পিডবোট বন্ধ থাকায় মাদারীপুরের শিবচরের শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটের ফেরিতে গত কিছুদিন ধরেই যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। গতকাল থেকে ঘরমুখো দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীর চাপ আরও বেড়েছে।

নৌঘাটে ফেরি ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল সংখ্যক যাত্রী গাদাগাদি করে নামছে। সামাজিক দূরত্ব পালনের ন্যূনতম লক্ষণ দেখা যায়নি। সবাই গাদাগাদি করে পারাপার হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা শিথিল থাকায় ঘাটে যানবাহনের চাপ বাড়ছে। নদীর দুই পাড়ে শতাধিক যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় থাকে। তবে ঘাটে গণপরিবহন অর্থাৎ বাস বা মাইক্রোবাস ছিল না।

এতে দক্ষিণাঞ্চলের দূরপাল্লার যাত্রীদের বরিশাল-পটুয়াখালী যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকযোগে যেতে হয়, ভাড়াও দ্বিগুণ গুনতে হয়। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই দ্বিগুণ, তিনগুণ টাকা খরচ করে রাজধানী থেকে বরিশাল, খুলনা, ভোলা, গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ছুটছে মানুষ।