• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪১

ব্যাংক ঋণে নির্ভরতা বেড়েছে : কড়াকড়ি সঞ্চয়পত্রে

সংবাদ :
  • রোকন মাহমুদ

| ঢাকা , বুধবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • চাপে পড়েছে সরকারি খাত
  • সঞ্চয়পত্র বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে
  • রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শ বিশ্লেষকদের

সুদের ওপর কর বৃদ্ধি ও টিআইএন বাধ্যতামূলক করাসহ নিয়মের অস্বাভাবিক কড়াকড়ির কারণে সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ অর্ধেকে নেমেছে। সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। তা অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮ শতাংশ। অথচ গত বছর একই সময় ৫ হাজার ৩৬ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছিল। তা ওই বছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মোট লক্ষ্যমাত্রার ১৯ শতাংশের উপরে। বিপরীতে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের নির্ভরতা বাড়িয়েছে সরকার। অর্থবছরের প্রথম ৫৫ দিনেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। তা চলতি অর্থবছরে বাজেটের নির্ধারিত মোট লক্ষ্যের অর্ধেক। একই সঙ্গে আগের অর্থবছরে মোট ঋণের প্রায় সমান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাত থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। এর প্রমাণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ। তবে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিলে সরকারের সুদ দিতে হবে বেশি। তাই সরকারের উচিত ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো।

সঞ্চয়পত্র থেকে ধার : সরকারের নানা নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপে নতুন অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম মাসেই কমে এসেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। আগের বছরে জুলাইয়ের চেয়ে এই বছর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ অর্ধেকে নেমে এসেছে। জুলাইয়ে ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। আগের বছরে (২০১৮) জুলাইয়ে ৫ হাজার ৩৬ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। তা ২০১৯ সালের জুলাইয়ের চেয়ে ২ হাজর ৮৭৬ কোটি টাকা বেশি গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। এর আগের মাসে বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ধার করার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু সরকার এই খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। তা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিক্রি বাড়তে থাকায় সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ঠিক করা হয়।

উৎসে কর বেড়ে যাওয়া, টিআইএন বাধ্যতামূলক হওয়া ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্র কিনতে এখন সবারই টিআইএন লাগে। এছাড়া আরও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এতে সাধারণ মানুষ আর সঞ্চয়ত্র কিনতে পারছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে গিয়ে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া উৎসে করও বাড়ানো হয়েছে। আবার ব্যাংক আমানতে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ব্যাংকের দিকে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে গেছে। অন্যদিকে ব্যাংকে আমানত বেড়ে যাচ্ছে।

ব্যাংক মালিকদের অনুরোধে সরকার সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমাতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়। এই অর্থবছরে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া এক লাখ টাকার বেশি মূল্যমানের সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই ব্যক্তির একাধিক জায়গা থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা ঠেকাতেও নেয়া হয় পদক্ষেপ।

বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের চালু করা চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এগুলো হলো ৫ বছরমেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র, ৫ বছরমেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্র, ৫ বছরমেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও তিন বছরমেয়াদি তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এগুলোর গড় সুদের হার ১১ শতাংশের বেশি। বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৫ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮, ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ : চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৫৫ দিনেই (১ মাস ২৫ দিন) ২৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। অথচ গত পুরো অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। গত কয়েকটি অর্থবছরের মধ্যে তা সর্বোচ্চ। ওই বছর বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্য ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। তা পরে সংশোধিত বাজেটে ৩০ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা করা হয়। এভাবে চলতে থাকলে অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি ঋণ সরকারের হিসাবে যোগ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চলতি অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এ পর্যন্ত নেয়া ঋণের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে ৪ হাজার ৮৭৯ কোটি ও বাণিজ্যিক ব্যাংক ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নেয়া ঋণের মধ্যে ১০ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দিয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। সরকারের ঋণের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ না করলে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট আরও বাড়ত। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে গত জুন শেষে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩৩ হাজার ৯৭৯ কোটি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৮০ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতে প্রভাব : ইব্রাহিম খালেদের মতে- সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে ব্যপক হারে ঋণ নেয়, তাহলে তা বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। তা গত ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে গত অর্থবছর (জুলাই-জুন) শেষে ব্যাংকের তারল্যের টানাটানি, ঋণের উচ্চ সুদহারসহ নানা কারণে কমেছিল বেসরকারি খাতের ঋণ। ওই সময় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ১১ দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। এ হার ২০১৩ সালের জুনের পর সর্বনিম্ন। ওই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

জানা গেছে, সব মিলিয়ে নজিরবিহীন তারল্য সংকটে ভুগছে দেশের কিছু ব্যাংক। কোন কোন ব্যাংকের প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থও নেই। তবে ঋণ বিতরণে পিছিয়ে থাকায় সরকারি ব্যাংকগুলোয় কিছু নগদ অর্থ রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থ রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। মূলত আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ, ডলার সংকট, আমানত সংগ্রহ করতে না পারা ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কয়েক মাস ধরে কোন কোন ব্যাংক ১৪ শতাংশের বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে। অধিকাংশ ব্যাংক আমানত বাড়াতে অনেক কর্মকর্তাকে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে। কোন কোন ব্যাংক ৫ বছরে টাকা দ্বিগুণ করার আশ্বাসে আমানত সংগ্রহ করছে।