• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ সফর ১৪৪১

জলবায়ুর বৈরী প্রভাব

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নাটকীয় পরিবর্তনের আশঙ্কা

বড় বড় শহরে বিরূপ প্রভাব পড়বে, ভূগর্ভস্থ পানি ফুরিয়ে যাবে

সংবাদ :
  • এস এম জাকির হোসাইন

| ঢাকা , শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নাটকীয় পরিবর্তনের অশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে মাদ্রিদে যেমন উষ্ণতা বিরাজমান, ঠিক একই রকম অবস্থা ২০৫০ সাল নাগাদ দেখা যেতে পারে লন্ডনেও। একই সময়ে বর্তমানে ক্যানবেরার মতো অবস্থা হতে পারে প্যারিসের। বুডাপেস্টের মতো অবস্থা হবে স্কটহোমের। সোফিয়ার মতো অবস্থা হবে মস্কোর। গত বুধবার প্রকাশিত নতুন এক জলবায়ু বিষয়ক বিশ্লেষণে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের জলবায়ু ২০৫০ সাল নাগাদ কেমন হবে তার একটি ধারণা দেয়া হয়েছে। এদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সম্প্রতি ভারতে পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভারতের অর্থনীতিতেও। সম্প্রতি দেশটির সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিটি আয়োগ এ নিয়ে একটি সতর্ক বার্তা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে আগামী ১ বছরের মধ্যে ভারতের রাজধানীসহ প্রায় ২১টি শহরে ভূগর্ভস্থ পানি ফুরিয়ে যাবে। জলবায়ুর এ পরিবর্তনের কারণে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের মোট জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ হারাতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নেপালের জলবায়ুর জন্য বৈরি অদৃশ্য গাছ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অদৃশ্য গাছ তাপমাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নেপাল ইতিমধ্যে সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর মধ্যে একটি। সম্প্রতি এক গবেষণায় এমন তথ্য ওঠে এসেছে। সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর লাইফ সায়েন্সেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের গবেষক উত্তম বাবু শ্রেষ্ঠ ও ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় বোটানি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ভরত বাবু শ্রেষ্ঠ যৌথভাবে এই গবেষণা করেন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এর প্রভাব ভবিষ্যতে উচ্চ পর্যায়ের পর্বত অঞ্চলের দিকে বিস্তৃত হবে। পর্যটন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে অবকাঠামোর উন্নয়নে ভূমির ব্যাপক ব্যবহার, ভূমির রূপান্তর এবং পরিবর্তনের জন্য এমনটি হবে। যার ফলে এর প্রভাব স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপরও পড়বে।

এদিকে বুধবার প্রকাশিত ৫২০টি বড় শহরের ওপর নতুন জলবায়ু বিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কুয়ালালামপুর, জাকার্তা ও সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বের বড় সব গ্রীষ্ম ম-লীয় শহরগুলোতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে। সেখানে দেখা দেবে অনাকাক্সিক্ষত জলবায়ু বিষয়ক অবস্থা। এর ফলে দেখা দিতে পারে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া। আর তীব্র খরা দেখা দিতে পারে। ইটিএইচ জুরিখ-এর বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের এ গবেষণা বুধবার প্রকাশিত হয়েছে প্লোস ওয়ান-এ। এ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১৯টি ভেরিয়েব্যল বা নির্ণায়ক ব্যবহার করে বিশ্বের ৫২০টি বড় শহরের ওপর এ গবেষণা করেছেন। এসব নির্ণায়ক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনশীলতার প্রতিফলন ঘটায়।

সুপ্রতিষ্ঠিত মডেল, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক আশাবাদ রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যত সম্পর্কে অভিক্ষেপ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো গ্রিন পলিসি বা পরিবেশ বান্ধব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন স্থিতিশীল পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে। এ সময়ে গড়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি থাকবে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর বিজ্ঞানীদের টিমটি বর্তমান ও ভবিষ্যত শহরগুলোর মধ্যে একই রকম জলবায়ুর তুলনা করেছেন। সে অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ উত্তর গোলার্ধের শহরগুলো ওইসব শহরের মতো হবে। যা বিষুবরেখা থেকে কমপক্ষে ১ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। তবে বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা শহরগুলোতে উষ্ণতার নাটকীয় কোন পরিবর্তন দেখা যাবে না। তবে সেখানে চরমভাবাপন্ন খরা অথবা অতি বৃষ্টিপাত দেখা দেবে।

এ গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বের শতকরা ৭৭ ভাগ শহরে জলবায়ু পরিবর্তনে আকর্ষণীয় পরিবর্তন দেখা দেবে। অন্যদিকে শতকরা ২২ ভাগ শহরে দেখা দেবে অভূতপূর্ব পরিবেশ। এর অর্থ হলো, এর আগে এমন অবস্থা আর দেখা যায়নি কখনও। ইউরোপে গ্রীষ্মকাল ও শীতকাল হয়ে ওঠবে আরও উষ্ণ। গড় তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে বৃদ্ধি পাবে ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে ৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও গবেষণার এই মডেল নতুন নয়, তবু এসব করা হয়েছে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে নীতি গ্রহণকে উৎসাহিত করতে। গবেষণার প্রধান লেখক জ্যাঁ ফ্রাঁসিস ব্যাস্টিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে কি ঘটতে যাচ্ছে সে বিষয়ে সবাইকে অবহিত করার চেষ্টা এটা। আর এর মধ্য দিয়ে সঠিক পথ বেছে নিতে উৎসাহিত করা। জ্যাঁ ফ্রাঁসিস ব্যাস্টিনের বাড়ি বেলজিয়ামে। তিনি বলেন, ২০৬০ সাল নাগাদ তার দেশে শীতকালে শূন্য ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা নেমে যাবে এমনটা নিশ্চিত নয়।

সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ঢাকা মিটিং অব দ্য গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’-এর অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, জলবায়ু অভিযোজনে বাংলাদেশ শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। একই সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ‘অলৌকিক’ উল্লেখ করেছেন তিনি ।

একই অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের সিইও ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সামনের দিকে বাংলাদেশ।

ওই অনুষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে এর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বসম্প্রদায়কে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কিভাবে কাজ করা যায় সে দিকনির্দেশনাও দেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। বর্তমানে এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সবাই সহজে কাজে লাগাতে পারি। অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে জন্য সুষ্ঠু প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপ ও কৌশল সম্পর্কে বান কি মুন বলেন, অবশ্যই আমরা এখানে বাংলাদেশের কাছে শিখতে এসেছি। অভিযোজনের বিষয়ে শেখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ফনীতে ১২ জনের প্রাণহানির সঙ্গে পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণ নেয়া ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তুলনা করেন বান কি মুন। তিনি বলেন, যথার্থ আবহাওয়া পূর্বাভাস, কমিউনিটিভিত্তিক পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও সাইক্লোন শেল্টার থাকার ফলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই ১৬ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। অভিযোজন অনুশীলনে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার যে নেতৃত্ব অর্জন করেছে তা অলৌকিকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যে প্রজ্ঞা ও কার্যকারিতার উদাহরণ দেখিয়েছে, তা আমাদের সবাইকে অনুপ্রেরণা জোগায়। অভিযোজনের প্রসঙ্গ যখন আসে তখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের অগ্রভাগে থাকা আমাদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরা তাদের দুয়ার খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় বিশ্বের বাকি দেশের অনেক কিছু শেখার আছে। এভাবেই অভিযোজনের বিষয়ে শেখার জন্য বাংলাদেশ সর্বশ্রেষ্ঠ। ২০০৯ সালে জাতীয় অভিযোজনের কর্মপরিকল্পনা সৃষ্টি করে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হয়েছিল। আমরা ঢাকায় একটা অভিযোজন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ১০ দিন আগে আমরা চীনের বেইজিংয়ে একটি অভিযোজন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছি।

আগামী সেপ্টেম্বরে ক্লাইমেট চেঞ্জ সামিটে প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। ওই সভায় এলডিসিভুক্ত দেশসমূহ এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ উল্লেখ করে ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উপরে পৌঁছেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এডিবির জলবায়ু এবং অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আমাদের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ কমে যাবে। যদি বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যাবে।

এদিকে বাংলাদেশে জলবায়ুর প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার মানুষের জন্য সম্প্রতি সরকার ও ইউএনডিপি যৌথভাবে ৩৩ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প চালু করেছে। যা ৭ লাখ মানুষের মধ্যে বেশিরভাগ নারী ও কিশোরীদের উপকৃত করবে। জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর তৈরি গ্লোবাল ফান্ড গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে মোট ২৫ মিলিয়ন ডলার আসবে এবং বাংলাদেশ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৮ মিলিয়ন ডলার থেকে এই অর্থ এসছে। ৬ বছর মেয়াদি সময়ের জন্য এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে।