• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৮ রবিউস সানি ১৪৪১

বুয়েটের চার হলে ছাত্রলীগের ১০ টর্চার সেল

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক ও প্রতিনিধি, ঢাবি

| ঢাকা , শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ নিহতের ঘটনায় একের পর এক নির্যাতনের ঘটনা বেরিয়ে আসছে। ছাত্রলীগের নেতাদের কথা না শুনলেই শেরে বাংলা হল, আহসান উল্লাহ হল, কাজী নজরুল হল, এমএ রশীদ হল, তিতুমীর হলসহ প্রায় সবকয়টি শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নির্যাতনে ব্যবহৃত করা হত লাঠি, স্ট্যাম্প, রড, চাকু ও দড়ি। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তার আগের দুই রাতে অর্থাৎ বুধবার এবং বৃহস্পতিবার র‌্যাগিংয়ের দিন ঠিক থাকে। নির্ধারিত কিছু কক্ষ ছাড়াও হলের গেস্টরুম ও ছাদগুলোতে চলে নির্যাতন। নির্যাতনের জন্য ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প ব্যবহার হয় বেশি। এসব ঘটনায় নীরব থাকে হল প্রশাসন ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক।

সংবাদের অনুসন্ধানে জানা যায়, শেরে বাংলা হলের ২০০৫ নম্বর কক্ষটি টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত। এছাড়া ২০১১ নম্বর কক্ষেও শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে নির্যাতন চলত। এই হলে থাকেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। আহসানউল্লাহ হলের ১২৩, ৩২০, ৩২১ ও ৩২২ নম্বর কক্ষে প্রায়ই বিভিন্ন অভিযোগে শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে মারধর করা হয়। এই হলেই থাকেন ছাত্রলীগ সভাপতি। আর কাজী নজরুল ইসলাম হলের ২০৫ ও ৩১২ নম্বর কক্ষও মারধরের জন্য ব্যবহার করা হয়। ড. এমএ রশীদ হলের ৪০৫ ও ৩০৮ নম্বর কক্ষ টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত। এছাড়া, তিতুমীর হল ও সোহরাওয়ার্দী হলে শিক্ষার্থীদের টর্চারের জন্য একেক দিন একেকটি রুমকে বেছে নিত ছাত্রলীগের নেতারা। প্রায় সব হলের ছাদ এবং গেস্ট রুমেও চলত টর্চার। ছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট ‘ছাত্রী হল’ এবং মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট ‘শহীদ স্মৃতি’ হলে রাজনীতির চর্চা না থাকায় এসব হলে শিক্ষার্থী নির্যাতন হতো না বললেই চলে।

বুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতন আর অপমানের ঘটনা ঘটে হরহামেশাই। ভিন্ন মতের অনেককে শিবির ট্যাগ দিয়ে নির্যাতনের ঘটনাও আছে অনেক। আবরারের আগে অনেক শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তুচ্ছ ঘটনায় এমনকি সালাম না দেয়ার অজুহাত তুলেও তাদের পেটানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুয়েটের হলে হলে নিয়মিতই নির্যাতন চলে। আর এ কাজে ব্যবহারের জন্য স্টাম্প ও লাঠি প্রস্তুত রাখে ছাত্রলীগ। বুয়েটের আটটি হলের মধ্যে পাঁচটি হলের নয়টি কক্ষ ‘টর্চার সেল’ নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই পরিচিত। এসব কক্ষে শিক্ষার্থীদের ডাক পড়লে ধরেই নেয়া হয় তিনি মার খেতে যাচ্ছেন। অন্য শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করলে তার ওপরও চলে নির্যাতন। ফলে বুয়েটে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ের ব্যাপার হয়ে উঠেছিল।

বুয়েটের শেরে বাংলা হলের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ছাত্রলীগের নেতাদের কথা না শুনলেই সাত হলের বিভিন্ন রুমে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধর করতেন তারা। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছোট ছোট অভিযোগ তুলে তাদের মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ জব্দ করতেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এগুলো চেক করার নামে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করতেন। এছাড়া বিনা কারণে শাস্তি হিসেবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ওই কক্ষে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হতো। ভয়ে কেউ কিছু বলতেন না। ছাত্রলীগের নেতারা হলের প্রভোস্টকেও মানতেন না। এছাড়া, কুশল বিনিময়ের জন্য কোন শিক্ষার্থী সালাম না দিলে বা নেতাদের আসতে দেখে পাশ হয়ে না দাঁড়ালেই তাকে টর্চার সেলে নেয়া হতো। হলের সিনিয়ররা জুনিয়র শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দিতেন মারধর করতে। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক জুনিয়র শিক্ষার্থী নেতাদের কথামতো কাজ করতেন। ইচ্ছে হলেই যাকে তাকে র?্যাগিং দেয়া হতো। র?্যাগিংয়ের নামে যা ইচ্ছা তাই করা হতো। নেতাদের ভয়ে কেউ মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারতেন না। এ হলে গত ৩ অক্টোবর রাতে এহতেশাম সায়ম নামে একজন শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ কর্মী ইফতি মোশারফ সকাল ও আশিকুল ইসলাম বিটু, মুজতবা রাফিদসহ মোট ৪ জন মারধর করে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১৭ ব্যাচের ছাত্র সাখওয়াত অভিকে জোরপূর্বক লীগের সমাবেশে যেতে বাধ্য করে বিতর্কিত লীগ নেতা অমিত সাহা। সমাবেশে যেতে দেরি করলে অমিত তাকে প্রহার করে এবং হাত ভেঙ্গে যায়। আঘাতে হাত ভাঙ্গলেও তাকে বলতে বাধ্য করা হয়- সিঁড়ি থেকে পড়ে হাত ভেঙ্গেছে।

বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের ২০১৬ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রথম বর্ষে পড়ার সময় একদিন আমাকে ছাত্রলীগের কয়েকজন ছাদে নিয়ে ডেকে পাঠায়। হাফপ্যান্ট পরে হলে ঘুরলাম কেন, এটা নাকি আমার অপরাধ। সেদিন আমাকে মারধর ও চড়থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেয়। এর পরের দিন আবার ডাকা হয়। সেদিন আমার অপরাধ চুল বড় কেন, অথচ আমার চুল ছোটই ছিল। আমাকে ওইদিন স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়েছিল তারা। শেরে বাংলা হলের ২০১৮ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাকেও ডেকে নেয়া হয়েছিল, আবরারকে যে রুমে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সেই ২০১১ নম্বর কক্ষে। সেদিন ১০-১২ জনকে একসঙ্গে নিয়ে চড়-থাপ্পড় দিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতারা। আবরার হত্যাকা-ের আসামি অনিক সরকার সেদিনের নির্যাতনে নেতৃত্ব দিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, আমাকে যখন চড়-থাপ্পড় দেয়া হয়, এমনভাবে কথা বলছিল, যেন আমাকে আদর করছে। এক নাগাড়ে ২০-২৫টি থাপ্পড় দিয়েছিল।

র‌্যাগিংয়ের নামে এমন নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে এই শিক্ষার্থী বলেন, আবরারকে যখন ডাকা হয়, তখনও সবাই ভেবেছিল, র‌্যাগ দেয়ার জন্য নেয়া হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা এই পর্যায়ে পৌঁছবে কেউ ভাবেনি। তবে আবরারের ঘটনাকে ভিন্ন রকম হিসাবে বর্ণনা করে ২০১৭ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, সাধারণত সিনিয়র ব্যাচের নেতারা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের র‌্যাগ দেয়। কিন্তু নানা রকম স্ট্যাটাসের জন্য আবরারকে শিবির ব্লেইম দিয়ে ডেকে নেয়া হয়েছিল। যখন কাউকে শিবির ব্লেইম দিয়ে নেয়া হয়, তখন সে সিনিয়র হলেও জুনিয়র-সিনিয়র সবাই মারে।

র‌্যাগের নামে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে কান ফাটিয়ে দেয়া হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে। এর জন্য হল থেকে বহিষ্কার হন আহসান উল্লাহ হলের ছাত্রলীগ নেতা সৌমিত্র লাহিড়ী। কিন্তু দলীয় প্রভাবে তিনি হলেই ছিলেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। ওই হলের কেমিকৌশল বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, সৌমিত্র হলে বহাল তবিয়তেই ছিল। উল্টো তার উপকার হয়েছে, বহিষ্কারের সুযোগে হলের বিভিন্ন ফি দিতে হয়নি তাকে। র‌্যাগিংয়ের কারণে শাস্তির নজির একমাত্র সৌমিত্রই বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এর বাইরে অনেক ঘটনা ঘটে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি বলে তাদের অভিযোগ। এত অভিযোগ এলেও বুয়েটের বিভিন্ন হলে ঘুরে র‌্যাগিং বিরোধী ব্যানার দেখা গেছে। দেড়-দুই মাস আগে এই ব্যানারগুলো লাগানো হয় বলে জানান দুই হলের কর্মচারীরা।

র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সব সময় উদ্যোগী ভূমিকা নেয় বলে দাবি করেছেন বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামিউস সানি। তিনি বলেন, র‌্যাগ ছাত্রলীগের নামে কেউ দেয় না। এরপর র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনে জড়িত কয়েক ছাত্রলীগ নেতার নাম জানালে সানি বলেন,আমরা যখনই কোন ঘটনা জেনেছি, সে বিষয়ে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে বলেছি। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, অপরাধীর পরিচয় অপরাধী, তার পরিচয় ছাত্রলীগ না। যারাই এমন র‌্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই আমরা।

তিতুমীর হলে শিক্ষার্থীদের টর্চারের জন্য একেক দিন একেকটি রুমকে বেছে নিত ছাত্রলীগের নেতারা। এছাড়া, হলের ছাদ এবং গেস্টরুমেও চলত টর্চার। হলের প্রাধ্যক্ষ ও কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার সাহস পেতো না। ছাত্রলীগের টর্চার সহ্য করেছেন তিতুমীর হলের দ্বিতীয় বর্ষের এমন একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, কোন হলেই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাদের র‌্যাগ ও টর্চার সহ্য করেনি এমন একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের হলে ওঠার সময়ই কী কী কাজ করতে পারবে, আর কী পারবে না তা ছাত্রলীগ নেতাদের পক্ষ থেকে বলে দেয়া হয়। এর বাইরে কিছু করলে তাদের নির্যাতন করা হয়। তিনি বলেন, গত বছর আমার এক বন্ধুকে গেস্ট রুমে ডেকে ছাত্রলীগের এক নেতা একটি প্রশ্ন করেন। সে তার প্রশ্নের উত্তর দিলে তাকে মারধর করা হয়। বিষয়টি এমন যে, ছাত্রলীগের নেতারা একজন শিক্ষার্থীকে ডেকে তাকে প্রশ্ন করবে, তার উত্তর দিলেও মার খেতে হবে, না দিলেও মার খেতে হবে আবার চুপ থাকলেও তো মার খেতেই হবে। ছাত্রলীগের নেতারা বিনা কারণেই শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে বলে জানান তিনি। এ শিক্ষার্থী আরও বলেন, ছাত্রলীগের নেতাদের ভয়ে হলের প্রভোস্ট পর্যন্ত তাদের ভাই ডাকে।

ড. এমএ রশীদ হলে ছাত্রলীগের নেতারা জোর করে ডাইনিংয়ের দায়িত্ব নেয়। আট মাস আগে এর প্রতিবাদ করায় এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে সন্তু নামে ১৪ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী। ২০১৮ সালের হল ফেস্টের সময় হল ফেস্টের ফি না দেয়ার কারনে ১৫ ব্যাচের কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নাসিমকে বেদম প্রহার করে ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সহসভাপতি মিনহাজ, অয়ন, বাধন ও সৌরভ। নাসিম হল প্রশাসন ও তার বিভাগের শিক্ষকদের জানালেও তারা ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর হলের ৩০৮নং কক্ষে বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান, যুগ্ম সম্পাদক ঝলক এবং নেভাল আর্কিটেকচার বিভাগের নীলাদ্রি নিলয় দাস শিবির সন্দেহে মেকানিক্যাল বিভাগের সাদ আল রাজিকে স্ট্যাম্প দিয়ে বেদম প্রহার করে। একই বছর শিবির সন্দেহে মারধর করা হয় ১৩ ব্যাচের নগর পরিকল্পনা বিভাগের সেতুকে। তাকে মারধর করে মিনহাজ, সঙ্গে ছিল ১১ ব্যাচের নগর পরিকল্পনা বিভাগের অনুপ ও ১৩ ব্যাচের পানি সম্পদ বিভাগের সম্রাট।

পরবর্তীতে সাদ আল রাজির বাবা-মাকে কোন অভিযোগ না করতে চাপ দেয়া হয়। এই হলে ২০১৭ সালে আরাফাত নামে ১৫তম ব্যাচের একজনকে শিবির সন্দেহে মারধর করে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। আরাফাতকে স্ট্যাম্প দিয়ে পেটায় ছাত্রলীগ কর্মী নীলাদ্রী। ২০১৬ সালে এ হলের ৪০৫ নম্বর কক্ষে ফয়সাল ও দীপ্ত নামে ১৫তম ব্যাচের দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়।

এ বিষয়ে এমএ রশীদ হলের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে একটি মিথ চালু আছে। সেটা হচ্ছে ‘র‌্যাগ দিলে সম্পর্ক বাড়ে’। এজন্য শিক্ষার্থীরা সব ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতনকে স্বাভাবিকভাবে নেয়। তিনি জানান, মূলত মিনহাজের নেতৃত্বেই এ হলে টর্চার সেলগুলো পরিচালিত হয়।