• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জিলকদ ১৪৪১

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি ৩২ লাশ উদ্ধার

উদ্ধার হয়নি ডুবন্ত লঞ্চ, নিখোঁজ অনেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর শোক তদন্ত কমিটি গঠন

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক ও প্রতিনিধি, কেরানীগঞ্জ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

image

গতকাল বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির পর উদ্ধারকৃতদের লাশের সারি ঘিরে আপনজনদের খুঁজছে স্বজনরা -সংবাদ

রাজধানীর শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ ডুবে অন্তত ৩২ জন মারা গেছেন। গতকাল ময়ূর-২ নামে একটি লঞ্চের ধাক্কায় এমভি মর্নিংবার্ড নামের ওই ছোট যাত্রীবাহী লঞ্চটি ডুবে গেলে এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এমভি মর্নিংবার্ড মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নদীতে চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়। লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ হোসেন বলেছেন, দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে ও লাশ দাফনের জন্য ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হবে। এ ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে ৩০টি মৃতদেহ উদ্ধার করেন। এছাড়া স্থানীয়রা আরও দু’জনকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন বলে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার জানান। যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১৭ জন পুরুষ, ৮ জন নারী ও ৩ জন শিশু।

এ দুর্ঘটনায় অর্ধ শতাধিক যাত্রীর মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানান, লঞ্চটিতে অন্তত দেড়শ’ যাত্রী ছিল। তবে বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, লঞ্চটিতে অর্ধ শতাধিক যাত্রী ছিল।

লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামও শোক প্রকাশ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

লঞ্চডুবির খবর পেয়ে নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড এবং নৌপুলিশ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা ওসি মোহাম্মদ শাহজামান জানান, যে ৩২ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে, তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। এরা হলেন- শাহাদাত হোসেন (৪৪), আবু তাহের বেপারী (৫৮), সুমন তালুকদার (৩৫), ময়ানা বেগম (৩৫), তার মেয়ে মুক্তা আক্তার (১৩), আফজাল শেখ (৪৮), মনিরুজ্জামান মনির (৪২), গোলাপ হোসেন (৫০), সুবর্ণা বেগম (৩৮), তার ছেলে তামিম (১০), আবু সাঈদ (৩৯), সুফিয়া বেগম (৫০), শহিদুল ইসলাম (৬১), মিজানুর রহমান কনক (৩২), সত্য রঞ্জন বণিক (৬৫), শামীম বৈপারী (৪৪), বিউটি আক্তার (৩৮), আয়শা বেগম (৩৫), মো. মিল্লাত (৩৫), মো. আমির হোসেন (৫৫), সুমনা আক্তার (৩২), পাপ্পু (৩২), মো. মহিম (১৭), দিদার হোসেন (৪৫), হাফেজা খাতুন (৩৮), হাসিনা রহমান (৩৫), সিফাত (৮), আলম বেপারী, তালহা (২), ইসমাইল শরীফ (৩৫), সাইফুল ইসলাম (৪২) ও বাসুদেব নাথ (৪৫)।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক ঘটনান্থলে সাংবাদিকদের বলেন, দুই লঞ্চের কর্মীদের অসতর্কতায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে তারা মনে করছেন। উদ্ধার অভিযান শেষে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ লালকুঠী ঘাটে যাত্রী নামায়। এরপর সদরঘাটের চাঁদপুর ঘাটে নোঙ্গর করার জন্য ব্যাক গিয়ারে ঘুরছিল। ওই সময় পেছনে নদীতে থাকা এমভি মর্নিংবার্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।

দুর্ঘটনার পর লঞ্চের কিছু যাত্রী সাঁতরে তীরে এবং বিভিন্ন নৌকাতে উঠার সুযোগ পেলেও বেশিরভাগ যাত্রী মারা যান।

ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের নৌকাগুলো ডুবে যাওয়া মানুষদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। এরপর বিআইডব্লিটিএ লোকজন আসে। পরে নৌবাহিনী, নৌপুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবরি দল আনা হয়। ডুবরিরা নদীতে নামার পর একে একে লাশ তুলতে থাকে। খবর পেয়ে ওই লঞ্চে থাকা যাত্রীদের স্বজনরাও ঘটনাস্থলে ছুটে আসে।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে বেঁচে ফেরা যাত্রী মো. মাসুদ জানান, আমি ও আমার দুই মামা আফজাল শেখ এবং বাচ্চু শেখ ওই লঞ্চে উঠেছিলাম। সদরঘাট নামার কথা ছিল। ঘাটে ভেড়ার জন্য লঞ্চ সোজা আসছিল। অন্য একটা লঞ্চ বাঁকাভাবে রওনা দিয়ে তাদের লঞ্চটাতে ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটা ডুবে যায়। আমি কেবিনে ছিলাম। গ্লাস খুলে আমি বের হইছি। ভেতরে আমার দুই মামা ছিলেন। তারা তো বের হতে পারেননি।

মো. মাসুদ আরও জানান, রাজধানীর ইসলামপুরের গুলশানআরা সিটিতে কাপড়ের ব্যবসা করেন তিনি। প্রতিদিন তিনি সকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে কাপড়ের দোকান করেন। গত রোববার ময়মনসিংহ থেকে তার দুই মামা তাদের মুন্সীগঞ্জের বাসায় বেড়াতে যান। তাদের নিয়ে সকালে লঞ্চের একটি কেবিনে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। ‘দুর্ঘটনার পর লঞ্চে থাকা প্রায় ৫০ জনের মতো যাত্রী সাঁতরে উঠতে পারে। বাকি যাত্রী কেউ উঠতে পারেনি। তারা লঞ্চের ভেতরেই ছিল। আমরা প্রায় ১৫০ জনের মতো ছিলাম।

ডুবে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে যমুনা ব্যাংকের ইসলামপুর শাখার কর্মচারী সুমন তালুকদারও ছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা সুমন তালকদারের লাশ উদ্ধার করে। পরে সুমন তালুকদারের বড় ভাই এসে লাশ শনাক্ত করেন। সুমনের বড় ভাই বলেন. তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে। প্রতিদিন বাড়ি থেকে এসে পুরান ঢাকার ইসলামপুরে অফিস করতেন তার ছোট ভাই সুমন। প্রতিদিনের মত সকাল সাড়ে ৭টার দিকে লঞ্চে উঠে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন সুমন। সুমন এক সন্তানের বাবা ।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা রোজিনা ইসলাম বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটির ভেতরে আরও লাশ আছে কিনা, তা তল্লাশি করে দেখা হবে।

বিআইডব্লিউটিএ এর পরিবহন পরিদর্শক মো. সেলিম জানান, এমভি মর্নিংবার্ড নামের ওই লঞ্চে অর্ধশতাধিক যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। তবে ঠিক কতজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত হলেও সেটিকে টেনে তুলতে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড থেকে আসেন উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়। কিন্ত সেটি পোস্তাগলা ব্রিজের নিচে আটকে যাওয়ায় বিকেল পর্যন্ত উদ্ধার কাজে অংশ নিতে পারেননি।

কোস্টগার্ডের লে. কমান্ডার হায়াত ইবনে সিদ্দিকী জানান, দুর্ঘটনার পর পরই কোস্টগার্ডের দুটি দল উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে।

নিখোঁজ অনেক

লঞ্চ দুর্ঘটনায় কাপড় ব্যবসায়ী মাসুদ বেঁচে গেলেও ময়মনসিংহ থেকে বেড়াতে আসা তার দুই মামা আফজাল শেখ ও বাচ্চু শেখ নিখোঁজ রয়েছেন। আরও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছে। কতজন যাত্রী ছিল আর কতজন নিখোঁজ রয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। অনেকেই নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে দিগি¦দিক হয়ে ছোটাছুটি করছিলেন। সকাল থেকে অপেক্ষায় ছিলেন সদরঘাটে দুর্ঘটনাস্থলে। আবার অনেকেই ছুটে গেছেন মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে সাঁতরিয়ে কুলে উঠা মজির সিকদার জানান, লঞ্চটিতে যাত্রী ছিল ১০০-১২০ জনের মতো। আমি আমার বড় ভাই হাবিবুল শিকদার, নানিকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জ কাটপট্টি থেকে ঢাকায় নিজ বাসা ফরিদাবাদ মাদরাসার কাছে আসিতেছিলাম। আমরা দু’জন সাঁতরিয়ে কুলে উঠতে পারলেও আমার নানি নিখোঁজ রয়েছেন।

তদন্ত কমিটি গঠন

এদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. রফিকুল ইসলাম খানকে। কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (নৌনিরাপত্তা) মো. রফিকুল ইসলামকে। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন নৌপরিবহন অধিদফতরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জসিম উদ্দিন সরকার, বিআইডব্লিউটিসি’র প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি, ফায়ার সার্ভিস অধিদফতরের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি এবং নৌপুলিশের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি।

এদিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

দুর্ঘটনা প্রায়শই ঘটলেও নিশ্চুপ থাকে কর্তৃপক্ষ!

অভিযোগ রয়েছে সদরঘাটে লঞ্চ, মালবাহী কার্গোরসহ বিভিন্ন নৌজানের বেপরোয় গতির কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এরপূর্বেও পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিআইডব্লিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে উদাসীন রয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর শেষ হয়না অথবা আলোরমুখ দেখে না। দায়ীদের বিরুদ্ধেও বিআইডব্লিটিএ কোন ব্যবস্থা নিতে পারে না। সদরঘাট টার্মিনাল ও আশেপাশে অবৈধ নৌযানের ব্যাপক দৌরাত্ম্য থাকে। এসব অবৈধ নৌযানের কারণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা যাত্রীবাহী লঞ্চ ঠিকভাবে ঘাটে লঞ্চ ভিড়াতে পারে না। আবার অনেক যাত্রীবাহী লঞ্চ রয়েছে যারা নিজেদের ইচ্ছেমতো নোঙ্গর করেন অথবা নদীতে অতিরিক্ত গতিতে লঞ্চ চালান। এসব ব্যাপারে ঘাট কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয় না।