• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জিলকদ ১৪৪১

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি নাশকতা সন্দেহ

ময়ূর-২ এর মালিকসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা আরও ২ জনের লাশ উদ্ধার

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক ও প্রতিনিধি, কেরানীগঞ্জ

| ঢাকা , বুধবার, ০১ জুলাই ২০২০

image

উদ্ধারকারী জাহাজের ধাক্কায় বুড়িগঙ্গা সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যান চলাচল বন্ধ, সাধারণ মানুষ হেঁটে সেতু পারাপার -সংবাদ

রাজধানীর শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে গত সোমবার লঞ্চডুবির নেপথ্যে নাশকতার সন্দেহ করছে পুলিশ। নদী পাড়ের একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ৪১ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজে ময়ূর-২ লঞ্চ যেভাবে এমভি মর্নিংবার্ডকে ধাক্কা দিয়ে তলিয়ে দেয়ার দৃশ্য ভাইরাল হওয়ার পর থেকে পুলিশ এ সন্দেহ করছে। আগের দিন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীও ওই ফুটেজ দেখে একই কথা বলেছিলেন। এ ঘটনায় ময়ূর-২ এর মালিক ও চালকসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে নৌপুলিশ।

এ লঞ্চডুবির ঘটনায় গতকাল আরও ২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল সকালে দ্বিতীয় দিনের মতো ডুবুরিরা ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমভি মর্নিংবার্ডের ইঞ্জিন গ্রিজার আশিক হোসেনের লাশ উদ্ধার করে। উদ্ধার ও তল্লাশি কার্যক্রম শেষ ঘোষণার পর বিকেলে নদীতে ভেসে উঠে ঢাকা জজ কোর্টের মুহুরি আবদুর রহমানের (৪০) লাশ। এ দুর্ঘটনায় আগের দিন আবদুর রহমানের স্ত্রী ও সন্তানের লাশ উদ্ধার হয়েছিল। এর ফলে লঞ্চডুবিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।

এদিকে মামলার পর থেকে ময়ূর-২ লঞ্চ এবং মর্নিবার্ড লঞ্চের মালিকসহ আসামিরা আত্মগোপনে রয়েছেন।

বিআইডব্লিউটিএ ও পুলিশ সূত্র জানায়, টানা দুইদিন উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে গতকাল তল্লাশি অভিযান শেষ ঘোষণা করা হয়েছে। সকালে দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযানে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে এয়ার লিফটিং এর মাধ্যমে ডুবে যাওয়া লঞ্চ মর্নিংবার্ড টেনে তোলা হয়।

ভেতরে আর কোন মৃতদেহ না থাকায় বেলা আড়াইটায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

নদীর ৬০-৭০ ফুট গভীরে উল্টে থাকা লঞ্চটিকে টেনে তুলতে ১১টি এয়ার লিফটিং ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এর একেকটি ব্যাগ ৮ টন ওজন তুলতে পারে। বিআইডব্লিউটিএর ছোট উদ্ধারকারী জাহাজ দূরন্তও এ কাজে যুক্ত ছিল।

এদিকে ডুবে যাওয়া ‘মর্নিংবার্ড’ লঞ্চের মালিকেরও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। বিআইডব্লিউটিএ কিংবা নৌপুলিশ কারো কাছেই তার খবর নেই। মালিক পক্ষের কেউ নিজ থেকে এখনও যোগাযোগ করেননি, তবে সংশ্লিষ্টরা মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। পুলিশ জানায়, ডুবে যাওয়া লঞ্চের মালিকও আমাদের কাছে আসেননি। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। তবে এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব হচ্ছে আসামি গ্রেফতার করা।

নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার খন্দকার ফরিদুল ইসলাম বলেন, ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। এটি কোন দুর্ঘটনা নয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটিতে নৌপুলিশের প্রতিনিধিও রয়েছে। গতকাল প্রতিনিধি দল ফুটেজ পর্যালোচনা করেছে। এখানে এক্সপার্টের মাধ্যমে মতামত নেয়া হবে। এরপরই বুঝা যাবে এ ঘটনার পিছনে অন্য কোন কারণ রয়েছে কিনা। যদি পরিকল্পিভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকে তাহলে এটিকে হত্যা হিসেবে ধরে নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে।

মযূর লঞ্চের মালিকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা

এদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবিতে ৩৩ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগ ও বেপরোয়া গতিতে লঞ্চ চালানোসহ কয়েকটি ধারায় এনে মামলা করেছে পুলিশ। নৌপুলিশের সদরঘাট থানার এসআই শামছুল আলম গতকাল ভোর রাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, মাস্টার জাকির হোসেন, স্টাফ শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন, হৃদয় ও সুকানি নাসির মৃধার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও পাঁচ-ছয়জনকে সেখানে আসামি করা হয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই বাছির উদ্দিন বলেন, মামলায় দ-বিধির ২৮০, ৩০৪ (ক), ৩৩৭ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি ।

নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার জানান, মামলার পর আসামিদের বাসার ঠিকানাসহ সম্ভাব্য অবস্থানের ঠিকানা সংগ্রহ করে একাধিক জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু অভিযানের আগেই আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায়। এর ফলে আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

শ্বাসরুদ্ধকর ৩০ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষ হলো দুপুরের পর

গত সোমবার সকালে দুর্ঘটনার পর নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস যৌথ উদ্ধার অভিযান শুরু করে। গত সোমবার সকালে প্রথমে ডুবে যাওয়া লঞ্চের অবস্থান শনাক্ত করার পর উদ্ধার কাজ শুরু হয়। ডুবুরি দল একে একে ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করে গত সোমবার বিকেল পর্যন্ত। রাতে উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর গতকাল সকালে দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার কাজ শুরু করে যৌথ বাহিনী। লাশ খোঁজার পাশাপাশি ডুবে যাওয়া লঞ্চটিকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হয়। আগের দিন ডুবে যাওয়া লঞ্চ উদ্ধারের জন্য আসা নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে আটকে যাওয়ায় বিআইডব্লিটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ দুর্জয় এসে উদ্ধার কাজে যোগ দেয়।

৪১ সেকেন্ডের ভিডিওতে নির্মমতার দৃশ্য ভাইরাল

গতকাল সকালে নদী পাড়ের একটি সিসি টিভির ক্যামেরা ফুটেজে যাত্রীবাহী ময়ূর-২ কিভাবে এমভি মর্নিংবার্ডকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে তলিয়ে দিয়েছে তা ৪১ সেকেন্ডের ফুটেজে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। ওই ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। ওই ভিডিও সংগ্রহ করেছেন লঞ্চ দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ভিডিওটি সোমবারই নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, বিআইডব্লিউটিএ, নৌপুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা দেখেছেন। ৪১ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে দেখা গেছে, এমভি মর্নিংবার্ড ময়ূর-২ লঞ্চের পাশেই ছিল। দুই লঞ্চ সমান গতিতে সামনের দিকে এগুচ্ছিল। যাত্রী নিয়ে মর্নিংবার্ড লঞ্চটি ঘাটের দিকে আসছিল। হঠাৎ মর্নিংবার্ড লঞ্চের পিছনের অংশে ধাক্কা দিয়েই লঞ্চটি মর্নিংবার্ডের উপর উঠিয়ে দেয়া হয়। ময়ূর-২ লঞ্চ অনেক বড় হওয়ায় মনির্ংবার্ড লঞ্চটি উল্টে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তলিয়ে যায়। নদীর পাড় ও আশপাশে নোঙ্গর করে থাকা লঞ্চের স্টাফরা ওই দৃশ্য দেখেই আঁতকে ওঠে। তখনও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিল ময়ূর-২। এক পর্যায়ে ময়ূর-২ পিছনের দিকে চলে যায়। ততক্ষণে মর্নিংবার্ড পুরোপুরি নদীতে ডুবে যায়।